বিজ্ঞাপন

চেঞ্জমেকার পদক পেলেন ৫ অধিকারকর্মী

November 28, 2021 | 12:01 am

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ আমরাই পারি জোটের চেঞ্জমেকার পদক পেলেন তানজিলা তাসনিম, মো. দেলোয়ার হোসেন, হুমায়রা বেগম, শ্রীমতি রূপালী রানী দাস এবং পারুল আক্তার নামের পাঁচ অধিকারকর্মী। তারা সবাই প্রান্তিক পর্যায়ে নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় কাজ করেন।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (২৭ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে অনুষ্ঠিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতীয় সম্মেলনে এই সম্মাননা জানানো হয়।

দিনব্যাপী এই সম্মেলনে সকালের অধিবেশনে 'নারীর প্রতি সহিংসতা: আইনের প্রয়োগ, শিখন ও প্রতিবন্ধকতা' বিষয়ক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. পারভীন জলি। আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালনায় অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার সহযোগিতায় এই গবেষণা কার্যক্রম চলে। জিনাত আরা হক, মুবিনুর রহমান ও সুরাইয়া পারভীন সম্পাদিত এই গবেষণাপত্রে ছয় বছরের ছয় ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন। ঘটনাগুলোর ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে কি ধরণের আইনি ও সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং আমরাই পারি জোট কী ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করে সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে তা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আমরাই পারি জোটের সদস্য সামিয়া আহমেদের সঞ্চালনায় এই পর্বের আলোচক ছিলেন, বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি শেহেলা আহমেদ, ঝিনাদহের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসেন এবং ইউএনএফপিএ'র জিভিবি ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেটর রুমানা খান।

অপর একটি সেমিনারে 'বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ: আর্থ-সামাজিক চালিকাশক্তি ও আইনের সীমাবদ্ধতা' নিয়ে আলোচনা হয়। ফারহানা হাফিজের সঞ্চালনায় এই পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাঈদ ফেরদৌস।

বিজ্ঞাপন

আলোচক হিসেবে ছিলেন গার্লস নট ব্রাইডসের এশিয়ার সিনিয়র অফিসার দিব্যা মুকুন্দ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গার্লস রাইটস ডিরেক্টর কাশফিয়া ফিরোজ এবং ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি লিড তাকবির হুদা।

দ্বিতীয় অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্যে অক্সফামের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন প্রধান মাহমুদা সুলতানা কোভিডে নারী ও শিশু নির্যাতনের পাশাপাশি মেয়ে শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও বাল্যবিয়ের শিকার হওয়ার তথ্য তুলে ধরেন। এসব ঘটনা উদ্বগজনকহারে বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

উদ্বোধনী বক্তব্যে জোটের কো-চেয়ার শাহীন আনাম বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও নারী নির্যাতন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। যে নির্যাতনমুক্ত, ধর্ম নিরপেক্ষ দেশের জন্য তারা লড়াই করেছিলেন সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্মীয় সহিংসতা একইসূত্রে গাঁথা আর তা হল দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার। নারীকে দুর্বল ভাবার মানসিকতা থেকেই তাকে সব পর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সমাজের অল্প কিছু নারী এগিয়ে গেলেও অধিকাংশ নারী এখনও পিছিয়ে আছে বলেও সবাইকে সতর্ক করেন ও একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ অতিথি সিনিয়র জেলা জজ ও বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, বিচার করার সময় দেখেছেন আসামির ভুক্তোভোগীকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। এক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পুনর্বাসনে সরকারকে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি।

আরেক বিশেষ অতিথি সাংসদ অ্যারোমা দত্ত বলেন, নারী অধিকারকে যেন সমাজের সকল পর্যায়ে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মানান্ন বলেন, শারীরিকভাবে নারীকে দুর্বল মনে করার কারণে তার ওপর নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটে। সরকার দারিদ্র্য বিমোচন বা অন্য অনেক ক্ষেত্রে যতটা সফল নারী নির্যাতন ও বাল্যবিয়ে রোধে অতটা সফল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারী নির্যাতন বন্ধ করতে না পারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে পীড়া দেয় জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আইনের প্রয়োগ তেমন হয় না দেখেও তিনি কষ্ট পান। দেশের বাইরে গেলে অনেকেই বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতনের কথা বলেন যা শুনে তিনি লজ্জাবোধ করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অন্যান্য দেশেও বাল্যবিয়ে বা নারী নির্যাতন ছিল, তারা সেসব দূর করে এগিয়ে এসেছে। তবে বিশ্বের কোনো দেশই এখনো পুরোপুরি নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারেনি এবং পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবে বলেও তিনি বিশ্বাস করেন না। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নানা জাতির দ্বারা শাসিত হওয়ার কারণে নিজস্ব আইন ও বিচারব্যবস্থা এখনো অতটা দৃঢ় হয়নি।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নারী নির্যাতন নির্মূল ও নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হলেও সামাজিক কারণে অনেক পদক্ষেপ নিতে পারেন না।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার হামলার শিকার হয়েও বেঁচে গিয়েছেন তাই অনেক কঠিন সিদ্ধান্তই তিনি নিতে পারেন না। তার কিছু হলে দেশের অগ্রগতি থেমে যাবে বলে মনে করে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বিভিন্ন সমাবেশ, সভা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় এর পেছনে বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদেরই কারণে সরকারকে অনেক সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

সভাপতির বক্তব্যে আমরাই পারি জোটের চেয়ারপার্সন সুলতানা কামাল বলেন, স্কুল পর্যায় থেকেই মানবাধিকার, সমঅধিকার, সামগ্রিকতা, বৈচিত্র্যের শিক্ষা দিতে হবে যাতে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষ নারীসহ সবাইকে সম্মান করতে শেখে।

তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর অন্তর্গত পুরুষ ও এর কাছাকাছি থাকা নারীরাও নারীর ওপর নির্যাতন করে। এদেশে বেগম রোকেয়ার হাত ধরে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা। পরবর্তীতে সামাজিক সব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম সুফিয়া কামাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির নেতৃত্ব দিয়েছেন জাহানারা ইমাম। রাজনীতিতে নারী এগিয়ে গেলেও সমঅধিকার প্রশ্নে এখনো পিছিয়ে আছে। আর এই পিছিয়ে পড়ার সূচনা ৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। পঞ্চাশের দশক থেকে যে বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা তা শুধু থেমেই যায়নি বরং উলটোপথে হাটা শুরু করেছে পঁচাত্তর থেকে। তার পর থেকেই নারী বিদ্বেষী, গণবিদ্বেষী, অন্ধকার পথে হাটা শুরু করেছে এই জাতি।

সুলতানা কামাল বলেন, সরকার যেভাবে দেশ গড়ার কাজ করছে সেভাবেই কাজ করেছে আমরাই পারি জোটের দশ লাখ চেঞ্জমেকার। সবার মিলিত প্রচেষ্টাতেই এগিয়ে যাবে দেশ, কমবে নারী নির্যাতন আর এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা ও স্বদিচ্ছা আশা করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, নারী অধিকার লঙ্ঘিত হয় এমন আচরণ, নীতি ও চর্চার বিরুদ্ধে দৃঢ় ও দৃশ্যমান অবস্থান নিতে কাজ করে যাচ্ছে আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট। ব্যক্তি-সংগঠন, গ্রাম-শহর, কিশোর-কিশোরী, নারী-পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে ৪৮ জেলার দুইশ'র বেশি সংগঠনে ১০ লাখ চেঞ্জমেকার এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করা পাঁচ অ্যাকটিভিস্টকে প্রথমবারের মত এই পদকে ভূষিত করা হলো।

সারাবাংলা/আরএফ/একেএম

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন