বিজ্ঞাপন

জট খুলতেই ১০ বছর, এবার কাজ শুরুর ইঙ্গিত!

October 18, 2021 | 11:30 pm

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীর যানজট কমাতে সরকারের বড় উদ্যোগগুলোর মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা উড়াল সড়ক নিমার্ণ পরিকল্পনা অন্যতম। ১০ বছর আগে রাজধানীকে ঘিরে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা ও অর্থায়ন সমস্যার কারণে একটি প্রকল্পের কাজও ঠিক সময়ে শুরু করা যায়নি। ১০ বছরে চার বার সময় পিছিয়ে ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। কিন্তু ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ের কাজ এখনও শুরুই করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অর্থের সংস্থান হয়ে গেছে। শিগগিরই পুরো দমে কাজ শুরু হবে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

রাজধানী ঢাকার যানজট কমাতে ২০১৭ সালের অক্টোবরে সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইন্টারসেকশন থেকে শুরু হয়ে আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল ও নবীনগর চন্দ্রা মহাসড়কের ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ডিইপিজেড) গিয়ে শেষ হবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। মূল উড়াল সড়কের র্দৈঘ্য হবে ২৪ কিলোমিটার। বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে উড়াল সড়কে ওঠানামার জন্য প্রায় ১০ কিলোমিটার র্দৈঘ্যের ১৬টি সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নবীনগর এলাকায় নির্মাণ করা হবে ১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য একটি ফ্লাইওভার, ২ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সেতু, ৫০০ মিটার ওভারপাস, ইউটিলিটির জন্য ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ ও ডাক্ট এবং পাঁচটি টোল প্লাজা। এই উড়াল সড়কে চলাচল করতে হলে প্রতিটি গাড়িকে টোল দিতে হবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা, আশুলিয়া, সাভার এলাকার যানজট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এই এক্সপ্রেসওয়ে। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে আন্তঃদেশীয় সড়ক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করবে এই উড়াল সড়ক।

বিজ্ঞাপন

চার বছরে অগ্রগতি শূন্য

২০১৭ সালের অক্টোবরে একনেকে অনুমোদন পাওয়া ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ২০২২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু অর্থায়ন জটিলতায় গত চার বছরেও এই প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি সরকার। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থায়ন জটিলতা কেটে যাচ্ছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হচ্ছে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এর সিংহভাগ অর্থাৎ ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকাই দেবে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাকি ৫ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা খরচ হবে সরকারের। প্রকল্প সুত্রে জানা যায়, চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনকে (সিএমসি) এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৭ সালে নিয়োগ দেয় সরকারের সেতু বিভাগ। কিন্তু যথা সময়ে অর্থের সংস্থান না করতে পারায় কাজ শুরু করা যায়নি। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন কাজ শুরু হলেও শেষ করতে অন্তত ২০২৪ সাল পার হয়ে যাবে।

এগিয়েছে যতটুকু

বিজ্ঞাপন

ঢাকা-আশুলিয়া উড়াল সড়কের দৈর্ঘ্য হবে মোট ২৪ কিলোমিটার। কাগজে কলমে এই প্রকল্পের বয়স চার বছর পার হতে চললেও অগ্রগতি শূন্যেই রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবধরনের জটিলতা কাটিয়ে মাত্র কাজ শুরু হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উড়াল সড়কটির পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি যার উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের মাধ্যমে মাটির ধারণ ক্ষমতা যাচাই করা হবে। পুরো প্রকল্প এলাকায় সব মিলিয়ে ২২টি পরীক্ষামূলক পাইলিং হবে। প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ এটি। এর মধ্যে দিয়েই কাজ শুরু হলো। এদিকে, বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজও বর্তমানে চলমান। এই উড়াল সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের কর্মকর্তারা যা বললেন

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক শাহাবুদ্দিন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল তা কেটে গেছে। ইতোমধ্যে চীন সরকারও ঋণ অনুমোদন দিয়েছে এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগও প্রস্তুত। করোনার কারণে মুখোমুখি বসা সম্ভব না হওয়ায় চুক্তির জন্য চীনের কাছে চুক্তিপত্র পাঠিয়েছি। এখন চীন তাতে অনুমোদন দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই পুরো দমে কাজ শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন যে কাজ শুরু হয়েছে তা একেবারেই প্রাথমিক এবং পরীক্ষামূলক। কাজ নিয়ে আমাদের কোনো গাফলতি নেই। আমরাও চাই কাজটি দ্রুত শেষ করতে। কিন্তু যেহেতু নানা সমস্যার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি, সেহেতু শেষ হতে একটু দেরি তো হবেই। আমাদের টার্গেট ২০২৪ সালের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা।’

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

রাজধানীর যানজট কমাতে আরেক প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ বর্তমানে চলমান। হযরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমান বন্দর-কুড়িল-বনানী, মহাখালী-তেজাগাঁও-মগবাজার-কমলাপুর-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী (ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক) পর্যন্ত প্রায় ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় চার বছর। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) প্রকল্পটি তিন ধাপে নির্মাণের কাজ শুরু করে সেতু বিভাগ। প্রথম ভাগের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয় ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় ধাপে ৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার এবং তৃতীয় ধাপে প্রকল্পের বাকি অংশ শেষ করার কথা।

কিন্তু জমি অধিগ্রহণ ও বিনিয়োগ জটিলতায় এ প্রকল্পের কাজও ঠিক সময়ে শুরু করা যায়নি। চার বছর মেয়াদের প্রকল্প ১০ বছরেও শেষ করা যায়নি। তবে সব জটিলতা কাটিয়ে এখন দৃশ্যমান ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি সাইটেই কাজে গতি এসেছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রথম ধাপের ভৌত অগ্রগতি শতকরা ৬৬ দশমিক ২৫ ভাগ, দ্বিতীয় ধাপের ভৌত অগ্রগতি শতকরা ২১ দশমিক ৫০ ভাগ এবং তৃতীয় ধাপের ভৌত অগ্রগতি শতকরা ২ দশমিক ৩৩ ভাগ। আর প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৩০ দশমিক ৫০ ভাগ। এই উড়াল সড়কের সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটিতে আছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, “২০১০ সালে যখন সরকার এ প্রকল্প হাতে নেয়, তখন গুরুত্বপূর্ণ দু’টি প্রজেক্ট ছিল। একটি ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’, আরেকটি ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’। তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ন্যাশনাল কন্ট্রাক্টে পদ্মাসেতু আর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের। তাহলে সাভার-আশুলিয়ার কি হবে? তখন পরিকল্পনা করা হয় আরেকটা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের।” তিনি বলেন, ‘পরিক্ল্পনা করা হয় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের। কিন্তু প্রকল্পটি জিটুজি হলেও এখানেও অর্থায়ন জটিলতা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে ওই সময় কাজটি শুরু করা যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়ন করা গেলে এবং সেইসঙ্গে আমরা যদি রিং রোডটা করে ফেলতে পারি তাহলে ঢাকার চেহারাই পাল্টে যাবে। মানুষ যানজট থেকে বড়ধরনের স্বস্তি পাবে। পাশপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখবে এই উড়াল সড়কগুলো।’

সারাবাংলা/জেআর/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন