বিজ্ঞাপন

বিএসএমএমইউতে পেট-সিটি ল্যাব, ক্যানসার নির্ণয়ে খরচ কমবে অর্ধেক

October 24, 2021 | 11:05 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশে প্রথমবারের মতো স্থাপন করা হয়েছে প্রাণঘাতী ক্যানসার গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সাইক্লোট্রন সুবিধাদিসহ সর্বাধুনিক পেট-সিটি (পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি) প্রযুক্তি। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনস্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসের (নিনমাস) আওতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) দু’টি পেট-সিটি মেশিন, রেডিও কেমিস্ট্রি সুবিধাসহ একটি সাইক্লোট্রন মেশিন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও একটি পেট-সিটি মেশিন স্থাপন করা হয়। এই প্রযুক্তি দেশের ক্যানসার চিকিৎসাকে আরও একধাপ এগিয়ে দেবে।

বিজ্ঞাপন

রোববার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টায় বিএসএমএমইউ’র এফ ব্লকের অনকোলজি বিভাগে সাইক্লোট্রন সুবিধাসহ পিইটি-সিটি ল্যাব স্থাপন অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।

বিএসএমএমইউতে পিইটি-সিটি ল্যাব স্থাপন অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিশ্বে ৯০ শতাংশের বেশি ক্যানসার শনাক্ত করা হয় পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফি (পিইটি) ও সিঙ্গেল প্রোটন ইমিশন কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (এসপিইসিটি) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু এই দুই প্রযুক্তিতে পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। ফলে সরকারিভাবে ৩৫ হাজার এবং বেসরকারিভাবে ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হতো। এবার সেই খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলেন, যেহেতু পেটসিটির মাধ্যমে দ্রুত ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব, তাই এ পদ্ধতিটি হতে পারে ক্যানসার নিরাময়ের কার্যকরী মাধ্যম।

চিকিৎসকরা বলেন, এটি আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম উদাহরণ। অনেক সময় রোগীর জীবন ও মৃত্যুর মাঝে সহায়ক ভূমিকাটাই পালন করে। পেট সিটি অন্যান্য ইমেজিং টেকনোলজি যেমন- এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাম, এমআরআই প্রভৃতি প্রযুক্তি থেকে ভিন্নমাত্রার। কারণ ওগুলো শুধু শরীরে টিউমারের আকার, আকৃতি, অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়। কিন্তু পেট সিটি ক্যানসার (ম্যালিগন্যান্ট টিউমার) বা ক্যানসার নয় (বিনাইন টিউমার) দুটো সম্পর্কেই ধারণা দিতে সক্ষম।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি টিউমার বা শরীরে অ্যানাটমিকাল অ্যাবনরমালিটি বা ক্যান্সার আক্রান্ত স্থান শনাক্ত করতে পারে। সেইসঙ্গে পারে শরীরের প্রতিটি কোষের অ্যাবনরমাল মেটাবলিক এবং বায়োক্যামিকাল অ্যাক্টিভিটি শনাক্ত করতে।

বিএসএমএমইউতে পেট-সিটি ল্যাব, ক্যানসার নির্ণয়ে খরচ কমবে অর্ধেক

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের আওতায় সৃষ্ট চিকিৎসা ও গবেষণা সুবিধা প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে দুটি পেট-সিটি মেশিন এবং রেডিওকেমিস্ট্রিসহ একটি সাইক্লোট্রন মেশিন স্থাপন ও ঢামেকে একটি পেট-সিটি মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এই সাইক্লোট্রন সুবিধাদিসহ পেট-সিটি, দেশের ক্যানসার চিকিৎসায় যুগান্তকারী অবদান রাখতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘শরীরে যেসব স্থানের কোষগুলো বেশি সক্রিয় থাকে পেট স্ক্যান কেবল সেইসব স্থানের চিত্র বা তথ্য দিয়ে থাকে। অপরদিকে সিটি স্ক্যান কোনো স্থানের গঠনগত এবং অবস্থানগত তথ্য বা চিত্র সূক্ষ্মভাবে প্রদান করে। এই দুটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গঠিত স্ক্যানারে একটি ফিউশন ইমেজ একই সময়ে পাওয়া যায়।’

বিজ্ঞাপন

নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এই দুটো ইমেজের সমন্বিত ইমেজটি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসককে শরীরের যেসব স্থানের কোষগুলো বেশি সক্রিয় অর্থাৎ ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলো খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। এ পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বা চিত্র চিকিৎসককে কোনো বেদনাদায়ক পরীক্ষা এবং সার্জারি ছাড়াই রোগ নির্ণয় করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে সাহায্য করে। একটি নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার ফলাফল পর্যবেক্ষণ করতেও এই পরীক্ষাটি করা হয়।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। তিনি বলেন, ‘এই সাইক্লোট্রন স্থাপনের মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসা বাংলাদেশের আপামর জনগণের সাধ্যের মধ্যে থাকবে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে উপকৃত হবে। এর মাধ্যমে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া ক্যানসার চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশে যাওয়ার হার কমবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সুবিধা পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অবস্থিত পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থাপন করা হবে। বর্তমানে ১৫টি পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র চালু রয়েছে। আরও আটটি নির্মাণ করা হচ্ছে।’

ইয়াফেস ওসমান বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে এ খাতে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে বাংলাদেশ। এ ছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণাতেও এই ল্যাব ভালো অবদান রাখবে। এই যন্ত্র ও ল্যাব স্থাপনের ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাত আরও এগিয়ে যাবে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সানোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব সাইক্লোট্রন ল্যাব স্থাপনের ফলে ক্যানসার নির্ণয়ের খরচ কয়েকগুণ কমে আসবে। আগে রেডিও আইসোটোপ আমদানি করতে হতো বা বেসরকারি ল্যাব থেকে কিনতে হতো। ফলে খরচ বেশি হতো। আমরা এই ল্যাব থেকে এখন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ল্যাবে রেডিও আইসোটোপ সরবরাহ করব।’

এই প্রযুক্তি ব্যবহারে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় ক্যানসার নির্ণয় সম্ভব বলেও জানান পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সানোয়ার হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সদস্য (জীব বিজ্ঞান) অধ্যাপক ডা. অশোক কুমার পাল এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আগত প্রায় তিনশ’ অতিথি।

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, তখন বিশ্বে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ দশমিক ১ মিলিয়ন আর মৃত্যু হার ছিল ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ২১ দশমিক ৭ মিলিয়নে। যেখানে মৃত্যু হার হবে ১৩ মিলিয়ন।

সারাবাংলা/এসবি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন