বিজ্ঞাপন

ঢাকায় এত গরম কেন

November 6, 2021 | 1:06 pm

রাজনীন ফারজানা, সিনিয়র নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন। পেশায় রিকশাচালক। ১৯৯৯ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। বলছিলেন, এই কার্তিক মাসের মাঝামাঝি এসেও গরমে রিকশা চালাতে বেশ কষ্ট হয়। সন্ধ্যার পর গরম কিছুটা কমলেও দিনে বেশ গরম লাগে। শেষরাতের দিকে পায়ের ওপর একটা পাতলা কাঁথা দিতে হলেও এখনো সারারাত ফ্যান ছেড়েই ঘুমাতে হচ্ছে। বিল্লাল হোসের সঙ্গে সুর মেলালেন আশপাশের বাকি রিকশাচালকরাও।

বিজ্ঞাপন

যখন থেকে ঢাকায় এসেছেন, তখন থেকেই এমন গরম নাকি সাম্প্রতিক সময়ে গরমটা বেশি লাগছে— এমন প্রশ্নের জবাবে বিল্লাল হোসেন বলছেন, ২২ বছরের অভিজ্ঞতায় ঢাকার গরমটা প্রায় একই দেখছেন তিনি। তবে টাঙ্গাইলের পরিস্থিতি ভিন্ন। শীত না এলেও বছরের এই সময়টায় সেখানে বেশ ঠান্ডা ছিল। রীতিমত কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হতো, যা ঢাকায় চিন্তাও করা যায় না। এমনকি ঢাকায় ভরা শীত মৌসুমেও ‘অতটা’ শীত লাগে না— বলছেন বিল্লাল হোসেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় মধ্য কার্তিকের এই সময়টায় রাত থেকে ভোর বা সকাল পর্যন্ত তাপমাত্রা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে শীতের আগেই শীতের আভাস ছড়িয়েছে অনেক এলাকাতেই। তবে ঢাকার চিত্র ভিন্ন। শেষরাত বা ভোরের দিকে কিছুটা কম তাপমাত্রা অনুভব করা গেলেও দিনের বেলা ঠান্ডার লেশমাত্র নেই। বরং এখনো দিনের গরমে ঘেমে নেয়ে উঠতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- ‘যথাসময়ে’ই আসবে শীত

এ তো শীত আগমনের আগের সময়ের কথা। নগরবাসীরা বলছেন, পৌষ-মাঘের শীতেও ঢাকায় শীতের আমেজটা যেন পুরোপুরি উপভোগ করা যায় না। দেশের অন্য এলাকাগুলো, বিশেষ করে উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যখন লেপ কিংবা ভারী কম্বলেও শীত মানে না, তখনো ঢাকায় একটু ভারী কাঁথা কিংবা হালকা কম্বলেই যেন শীত মৌসুম পার হয়ে যায়। ভারী জ্যাকেট-সোয়েটারেরও খুব একটা প্রয়োজন হয় না। কেবল শৈত্যপ্রবাহ এলেই শীতের পোশাকের গুরুত্বটা বেড়ে যায় ঢাকায়।

বিজ্ঞাপন

গ্রিন হাউজ ইফেক্ট, বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো নিয়ামকগুলোর কারণে এমনিতেই সারাবিশ্বে উষ্ণতা বাড়ছে। তার একটি প্রভাব পড়ছে সারাবিশ্বেই। কিন্তু ভরা শীতে দেশের অন্য অঞ্চলের তীব্র শীতের বিপরীতে ঢাকার উষ্ণ থাকার পেছনে আলাদা কোনো কারণ আছে কী?

পরিবেশবিদরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টির পাশাপাশি এ ক্ষেতে বড় ভূমিকা রাখছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। মাত্রাতিরিক্ত কংক্রিট স্থাপনার কারণে ঢাকার তাপধারণ ক্ষমতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দুই থেকে তিন ডিগ্রি বেশি। এদিকে, নাগরিক স্থাপনা দিনে সূর্যের তাপ ধরে রাখলেও রাতে সেটি কমে যাওয়ার জন্য যে পরিমাণ সবুজ ও জলাশয় প্রয়োজন, ঢাকায় নেই তার উপস্থিতিও। সব মিলিয়ে ঢাকা রূপান্তরিত হয়েছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ডে’। সে কারণেই এই মধ্য কার্তিকেও রাতে কুয়াশা বা ধোঁয়াশার আভাস কিছুটা চোখে পড়লেও সেভাবে ঠান্ডার অনুভূতি এখনো নেই রাজধানীতে। একই কারণেই ভরা শীতেও কিছুটা হলেও গরমই থাকে ঢাকা।

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৬ নভেম্বর) ঢাকায় দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকার কথা। পূর্বাভাস অনুযায়ী আজ ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ১৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যেখানে উত্তরাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। শুক্রবার ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় শ্রীমঙ্গলে। এদিকে গত বৃহস্পতিবার সৈয়দপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় সারা দেশের সঙ্গে সামান্য পার্থক্য থাকলেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় পার‍্য পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য আরও বলছে, বাংলাদেশ থেকে বুধবার (২৭ অক্টোবর) বর্ষাকাল বিদায় নিয়েছে। এখন বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ কমে গেলে শীত নেমে আসবে। এমনিতেই গত কয়েকদিন ধরেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকছে। অর্থাৎ শীত এগিয়ে আসছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের মতোই নভেম্বরের মাঝ বরাবর দেশে শীত আসবে— এমনটিই বলছেন আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক।

বিজ্ঞাপন

এমন সময়েও ঢাকায় এত গরম লাগার কারণ ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল বারী সারাবাংলাকে বলেন, বিশ্বজুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশের তাপমাত্রাও বেড়েছে। তবে দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় ঢাকার তাপমাত্রা কিছুটা বেশি— প্রায় দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর কারণ এখানে কংক্রিট স্থাপনা বেশি। সে তুলনায় গাছপালা ও জলাশয় অনেক কম।

পরিবেশগত বিপর্যয়ের চেয়ে বরং মানবসৃষ্ট কারণগুলোই তাপমাত্রা বেশি থাকার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে— এমন মন্তব্য স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও স্টামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কংক্রিটের স্থাপনা বেশি থাকার পাশাপাশি সবুজায়ন ও জলাশয় কম থাকার বিষয়টি তো আছেই। এর পাশাপাশি আরেকটি বড় কারণ ঢাকার রাস্তায় চলা ১৫ লাখেরও বেশি গাড়ি। এসব গাড়ি গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও ঢাকায় বাসাবাড়ি ও অফিসে কয়েক লাখ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি চলে। দুয়েক টনের একটি এসি একশ বর্গফুট আবদ্ধ এলাকাকে ঠান্ডা করার বিনিময়ে বাইরে অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ বর্গফুট খোলা জায়গার উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। তাই বলা যায়, এসির ‘কুলিং ইফেক্টে’র তুলনায় ‘ওয়ার্মিং ইফেক্ট’ অনেক বেশি। ঢাকায় নগরায়নের ফলে বেড়ে চলা গাড়ি ও এসির জন্য তাই তাপমাত্রাও বাড়ছে।

তিনি বলেন, এসব যন্ত্রপাতি অনেক বেশি পরিমাণে তাপ শোষণকারী গ্যাস উৎপাদন করছে, যেগুলোকে গ্রিনহাউজ গ্যাস বা জিএইচজিও বলা হয়। এরা দিনের বেলা সূর্য থেকে আসা তাপ গ্রহণ করে ধরে রাখে এবং আমাদের আশপাশের পরিবেশ গরম রাখে। পর্যাপ্ত গাছপালা না থাকায় অতিরিক্ত এই তাপ শোষণ হচ্ছে না। ফলে আমাদের অতিরিক্ত গরম লাগছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় কংক্রিট স্থাপনা বেশি থাকার কারণে এটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ডে’ রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ এখানে কংক্রিট স্থাপনাগুলো দিনে সূর্যতাপ গ্রহণ করে ধরে রাখে। সূর্যাস্তের তিন ঘণ্টা পর ধীরে ধীরে এই তাপ কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওই সময় এই তাপ কংক্রিট থেকে বের হলেও সেগুলো শোষণ করার উপযোগী পর্যাপ্ত গাছপালা ও জলাশয় নেই। ফলে তাপমাত্রা কমতে কমতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সে কারণেই ভোর ৩টা বা ৪টার দিকে গিয়ে হালকা ঠান্ডা তা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার অনুভূতি পাওয়া যায়।

ড. সাইফুল বারী ও ড. আহমেদ কামরুজ্জামান দু’জনেই বলছেন, পরিবেশ ঠান্ডা রাখতে জলাশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ ঢাকায় তেমন জলাশয় নেই বললেই চলে। ঢাকাকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা নদীগুলোও এ ক্ষেত্রে সুবিধা নিতে পারছে না। কারণ কারণ নদীতীর বরাবর গড়ে উঠেছে সুউচ্চ ভবন ও স্থাপনা। এগুলোর কারণে নদীর শীতল বাতাস ঢাকায় প্রবেশ করতে পারছে না। এই বাতাস শহরে ঢুকলেও পরিবেশ অনেকটাই শীতল থাকতে পারত। এর ফাঁক দিয়েও যতটুকু বাতাস প্রবেশ করতে পারে, সেটুকুও ঢাকার অভ্যন্তরীণ আকাশচুম্বী সব স্থাপনার কারণে চলাচল করতে পারে না। তার ওপর ঢাকার নগরায়নও অপরিকল্পিত। পাশাপাশি দু’টিপ বাড়ির মধ্যে ফাঁকা জায়গা নেই। বাড়ির মধ্যেকার ঘরগুলোও বাতাস চলাচলের উপযোগী করে বানানো হয় না। কোনো একটি স্থানে বায়ু চলাচলের সুবিধা না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই গরম অনুভব হয় বেশি— এ পরিস্থিতিরই শিকার আমাদের ঢাকা।

ঢাকা কি তবে দিন দিন উত্তপ্ত চুল্লি হয়ে উঠবে? এ থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই?— এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেই সুর মেলাচ্ছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু নাসের খান। তিনি বলেন, ঢাকার স্থানীয় সমস্যা যেমন— অতিরিক্ত কংক্রিট স্থাপনা, গাড়ি ও এসির ব্যবহার— এগুলো চাইলেই কমানো যায়। ঢাকার পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পরিবেশ অধিদফতর, রাজউক, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সমন্বয় করতে পারে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই জায়গাটিতেই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

আবু নাসেরের মতে, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে ও রাখতে সবাইর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে তাদের কাজের পরিধি আরও বাড়াতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় যেসব আইন আছে, তার প্রয়োগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতরের আন্তর্জাতিক কনভেনশন বিভাগের উপপরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদও ঢাকার ‘আরবান হিট আইল্যান্ডে’ রূপান্তরিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নিলেন। ঢাকার উষ্ণায়ন ঠেকাতে পরিবেশ অধিদফতর এককভাবে কিংবা অন্যদের নিয়ে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন ও রাজউকসহ একাধিক সংস্থা বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় করে থাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। আর আমরা মূলত দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করে থাকি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় করে নীতিনির্ধারণের কাজটি পরিবেশ মন্ত্রণালয় করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব কোনো একক দেশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে গাছপালা বাড়ানো, জলাশয় উদ্ধার, কংক্রিটের স্থাপনা কমানো ও গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো গেলে ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী রাখা সম্ভব। আর সেটিও একদিনে সম্ভব নয়। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তারা সেভাবে উদ্যোগ নিয়ে তাদের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সেই উদ্যোগে যুক্ত করতে পারলে তবেই এ কাজে মিলবে সাফল্য।

সারাবাংলা/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন