বিজ্ঞাপন

লোকসান ঠেকাতে ডিজেল-ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়াতে চায় বিপিসি

October 27, 2021 | 10:34 pm

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছেই। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে তেল ও গ্যাসে দাম বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। বিশ্ব বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি দিন ২০ কোটি টাকার লোকসান গুনছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এ পরিস্থিতিতে বিপিসি এসব জ্বালানির মূল্য পুনঃনির্ধারণ, তথা দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হতে পারে বলেও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে। তবে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে জনগণের ওপর চাপ বাড়ানোর বদলে সরকারকেই ভর্তুকি দেওয়ার পক্ষে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপন

সরকারের জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের সিংহভাগই বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। গত এক বছর ধরেই বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তি। কিন্তু বাংলাদেশে তা বিক্রি করতে হচ্ছে আমদানি মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে। এ কারণে সরকারকে মোটা অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, গত ২০ অক্টোবর ডিজেলের ব্যারেল প্রতি FOB (ফ্রি অন বোর্ড) মূল্য ছিল ৯৪ দশমিক ৫৯ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশে ডিজেলের বর্তমান বাজারমূল্য প্রতি লিটার ৬৫ টাকা। সে হিসাবে ডিজেলে লিটার প্রতি বিপিসি লোকসান গুনছে ১৩ টাকা ৭৭ পয়সা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, গত ২০ অক্টোবর ফার্নেস অয়েলের প্রতি ব্যারেল FOB মূল্য ছিল ৪৮৭ দশমিক ২১ মার্কিন ডলার। এর পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে গত ৮ অক্টোবর ফার্নেস অয়েলের দাম লিটার প্রতি ৫৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৯ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও ফার্নেস অয়েলে লিটারে ৫ টাকা ৭৩ পয়সা লোকসান দিতে হচ্ছে বিপিসিকে। বর্তমান পরিস্থিতি এমন— এখন প্রতিদিন ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলে বিপিসিকে প্রায় ২০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। সে হিসাবে বছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

বিপিসি সূত্রগুলো বলছে, এ পরিস্থিতিতে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম সমন্বয় ছাড়া লোকসান থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছে বিপিসি। কিন্তু আইন অনুযায়ী পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল ও অকটেন দাম বিপিসি নির্ধারণ করতে পারলেও ডিজেলের দাম সমন্বয়ের এখতিয়ার রয়েছে খোদ জ্বালানি বিভাগের হাতে। কিন্তু আন্তজার্তিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় করতে ডিজেলের দামও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে চায় বিপিসি। ফলে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হতে পারে বলে বিপিসি সূত্রে জানা গেছ।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসি চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে। এখন এমন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে দেশের বাজারে আমদানি মূল্যের চেয়ে কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে বিপিসিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েল বা ডিজেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিষয়টি জ্বালানি বিভাগকে অবহিত করা হবে।

কেবল দাম বাড়ানো নয়, বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাও চায় বিপিসি। জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েলের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানের হাতে এরই মধ্যেই রয়েছে। এর বাইরে অন্য যেসব তরল জ্বালানি রয়েছে, সেগুলোর দাম নির্ধারণের ক্ষমতাও বিপিসির কাছে দিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু তাই নয়, দেশের বাজারে ডিজেলের দাম কম থাকায় তা পাচারের শঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী ভারতে প্রতি লিটার ডিজেলের বাজারমূল্য ৯৯ দশমিক ৪৩ রুপি, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১২৩ টাকা। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজেলে লিটার প্রতি বাজারমূল্যের পার্থক্য প্রায় ৫৮ টাকা। ফলে বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিয়ে ডিজেল বিক্রি করলেও সেই ডিজেল ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করছেন কনজ্যুমার অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, সরকারের এই চিন্তা-ভাবনা জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেল-গ্যাসের দাম কম ছিল, তখন কিন্তু সরকার দাম সমন্বয় না করে লাভ করেছে। এখন করোনাকালে মানুষের আয় ব্যাপক পরিমাণে কমে গেছে। তাদের নানাভাবে সুরক্ষা দেওয়া দরকার। তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি, ঠিক আছে। কিন্তু তেল যে দামে বিক্রি করা হচ্ছে, সেখানে ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য তো টাকা আছে। সেই টাকা দিয়ে আমরা সমন্বয় করব। মানুষে ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দাম বাড়াতে হবে কেন?

বিজ্ঞাপন

ড. শামসুল আরও বলেন, সরকার যে ঘাটতির কথা বলছে তা ভোক্তাদের জানার অধিকার রয়েছে। সমন্বয় করতে হলে তেল-গ্যাসের ঘাটতি জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের দায়িত্ব বিইআরসির। সেখানে তাদের (বিপিসি) আসতে হবে। তা না করে যদি নিজেদের মতো মূল্য সমন্বয় করে, সেটি কল্যাণমূলক অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ালে বিদ্যুতের দামও স্বাভাবিকভাবে বাড়াতে হবে। এতে জনগণের ওপরে বড় ধরনের চাপ পড়বে।

এদিকে, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লোকসান কমাতে গ্যাস ও তেলের দাম বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। আর স্বাভাবিকভাবে তেল-গ্যাসের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বে বিদ্যুতেও। বিদ্যুতের দাম ২০২০ সালে  সবশেষ প্রতি ইউনিটে ২৫ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তার আগের বছর বাড়ানো হয়েছিল গ্যাসের দাম। ডিজেলের দাম সবশেষ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৬ সালে। তবে জ্বালানি বিভাগ চাইলেই আবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারবে না। কেননা গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে।

সারাবাংলা/জেআর/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন