বিজ্ঞাপন

বিনামূল্যে ট্যাম্পুন ও প্যাড বিতরণের বিলে বলসোনারোর ভেটো

October 12, 2021 | 2:57 am

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্বাস্থ্যকর মাসিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্রাজিলে প্রতি চারটি মেয়ের একটি স্কুল থেকে ঝরে যায়। এ পরিস্থিতি বদলাতে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের বিনামূল্যে ট্যাম্পুন ও স্যানিটারি প্যাড দিতে বিল এনেছিলেন ব্রাজিলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা। কিন্তু দেশটির প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারো সে বিলে ভেটো দিয়েছেন। ফলে দেশটির সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে ট্যাম্পুন ও প্যাড বিতরণের উদ্যোগ ভেস্তে গেছে।

বিজ্ঞাপন

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ব্রাজিলের সুবিধাবঞ্চিত প্রায় ৫৬ লাখ বিভিন্ন বয়সী নারীদের বিনামূল্যে এসব স্বাস্থ্য উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগের আওতায় গৃহহীন নারীদের পাশাপাশি হাজতি ও সরকারি স্কুলের ছাত্রীদেরও রাখা হয়েছিল। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতেই ব্রাজিলের সংসদ সদস্যরা এসব নারীদের জন্য বিনামূল্যে মাসিক সংশ্লিষ্ট উপকরণ বিতরণের একটি বিলের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর ভেটোতে বিলটি আটকে গেছে।

প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর এই ভেটো নিয়ে অবশ্য ব্যাপক সমালোচনা চলছে ব্রাজিলে। বিভিন্ন ইস্যুতে বারবারই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে জড়িয়ে যাওয়া বলসোনারোর বিরুদ্ধে ফের প্রতিবাদ করছে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৪ জন সদস্যের একটি দল এই বিলের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। তাদের একজন ব্রাজিলের সমাজতান্ত্রিক দলের (পিএসবি) টাবাটা আমারাল। তার মতে, এই পরিকল্পনায় ভেটো দিয়ে প্রেসিডেন্ট অসহায় নারীদের প্রতি অবমাননা দেখিয়েছেন। আমারাল বলেন, বলসোনারো প্রকল্পটিকে জনস্বার্থবিরোধী বললেও আমি বলব— কেবল মাসিক হওয়ার কারণে এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধার অভাবে যখন একটি মেয়েকে বছরে ছয় সপ্তাহ স্কুল বাদ দিতে হয়, সেটিই বরং জনস্বার্থবিরোধী।

দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলের এসপিরিটো স্যান্টো অঙ্গরাজ্যের ভাইস গভর্নর জ্যাকুলিন মোরায়েসও প্রেসিডেন্ট বলসোনারোরি এই ভেটোর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে সুবধাবঞ্চিত নারীদের জন্য ট্যাম্পুন ব্যবহারের অধিকার কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।’ সেই প্রশ্নটিই উপেক্ষিত রয়ছে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলের ছাত্র সংগঠন ব্রাজিলিয়ান ইউনিয়ন অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টের (ইউবিইএস) সভাপতি রোজানা বারোসো প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর এই ভেটো দেওয়াকে ‘অমানবিক ও হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলছেন, যেখানে স্যানিটারি ন্যাপকিন না পাওয়ার কারণে অসংখ্য মেয়ে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, সেখানে প্রেসিডেন্টের এমন একটি অবস্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

রোজানা বলেন, ব্রাজিলের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েরা মাসিকের সময় কাগজ, খবরের কাগজ, এমনকি রুটির টুকরো পর্যন্ত ব্যবহার করে। মেনে নেওয়া কঠিন হলেও বাস্তবতা এটিই, বিশেষ করে বয়সে তরুণদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বেশি। মহামারির মধ্যে বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএ’র গত মে মাসের একটি প্রতিবেদন বলছে, ব্রাজিলের প্রায় ৭ লাখ ১৩ হাজার মেয়ের বাথরুম ব্যবহারের সুবিধা নেই। দেশটির প্রায় ৪০ লাখ কিশোরীর জন্য স্কুলে সাবান বা স্যানিটারি প্যাডের মত স্বাস্থ্য উপকরণের কোনো ব্যবস্থাই নেই। শুধু তাই নয়, অন্তত দুই লাখ মেয়ে শিক্ষার্থীর জন্য স্কুলে বাথরুম ব্যবহারের সুযোগ পর্যন্ত নেই।

এসব সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্যই বিনামূল্যে ট্যাম্পুন ও স্যানিটারি প্যাড বিতরণের প্রস্তাবটি এনেছিলেন দেশটির নেতারা। কিন্তু এই উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ কোটি ৪০ লাখ ব্রাজিলিয়ান রিয়েল কোথা থেকে আসবে, সেটি সুস্পষ্ট না থাকার কারণেই এই উদ্যোগের পক্ষ নেওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ব্রাজিল সরকার। তবে আমারাল বলছেন, দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় কারা তহবিল থেকেই এই অর্থের জোগান দেওয়ার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। আর সে কারণেই বলসোনারোর ভেটোর বিরুদ্ধেও তিনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

আমারাল বলছেন, ব্রাজিলের প্রায় অর্ধেক নারীকে মাসিকের সময় স্যানিটারি প্যাড বা ট্যাম্পুনের মতো স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণের বদলে তোয়ালে বা পুরনো কাপড় ব্যবহার করতে হয়। আর এ কারণে তাদের মধ্যে নানা ধরনের অসুস্থতা দেখা দেয়। কাউকে কাউকে অস্ত্রোপচারও করতে হয়। এ ধরনের অসুস্থতার চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের খরচও ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেই বহন করতে হবে— বলছেন তিনি।

রোজানা বারোসোও প্রেসিডেন্টের ভেটো সিদ্ধান্ত বদলে দিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে মাসিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপকরণ সংগ্রহ করতেও নিজের সংগঠনকে কাজে লাগাচ্ছেন। রোজানা বলেন, আমরা এমন দেশ চাই না। সে কারণেই আমাদের এই ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে আমরা বিলটি প্রণয়নে সহায়তা করেছিলাম। আমরা প্রেসিডেন্টের ভেটোর বিরুদ্ধেও লড়াই করব।

এর আগে, গত বছর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে স্কটল্যান্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড ও ট্যাম্পুন বিতরণ শুরু করে। ২০১৮ সালের নীতিমালা অনুযায়ী দেশটির স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাসিক ব্যবস্থাপনার এসব উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছিল। তবে গত বছর সব ধরনের পাবলিক প্লেসেই এগুলো বিনামূল্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড সম্প্রতি আগামী তিন বছরের জন্য স্কুলগুলোতে বিনামূল্যে ট্যাম্পুন বা স্যানিটারি প্যাড বিতরণে এক কোটি ৮০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

সারাবাংলা/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন