বিজ্ঞাপন

প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় বেড়েছে তালাকের সংখ্যা

October 15, 2021 | 11:00 pm

রাজনীন ফারজানা

ঢাকা: তালাক দেওয়ার যে আইনি প্রক্রিয়া তা সহজ হওয়ায় দিনদিন দেশে তালাকের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ তালাকের নোটিশ পাঠালে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আপস বা মীমাংসার চেষ্টা করার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সালিশ হয় না, যার ফলে নোটিশ পাঠানোর নব্বই দিনের মধ্যে তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তবে শুধু সহজ আইনি প্রক্রিয়ার কারণে নয়, সামাজিক নানা কারণেও তালাকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা ডটনেটের নিয়মিত আয়োজন সারাবাংলা লিগ্যাল চেম্বার পাওয়ার্ড বাই প্রিমিয়ার ব্যাংক অনুষ্ঠানে অতিথিরা এ সব কথা বলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফীনের সঞ্চালনায় এই পর্বে উপস্থিত ছিলেন আরও দুজন আইনজীবী। তারা তালাকের নিয়মকানুন ও বিদ্যমান আইনে কী কী সংশোধন আনা যেতে পারে সেটি নিয়ে আলোচনা করেন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল নম্বর ৭ এর স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আফরোজা ফারহানা আহমেদ অরেঞ্জ ও বিশেষ আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনোয়ার।

আলোচকরা এ সময় বলেন, তালাকের মাধ্যমে শুধু নারী-পুরুষই নয়, আক্রান্ত হয় পরিবারের শিশুরাও। আবার আমাদের দেশের বিদ্যামান সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের মাধ্যমে দুটো পরিবারও জোড়া লাগে। তাই তালাক ঘটলে দুই পরিবারও নানাভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তালাকের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় অনেকসময় সমাধানযোগ্য সমস্যাও এড়িয়ে যান। ফলে সংসার ভেঙে যায়, চাইলেই হয়ত বিষয়টি এড়ানো যেত।

বিজ্ঞাপন

যেমন বাংলাদেশে তালাকের অন্যতম কারণ বনিবনা না হওয়া। কিন্তু সেই বনিবনার না হওয়ার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কিনা তা অনেক সময় যাচাই করে দেখা হয় না। ফলে অনেকম ছোটখাট কারণেও তালাক ঘটছে, যা চাইলেই সমাধান করা যেত।

তালাকের নিয়মকানুন

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীরা বলেন, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী বিয়ে এবং তালাক উভয়ই রেজিস্ট্রেশন করতে হবে একজন কাজী বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে। আর বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তালাক নোটিশ পাঠানোর ৯০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর হয়।

তালাকের জন্য একটি বৈধ কারণ দেখাতে হয়। যিনি তালাক দেবেন তিনি কাজী বা ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। কাজী যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়ে দেন। স্ত্রীর কাছে অনেকসময় কাবিননামা দেখতে চাইলেও স্বামীর ক্ষেত্রে তাও চান না। কারণ মেয়েদের কাবিননামার আলাদা করে লেখা থাকতে হয় যে, তিনি তালাক দিতে পারবেন কিনা?

বিজ্ঞাপন

বিয়েতে প্রস্তাবনা, প্রস্তুতি, সাক্ষী, দেনমোহর, পরিবার-পরিজন ইত্যাদি নানা বিষয় যুক্ত থাকে। কিন্তু বিয়ে ভাঙার সময় তেমন কোনো ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া লাগে না। শুধুমাত্র তালাকের ইচ্ছা পোষণ করলেই হয়। সালিশ বা সমাধানের চেষ্টা ছাড়াই সেটি কার্যকরও হয়ে যায়।

তালাকের নোটিশ তিন জায়গায় পাঠানোর নিয়ম। অপরপক্ষ, সালিসি পরিষদ ও স্থানীয় চেয়রম্যান বা কমিশনারের কাছে পাঠাতে হয়। সালিসি পরিষদ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে দুইপক্ষকে একত্রিত করে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করে দাম্পত্য জীবন পুনরুদ্ধারের চালাবেন। কিন্তু অনেকসময় এটি করা হয় না। যে কারণে খুব সহজেই সংসার ভেঙে যাচ্ছে। এর ফলে নারী-পুরুষ উভয়েই নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেকসময় স্ত্রীকে এক কাপড়ে বের হয়ে আসতে হয়। এ সব ক্ষেত্রে তালাকের পর সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা, সন্তানের কাস্টডি ইত্যাদির মীমাংসা কীভাবে হবে তার কোনো সুরাহা না হয়েই নব্বই দিনের মাথায় তালাক কার্যকর হয়ে যায়। অনেকসময় এক পক্ষের তালাকের আবেদনের সালিশে অন্য পক্ষ উপস্থিতও থাকে না।

সমাধানের পথ

আইনজীবীরা বলেন, তালাক সবসময় সমস্যা নয় এটি অনেকের জন্য সমাধানও। বিশেষ করে নির্যাতন বা অশান্তিতে ভরা সংসারের ক্ষেত্রে তালাক সমাধান। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় অনেকেই নির্দিষ্ট যৌক্তিক কারণ না দেখিয়ে 'বনিবনা না হওয়া'কে কারণ হিসেবে দেখিয়ে বিয়ে ভাঙছেন। বনিবনা নানা কারণেই নাও হতে পারে। আলোচনার ভিত্তিতে বা বুঝিয়ে হয়ত সেসব সমস্যার সমাধান করা যায়।

আবার তালাকের পরে সম্পত্তির অধিকার, ভরণপোষণ, সন্তানের কাস্টডি নিয়ে আলাদা মামলা করছেন। তালাকের বিষয়টি সরাসরি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলে বা সালিশি প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করলে হয়ত অনেক সমাধানযোগ্য কারণ খুঁজে বের করে সেগুলো নিষ্পত্তি করা যেত। এর জন্য প্রয়োজনে মনোবিদ নিয়োগ করে স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা সমাধানে উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়াও তালাক নোটিস পাঠানোর পর দুইপক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার জন্য সালিশি বৈঠকও বাধ্যতামূলক করতে হবে যেন ৯০ দিনের মধ্যে স্বয়ংস্ক্রিয়ভাবে তালাক কার্যকর হয়ে না যায়।

সারাবাংলা/আরএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন