বিজ্ঞাপন

সাম্প্রদায়িক হামলা: চট্টগ্রামে গণশুনানিতে ৫৬ জনের সাক্ষ্য

November 14, 2021 | 7:09 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস নিয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন’ আয়োজিত গণশুনানিতে ৫৬ জন হামলাসহ তৎপরবর্তী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের কার্যকলাপ তুলে ধরেন। এছাড়া নাম-পরিচয় সরাসরি প্রকাশে ভীত অনেকে লিখিতভাবেও ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

রোববার (১৪ নভেম্বর) দুপুর থেকে প্রায় চারঘণ্টা ধরে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে গণকমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বে অংশ নেন আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিষয়ক ককাসের আহ্বায়ক সংসদ সদস্য ফজলে হেসেন বাদশা, গণকমিশনের সদস্য সচিব তুরিন আফরোজ, সমন্বয়কারী কাজী মুকুল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমানসহ সংগঠকরা উপস্থিত ছিলেন।

দেলোয়ার মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘গণকমিশন আয়োজিত গণশুনানিতে ৫৬ জন হামলার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। অনেকে লিখিতভাবে জমা দিয়েছেন। যারা অন্যের কাছ থেকে হামলার কথা শুনেছেন বা পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন, তাদের বক্তব্য আমরা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করিনি। শুধুমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে।’

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘তদন্ত ও গণশুনানিতে ৫৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যগ্রহণে তাদের বক্তব্য উঠে এসেছে, প্রশাসন ও পুলিশের প্রথমে গাফিলতি ছিল। ঘটনা প্রতিরোধে প্রথমদিকে রাজনীতিবিদদের অনুপস্থিতি ছিল। তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র, আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনার পরপর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অঘটন ঘটেছে। অনেক স্থানে স্থানীয়ভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা হয়েছে। না হলে ঘটনা আরও বড় হতো। সারাদেশে এভাবে প্রতিহত হলে সাম্প্রদায়িক আক্রমণের মাত্রাটা কমে যাবে। যারা সাক্ষ্য দিয়েছে তারা কিছুটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যারা হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের পক্ষ থেকে ঘটনা আপস করতে বাধ্য করা হচ্ছে।’

ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘সারাদেশেরে যেখানে যেখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের বিষয়ে আমরা প্রতিবেদনে তুলে ধরব। আমাদের মনে হয়েছে, বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনা দুর্বল হয়েছে। রাজনীতি দিয়ে মৌলবাদী শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে; শুধু পুলিশ ও প্রশাসন দিয়ে এটা সম্ভব নয়।’

গণশুনানিতে অংশ নিয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা-শাহমীরপুর সনাতন পাড়া দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি সজল দাশ জানান, কুমিল্লায় কথিত কোরআন অবমাননার ঘটনার পর অষ্টমীর রাতে তাদের পূজামণ্ডপে হামলা হয়। এ ঘটনায় তিনি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকে হামলাকারী ও তাদের প্রতিবেশী গ্রামবাসী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে মামলা তুলে ফেলার জন্য হুমকি দিতে থাকে। সজল রাজি না হলে তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। প্রাণনাশের আশঙ্কায় সজল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পালিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে এসেছেন। গ্রামে তার একটি গ্যাস সিলিণ্ডারের দোকান আছে। সেটি গত একমাস ধরে বন্ধ অবস্থায় আছে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম নগরীর ফিরিঙ্গিবাজার পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অমিত হোড় শুনানিতে বলেন, ‘১১ অক্টোবর রাতে তাদের মণ্ডপে প্রতিমা নেওয়ার সময় স্থানীয় ফলের আড়ত থেকে ফল ছুঁড়ে প্রতিমার হাত ভেঙে দেওয়া হয়।’ চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি আশীষ ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল সেন নগরীর জে এম সেন হল পূজামণ্ডপে হামলার বিস্তারিত বিবরণ দেন। গণশুনানিতে অংশগ্রহণকারীরা অধিকাংশই হামলার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গাফিলতির অভিযোগ করেন।

গণশুনানি শেষে তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণশুনানিতে যারা বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের কথায় মনে হয়েছে এখানে (চট্টগ্রামে) সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হয়েছে খুবই সুপরিকল্পিতভাবে এবং সংঘবদ্ধভাবে। পুলিশ প্রশাসনের শিথিলতার কথা এসেছে। এই অভিযোগ আমরা কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও পেয়েছি। এটা কেন, কী কারণে সেটা আমরা এখনও উদঘাটন করতে পারিনি। হামলার শিকার মানুষের মধ্যে এখনও আতঙ্ক আছে। অনেকে সরাসরি সাক্ষ্য না দিয়ে লিখিতভাবে দিয়েছেন। আমরা সারাদেশে তদন্ত শেষ করে দ্রুত প্রতিবেদন উপস্থাপন করব।’

তিনি বলেন, ‘আজ দেশের অবস্থা এমন হয়েছে যে, মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ধূলিস্যাৎ হতে বসেছে। তবে এতে আমাদের হতাশ হলে চলবে না। তদন্তের মধ্য দিয়ে পাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের প্রকৃত চিত্র যদি আমরা তুলে ধরতে পারি, তাহলে সমাজে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সচেতন হবেন এবং প্রতিবাদে এগিয়ে আসবেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তুরিন আফরোজ বলেন, ‘দুষ্কৃতিকারী যারা অপরাধ করেছে তাদের অনেকেই জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছে। জয় বাংলা স্লোগান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। এই স্লোগানকে বিতর্কিত করার একটা অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। আমরা মনে করি, জামায়াত-বিএনপি থেকে দলছুট হয়ে যারা অন্যদলে এসেছে, তারাই জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে সাম্প্রদায়িক আঘাতগুলো করেছে।’

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন