বিজ্ঞাপন

লাইসেন্স না থাকলেও মোবাইল অপারেটরদের ওটিটিতে চলছে আইপিটিভি

October 8, 2021 | 10:39 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক— দেশের তিন মোবাইল অপারেটরই নিজেদের ওটিটি (ওভার দ্য টপ স্ট্রিমিং) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আইপিটিভি সেবা দিয়ে আসছে। গ্রামীণফোনের বায়োস্কোপ, রবির বিঞ্জ আর বাংলালিংকের টফি— তিনটি ওটিটি’তেই সরাসরি সম্প্রচার করা হয়ে আসছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র নীতিমালা বলছে, আইপিটিভি দেখাতে হলে নিতে হবে লাইসেন্স, যা মোবাইল অপারেটরগুলোর নেই।

বিজ্ঞাপন

খোদ বিটিআরসিই বলছে, মোবাইল অপারেটরগুলো তাদের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে (বায়োস্কপ, বিঞ্জ ও টফি) কীসের ওপর ভিত্তি করে টেলিভিশন চ্যানেল প্রচার করছে, তা তাদের জানা নেই। এ বিষয়ে জানতে মোবাইল অপারেটরগুলোকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিটিআরসি। অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরগুলো বলছে, ডাটা লাইসেন্সের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় তাদের জন্য আলাদা আইপিটিভির লাইসেন্স প্রয়োজন নেই। তারা নিয়ম অনুযায়ীই টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে।

বিটিআরসি বলছে, তিন মোবাইল অপারেটরের অনলাইনে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার কোনো অনুমোদন নেই। ইন্টারনেট ব্যবহার করে সম্প্রচার কার্যক্রম চালাতে হলে বিটিআরসির অনুমোদন লাগবে। এ পরিস্থিতিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তিন অপারেটর কীভাবে আইপিটিভি চালাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। বিটিআরসিতে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম চলছে।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসির এক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, মোবাইল অপারেটরা যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা বৈধ নয়। তারা আইপিটিভি বা টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করতে চাইলে তার জন্য কমিশনের অনুমতি নেওয়া দরকার ছিল। এখন চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হবে তারা কীভাবে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে— অনেক টিভি বা অপারেটর অনলাইনে তাদের আইপিটিভির কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যাদের অনুমোদন নেই। আমরা এরই মধ্যে অনুমোদনবিহীন ৫৯টি আইপিটিভির লিংক ব্লক করে দিয়েছি। এর বাইরে যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মোবাইল অপারেটর হলেও সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হবে। চিঠির উত্তর পাওয়ার পর সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

লাইসেন্স না থাকলেও মোবাইল অপারেটরদের ওটিটিতে চলছে আইপিটিভি

বিজ্ঞাপন

বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ জানিয়েছে, আইপিটিভি চালাতে হলে বিটিআরসির কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠাতা অর্থাৎ আইএসপিগুলোকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে। অন্যদিকে মোবাইল অপারেটরগুলো লাইসেন্স নিয়েছে সেলুলার মোবাইল সার্ভিস হিসেবে। এর আওতায় তারা ভয়েস, ডাটা ও এসএমএস সেবা দেওয়ার অনুমতি নিয়েছে। ফলে এসব সেবা দিতে তাদের আইএসপি লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আইপিটিভি চালাতে হলে নীতিমালা অনুযায়ী লাইসেন্স বা অনুমতি প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিটিআরসি’র সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, টেলিভিশন বা ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে বায়োস্কপ বা এরকম প্ল্যাটফর্মের চুক্তি হতে পারে। তখন তারা সেসব টিভি লাইভ করতে পারে। তবে এসব প্ল্যাটফর্মের ভেতের বিভিন্ন টেলিভিশনের লিংক কীভাবে যুক্ত হয়েছে, কোন প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে— এসবের কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই, তার ব্যাখ্যা আমরা চাইব।

বিজ্ঞাপন

এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘৬৫টি আইপিটিভির লাইসেন্সের মধ্যে কোনো মোবাইল অপারেটর নেই। অর্থাৎ তাদের আইপিটিভি চালানোর লাইসেন্স নেই।’

এদিকে, মোবাইল অপারেটরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের কেউ কেউ বলছেন, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চালানো হচ্ছে তা আদৌ আইপিটিভি নয়। কেউ কেউ ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে ওটিটি হিসেবেই স্বীকার করতে চান না। ওটিটি, আইপিটিভি— এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে উল্লেখ করে তারা বলছেন, এগুলো নিয়ে আরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

বায়োস্কপ ও খাত সংশ্লিষ্ট একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, বায়োস্কপ যে সেবা দিচ্ছে সেটি আইপিটিভি নয়। নেটফ্লিক্স, হইচই, জি ফাইভসহ যেসব ওটিটি দেশে পরিচালিত হচ্ছে, তাদেরও লাইসেন্স নেই। ওটিটি চালানোর জন্য আসলে লাইসেন্সেরই প্রয়োজন নেই। কারণ ওটিটির নীতিমালা হয়নি।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা আইপিটিভি দেখাচ্ছি না। আমরা ওটিটির ভেতরে কিছু চ্যানেল দেখাচ্ছি। সেই চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের অনুমোদিত চ্যানেল। অননুমোদিত কোনো চ্যানেল আমরা দেখাচ্ছি না। ওটিটির জন্য নীতিমালা না থাকা সত্ত্বেও আমরা সরকারের সাধারণ নির্দেশনা মেনে চলছি। ওটিটিতেও ক্লিন ফিড ছাড়া বিদেশি কোনো চ্যানেল দেখানো হচ্ছে না। আমাদের জন্য নির্দেশনা না থাকলেও আমরা নিজেরাই সরকারের সাধারণ নির্দেশনা অনুসরণ করছি।’ তবে কীসের ওপর ভিত্তি করে বায়োস্কোপ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার করছে, তা জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।

এদিকে, মোবাইল অপারেটর রবির দাবি, বিঞ্জ ওটিটি প্ল্যাটফর্মই নয়। তারা স্ট্রিমিং সেবা দিচ্ছে। টিভি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেই দেখানো হচ্ছে বিঞ্জে। এক্ষেত্রে তারা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবির কর্মকর্তারা সারাবাংলাকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টি (ওটিটি ও আইপিটিভি) নিয়ে সবার মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারকেই আগে নির্ধারণ করতে হবে কোনটি ওটিটি, কোনটি আইপিটিভি। সেখানে উল্লেখ করতে হবে কী কী করা যাবে কিংবা যাবে না। আর আমাদের লাইসেন্সের মধ্যেই বলে দেওয়া হয়েছে, আমরা ইন্টারনেটের সব সেবা দিতে পারব। তাই আলাদা করে আইএসপি লাইসেন্স প্রয়োজন নেই। আবার যে চ্যানেলগুলো দেখাচ্ছি, সেগুলো আইপিটিভিও নয়। তাই তার জন্যও লাইসেন্স প্রয়োজন নেই।’

সারাবাংলার জিজ্ঞাসার লিখিত জবাবে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, ‘আমরা আমাদের টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সের আওতার মধ্যে থেকেই অন্যান্য অংশীদারদের সহযোগিতায় ভ্যালু অ্যাডেড সেবা প্রদান করছি । লাইসেন্সের আওতার মধ্যে যেসব সেবা দেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে, আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী সেসব সেবাই আমরা দিয়ে যাচ্ছি।’

জানতে চাইলে লিখিত মন্তব্যে বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি আংকিত সুরেকা বলেন, ‘বাংলালিংক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি প্রতিষ্ঠান এবং দেশের আইন ও নীতিমালা মেনেই আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের বিনোদনমূলক টফি অ্যাপটিও দেশীয় বিদ্যমান আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে। সুস্থ ধারার বিনোদনের জন্য খুবই অল্প সময়ে অ্যাপটি সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।’ তবে গ্রামীণফোন এখন পর্যন্ত সারাবাংলা ডটনেটের পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

মন্তব্য জানতে চাইলে আইএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিডিকমের চিফ ইনফরমেশন অফিসার (সিআইও) আনোয়ার হাসান সাবির সারাবাংলাকে বলেন, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মোবাইল অপারেটরা কোনো টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করতে পারে না। কারণ আইপিটিভি পরিচালনার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কেবল আইএসপি সেবাদাতাদের। এসব আইএসপি অপারেটর আবার অন্য অপারেটরের গ্রাহকদেরও আইপিটিভি দেখাতে পারে না। কিন্তু মোবাইল অপারেটরদের ওটিটি যেকোনো নেটওয়ার্ক থেকে দেখা যায় বা ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ ওটিটিতে তাদের কোনোভাবেই আইপিটিভি পরিচালনা করার কথা নয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অপারেটরগুলো ওটিটিকে এখন নতুন করে স্ট্রিমিং বলছে কেউ কেউ। কিন্তু সাধারণভাবে বিবেচনা করলে তাদের (রবি ও অন্য অপারেটর) প্ল্যাটফর্মও ওটিটি-ই। স্ট্রিমিং একটি টেকনোলজি, আর ওটিটি একটি বিজনেস প্ল্যাটফর্ম।’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আইপিটিভি নিয়ে যেহেতু কথা উঠেছে, বিটিআরসি এখন এই শব্দটিকে পরিবর্তন করে স্ট্রিমিং সাইট বলতে চাচ্ছে। রবি হয়তো সে কারণেই তাদের ওটিটিকে স্ট্রিমিং বলছে। রবির ওটিটি যদি স্ট্রিমিংও হয়, কিন্তু সেটারও তো তাদের অনুমতি নেই। স্ট্রিমিং করার জন্য আমাদেরকে অনুমোদন নিতে হয়েছে, তারা কিন্তু কিছু নেয়নি। আবার তাদের বিঞ্জ কিন্তু অন্য নেটওয়ার্ক থেকেও ব্যবহার করা যাচ্ছে।’

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সারাবাংলাকে বলেন, আইপিটিভি ও ওটিটির প্রযুক্তি প্রায় একই। এগুলোর টেকনোলজি খুব কাছাকাছি। এখন টেকনোলজির ওপর নির্ভর করে যদি লাইসেন্স দেওয়া হয়, সেটি নানা সমস্যা তৈরি করবে। টেকনোলজি কোন দিকে যাচ্ছে, কনটেন্ট যেন ভালো থাকে ও রেভিনিউ যেন আসে, তার ওপর নির্ভর করে লাইসেন্স দেওয়া উচিত। আর পুরো বিষয়টি নিয়েই আমাদের মধ্যে একটি ধোঁয়াশা রয়েছে। যেহেতু প্রযুক্তি প্রায় কাছাকাছি, তাই প্রতিটি পক্ষই তার নিজের মতো করে ব্যাখ্য দিচ্ছে।

জানতে চাইলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সভাপতি আমিনুল হাকিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আইপিটিভি হচ্ছে মাল্টি-কাস্ট। নির্দষ্ট নেটওয়ার্কে এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। আর ওটিটি হচ্ছে ইউনিকাস্ট, যেকোনো ইন্টারনেট থেকে দেখতে পারবে। আর ওটিটিতে যেকোনো চ্যানেলই থাকতে পারে। কারণ ওটিটি একটি মিডিয়া। মিডিয়া যেকোনো মিডিয়ামের মাধ্যমে দেখাতে পারে।’ তার মতে, ওটিটিতে কনটেন্ট হিসেবে টিভি চ্যানেল সম্প্রচার হতে পারে।

অন্যদিকে আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, আইপিটিভি কেবল আইএসপিদেরই দেখানোর কথা। এজন্য আইএসপিএবি সেবাদাতাদের লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্স নিতে হয় বিটিআরসি থেকে। কিন্তু এখানে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনেরও একটি বিষয় রয়েছে। তবে আইপিটিভির নিয়ন্ত্রণ কেবল বিটিআরসির হাতে থাকা উচিত। আর আইপিটিভিগুলো দেশীয় কোনো চ্যানেলের সঙ্গে চুক্তি করে তা স্ট্রিমিং করতে পারে বা চালাতে পারে।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন