বিজ্ঞাপন

পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণেই কোভিড-১৯ মহামারি

October 4, 2021 | 11:14 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

বন উজাড়ের কারণে বনের প্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে, সঙ্গে নিয়ে আসছে নানারকম রোগ-জীবাণু। এইচআইভি, কোভিড-১৯সহ নানা রোগ ছড়াচ্ছে বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে। ভবিষ্যতে আরও যেসব মহামারি আসার আশঙ্কা করছেন গবেষকরা, তাও পরিবেশ ধ্বংস তথা বন নিধনের কারণেই হবে। বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির কারণে প্রকৃতির ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যার ফলে মানুষের জন্য ভবিষ্যতে টিকে থাকা মুশকিল হবে। তাই সভ্যতার চালক হিসেবে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে নিজেদের ও প্রাণিজগতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৪ অক্টোবর) বিশ্ব প্রাণী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সর্বপ্রথম হেনরিক জিম্মারমেন নামে এক জার্মান লেখক ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিনে দিবসটি পালন করেন। পরে ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে পরিবেশ বিজ্ঞানিদের এক সম্মেলনে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এবারের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বনাঞ্চল ও জীবিকা: মানুষ ও পৃথিবীর স্থায়িত্বশীলতার জন্য সহায়ক’ (Forests and Livelihoods: Sustaining People and Planet)। প্রভা অরোরা এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবস উপলক্ষে জুম মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ একটি আলোচনার আয়োজন করে।

বিজ্ঞাপন

প্রভা অরোরার প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিধান চন্দ্র পালের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. শেখ আজিজুর রহমান। কী-নোট স্পিচ প্রদান করেন চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথ।

তিনি বলেন ‘সৃষ্টির শুরুতে শুধু মানুষ, প্রাণী আর বনাঞ্চল ছিল। মানুষ খাবারের জন্য প্রাণী শিকার করে গাছ কেটে জ্বালানি বানিয়ে রান্না করে সেই প্রাণী খেতে শুরু করে। তাই বলা যায় সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ খাবারের জন্য বনের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বেড়েছে, বেড়েছে খাবার, বাসস্থান, জ্বালানিসহ নানা কারণে বন উজাড়ের হার। কিন্তু মানুষের মতই প্রাণীদেরও বেঁচে থাকার জন্য একইরকম চাহিদা। খাদ্য বা অক্সিজেনই শুধু নয়, প্রয়োজন পরিষ্কার স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা, গরম-ঠাণ্ডা থেকে সুরক্ষা, দূষণমুক্ত পরিবেশ ইত্যাদি। বন উজাড়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্য প্রাণীরা লোকালয়ে আসছে যার ফলে নানা রোগব্যধি ছড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নীতিশ চন্দ বলেন, ‘একসময় আমাদের দেশের বাড়িতে বাড়িতে কুকুর-বেড়াল থাকত। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীর প্রতি মানুষের মমত্ব কমে গেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বন্যপ্রাণী টিকিয়ে রাখতেই হবে।’ আমাদের দেশ যেহেতু ছোট, তাই চাইলে এখনও পরিকল্পিতভাবে বন্যপ্রাণী তথা প্রকৃতিরক্ষায় কাজ শুরু করা যায় বলে পরামর্শ দেন বিশিষ্ট এই প্রকৃতিবিদ।

বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মণ্ডল বলেন, ‘মানুষ ও বন্যপ্রাণী জগতে একসঙ্গে বিরাজ করবে। তরুণদের মনে রাখতে হবে বিশ্বে মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে একসঙ্গেই টিকে থাকতে হবে। কেউ কাউকে হারিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। স্যানিটেশন যেমন মানুষের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রাণীরও। মানুষের মতই প্রাণীরও প্রয়োজন যত্ন, পরিষ্কার, শব্দহীন ও সুন্দর পরিবেশ। উচ্চ শব্দে গৃহপালিত পশু থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীও ভালো থাকে না।’

বিজ্ঞাপন

আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ লাইভস্টক সার্ভিসেসের ডিরেক্টর জেনারেল ড. শেখ আজিজুর রহমান বলেন, ‘দেশে ১৯ মিলিয়ন ও সারাবিশ্বে ১.৫ বিলিয়ন মানুষ সরাসরি বনাঞ্চলের উপর নির্ভরশীল জীবন কাটান। মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি বনের উপর নির্ভরশীল। মানুষকে টিকে থাকার জন্য প্রকৃতি রক্ষা করতেই হবে। অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হলেও সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে প্রাণীকূল ঘুরে দাঁড়ায়। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ থাকা অবস্থায় চিড়িয়াখানাগুলোয় হরিণ ও ময়ূরের প্রজনন বাড়াই এর প্রমাণ।’

জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ডা. মো. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রাণীর প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন তারা। এতে নতুন প্রাণী জন্ম নিয়েছে, মৃত্যুহারও কমেছে। পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করায় বন্য প্রাণীরা প্রজনন করেছে ও শাবক জন্ম দিয়েছে। এখন পর্যন্ত তিন-চারশ হরিণ রয়েছে তাদের। বিক্রি করেছেন ৭৫টি। ১৬০টি ময়ূরের বাচ্চা বড় করছেন যাদের মধ্যে বিক্রি করেছেন প্রায় ৭৫টি। সবাই এগিয়ে এলে আগামী দশ বছরে আরও অসংখ্য বন্যপ্রাণী বাড়ানো সম্ভব হবে। হরিণ ও ময়ূর লোকাল প্রাণীতে পরিণত হবে।’

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি, অ্যানিম্যাল ও বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম. রাশেদ হাসনাত বলেন, মানুষের ভালবাসি পারে বন্যপ্রাণী টিকিয়ে রাখতে। সামান্য ভালবাসা দেখালেই পথ কুকুর, পাখি বা বানর পর্যন্ত মানুষের ভাষা বোঝে, বন্ধুত্ব করে। এই লকডাউনে তার প্রমাণ বারবার দেখা গেছে। এবারের প্রতিপাদ্যকে যুগোপযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সামর্থ্যবানসহ সমাজের সব পর্যায়ের মানুষ যেন প্রাণী রক্ষায় এগিয়ে আসে।

পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এবং প্রভা অরোরার উপদেষ্টা ডা. আফতাব উদ্দিনের সঞ্চালনায় সারাদেশের বিভিন্ন বিভাগ থেকে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগের প্রফেসর এবং বাংলাদেশ লাইভস্টক সোসাইটির সভাপতি ড. মো. জালাল উদ্দিন সরদার, দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআরটি’র পরিচালক প্রফেসর ড. মো. হারুন উর রশিদ, ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালযয়ের ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন রাজশাহীর সভাপতি ড. মো. হেমায়েতুল ইসলাম আরিফ এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ওমর ফারুক মিয়াজী।

পুরো আয়োজনটি প্রভা অরোরার ফেসবুক পেইজ থেকে লাইভ সম্প্রচারিত হয়।

সারাবাংলা/আরএফ/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন