বিজ্ঞাপন

বিশেষ কৌশলে ‘বৈধ’ হয়েছে মোবাইল ফোন, বিক্রি হচ্ছে এখনো

October 3, 2021 | 10:25 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের বাজারে ১ অক্টোবর থেকে বন্ধ হয়েছে বৈধভাবে আমদানি না করা মোবাইল হ্যান্ডসেটের বিক্রি। ওই দিন থেকেই দেশের নেটওয়ার্কে অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট চালু করলেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুই দিন পরও দেশের বাজারে এরকম ‘আনঅফিসিয়াল’ বা ‘অবৈধ’ মোবাইল ফোন বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর এসব হ্যান্ডসেট কেনার পর ক্রেতাদেরও চালাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তাহলে কি বিটিআরসি’র ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার তথা এনইআইআর প্রযুক্তি কাজ করছে না!

বিজ্ঞাপন

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পাওয়া গেল চমকপ্রদ তথ্য। মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিকারক এবং এসব সেটের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনেক আমদানিকারকই অবৈধ উপায়ে আনা ফোনগুলো দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সচল করে রেখেছেন। অর্থাৎ ১ অক্টোবর থেকে বৈধভাবে আমদানি না করা মোবাইল হ্যান্ডসেট বন্ধের ঘোষণা ছিল; অবৈধভাবে আমদানি করা এসব হ্যান্ডসেটে তাই ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই দেশের কোনো মোবাইল অপারেটরের সিম ব্যবহার করে সচল করে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ ১ অক্টোবরের আগেই এসব হ্যান্ডসেটের তথ্য চলে গেছে এনইআইআর-এর তথ্যভাণ্ডারে। ফলে এসব হ্যান্ডসেট আর বন্ধ হচ্ছে না!

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন কৌশলেই ‘অবৈধ’ মোবাইল হ্যান্ডসেটকে দেশের নেটওয়ার্কে ‘বৈধ’ করে তুলে বিক্রি করা হচ্ছে বাজারে। বৈধভাবে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের চেয়ে দামে কম হওয়ায় বরং এসব হ্যান্ডসেটের বিক্রিও কম নয়। আর বিশেষ কৌশলের কারণে বিটিআরসি’র নিষেধাজ্ঞার আওতাতেও পড়ছে না হ্যান্ডসেটগুলো। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি অবশ্য বলছে, অবৈধ বা আনঅফিসিয়াল মোবাইল বিক্রির সুযোগ এখন আর নেই। আর এ ধরনের হ্যান্ডসেটের বিক্রি বন্ধে প্রচারণা ছাড়াও ভবিষ্যতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

আরও পড়ুন-

বিজ্ঞাপন

বিশেষ কৌশলে ‘বৈধ’ হয়েছে মোবাইল ফোন, বিক্রি হচ্ছে এখনো

দেশের বাজারে অবৈধভাবে মোবাইল ফোনের আমদানি বন্ধ, মোবাইল চুরি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর)’ প্রযুক্তি চালু করেছে বিটিআরসি। পহেলা জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চলেছে এই প্রযুক্তির কার্যক্রম। বিটিআরসি বলছে, ১ অক্টোবর থেকে দেশের নেটওয়ার্কে নতুন করে আর কোনো অবৈধ মোবাইল ফোন সচল হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

বিটিআরসি’র এই ঘোষণা কতটুকু কার্যকর হচ্ছে, সেটি দেখতে রোববার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের মোবাইলের দোকানগুলোতে গিয়েই দেখা গেল চমকপ্রদ কৌশলে বৈধ করে তোলা হ্যান্ডসেটগুলোর বিক্রির খবর। শপিং মলটির কেআরওয়াই ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি দোকানে গিয়ে দেখা গেল, অনঅফিসিয়াল মোবাইল হ্যান্ডেসেট কিনতে ক্রেতাদের ভিড় রয়েছে। দোকানটিতে বেশ কম দামে এসব হ্যান্ডসেট বিক্রি হতে দেখা গেছে। সুমাশ টেক নামের আরেক দোকানেও বিক্রি হচ্ছিল এ ধরনের মোবাইল হ্যান্ডসেট। এরকম দোকানের সংখ্যাও মার্কেটটিতে কম নয়। এসব দোকানে ‘আইফোন ১৩’ বিক্রি হতে দেখা গেছে ১ লাখ টাকাতেও।

জানতে চাইলে বিটিআরসি’র ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত কুমার মৈত্র সারাবাংলাকে বলেন, ‘১ অক্টোবরের পর থেকে দেশের নেটওয়ার্কে অবৈধ কোনো মোবাইল ফোন আর সচল হয়নি। অবৈধ হলে মেসেজ চলে যাবে। যদি সেটটি বৈধ হয়, তাহলে গ্রাহক রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। বৈধভাবে বিদেশ থেকে আনা বা উপহার পাওয়া মোবাইল ফোনও রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। তারপরও যদি কেউ আনঅফিসিয়াল হ্যান্ডসেট কেনেন, সেটি তার দায়িত্ব।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রচারণা চালাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য কোনো গ্রাহক যেন প্রতারিত না হন, তারা মোবাইল কিনে যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, আর সরকারও যেন রাজস্ব না হারায়— এটাই আমরা চাই। আমাদের লক্ষ্য মোবাইলের চুরি ও হারিয়ে যাওয়া ঠেকানো। এই সিস্টেম পুরো রান করলে এসব সমস্যার সমাধান হবে।’

১ অক্টোবরের আগেই হ্যান্ডসেটে সিম ব্যবহার করে সচল করে নেওয়ার কৌশল নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে চাননি বিটিআরসি’র এই ভাইস চেয়ারম্যান। তবে তিনি বলেন, ‘আনঅফিসিয়াল বা অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধে প্রথমে আমরা ক্যাম্পেইন করব। গ্রাহক ও ক্রেতাদের সচেতন করব। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের প্রথমে মোটিভেট করে এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’

বিটিআরসি’র পক্ষ থেকেও সবার প্রতি বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদন, আমদানি, বেচাকেনা কিংবা ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।’

বৈধ ও অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট কী

কোনো ব্র্যান্ডের মোবাইল হ্যান্ডসেট সাধারণত ওই ব্র্যান্ডের দোকান থেকে কেনা হলে তা বৈধ বলে বিবেচিত। অনুমোদিত আমদানিকারক সরকারকে রাজস্ব দিয়ে কোনো হ্যান্ডসেট আমদানি করলে সেটিও বৈধ হ্যান্ডসেট। দেশে উৎপাদিত মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলোও বৈধ। দেশে উৎপাদিত কিংবা বৈধ উপায়ে আমদানি করা এসব হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর পাঠাতে হয় বিটিআরসিতে। বিটিআরসিতে এই যে হ্যান্ডসেটগুলোর আইএমইআই নম্বর সংরক্ষিত থাকছে, সেগুলোই বৈধ হ্যান্ডসেট।

এর বাইরে দেশে লাগেজ বা ব্যাগেজ পার্টির মাধ্যমে প্রচুর মোবাইল ফোন আমদানি হয়ে থাকে। অর্থাৎ বৈধ আমদানিকারকের বাইরে অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে দেশে বিদেশি হ্যান্ডসেট নিয়ে আসেন। এগুলোর আইএমইআই নম্বর বিটিআরসিতে সংরক্ষিত থাকে না। মূলত এসব হ্যান্ডসেটই আনঅফিসিয়াল বা অবৈধ। বিটিআরসি বলছে, নির্দিষ্ট একটি নম্বরে মেসেজ পাঠিয়েই জানা যাবে সেটটি বৈধ না অবৈধ।

বিটিআরসি বলছে, বিক্রয় কেন্দ্র বা ই-কমার্স সাইট থেকে যেকোনো মোবাইল হ্যান্ডসেট কেনার আগে অবশ্যই হ্যান্ডসেটটির বৈধতা যাচাই করতে হবে, কেনার রশিদও সংরক্ষণ করতে হবে। মোবাইল বা হ্যান্ডসেটটি বৈধ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআর সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।

মোবাইল ফোনর মেসেজ অপশনে গিয়ে KYD লিখে একটি Space দিয়ে ১৫ ডিজিটের IMEI নম্বরটি লিখে (উদাহরণ— KYD 123456789012345) ১৬০০২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি মেসেজে জানিয়ে দেওয়া হবে সেটটি বৈধ কি না। neir.btrc.gov.bd ওয়েবসাইট ভিজিট করেও বৈধ বা অবৈধ সেট সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। একইসঙ্গে রেজিস্ট্রেশনের পদ্ধতিও সেখানে দেওয়া রয়েছে।

তবে এর সবই কার্যকর হয়েছে ১ অক্টোবর থেকে। ফলে অবৈধ হ্যান্ডসেট যেসব বিক্রেতারা মজুত রেখেছিলেন, তারা এর আগেই সেসব হ্যান্ডসেট দেশের নেটওয়ার্কে সচল করে নিয়েছিলেন, যেন সেগুলো অবৈধ হ্যান্ডসেটের কাতারে না পরে।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন