বিজ্ঞাপন

সবজি রফতানিতে হাজারও সমস্যা, আশু সমাধান দুরাশা

November 29, 2021 | 2:11 pm

নূর সুমন, নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: সবজি রফতানি থেকে আয় এখনকার একশ কোটি ডলার থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দুইশ কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় সরকার। এর জন্য এরই মধ্যে রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজও প্রায় চূড়ান্ত। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবজি রফতানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে শিপমেন্টের জটিলতা এর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া সবজি পরিবহন, সবজির মান সংরক্ষণ এবং প্যাকেজিংয়েও সমস্যা দেখছেন তারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সবজি রফতানির রোডমাপে এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদফতর (ডিএএম) সবজি রফতানির এই রোডম্যাপ তৈরি করে এরই মধ্যে জমা দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। এই রোডম্যাপেও সবজি রফতানির ক্ষেত্রে অন্তত চারটি বড় সমস্যা উঠে এসেছে— বিদেশিদের চাহিদা অনুযায়ী সবজির জাত না পাওয়া; বিমানবন্দররের কার্গো ও বিমানের ভেতরে স্থানের সমস্যা ও সমুদ্রবন্দরের জটিলতা; সার্টিফিকেশনের সমস্যা; এবং প্রক্রিয়াজাত কৃষি পণ্য রফতানির জন্য একাধিক পরীক্ষায় সময়ক্ষেপণ। এসব সমস্যার সমাধান করা গেলে এই খাতের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট রফতানিকারক ও কর্মকর্তারা।

সবজি রফতানিকারক ও আলুবাড়ি এগ্রো-প্রডিউস লিমিটেডের মালিক রাশেদ শামীম চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, দেশের উদ্বৃত্ত সবজি আমরা বাইরে রফতানি করে ডলার আয় করি। কিন্তু এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলোর অবহেলা আছে। এসি কন্টেইনারের সমস্যা থাকায় আলু রফতানিতে সমস্যা হচ্ছে। বিদেশে জমিতেই এসি কন্টেইনার চলে যাচ্ছে, সেই কন্টেইনার সরাসরি জাহাজে করে বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই সুবিধা আমরা পাই না। বাঁধাকপি রফতানির সময় আমি একই সমস্যায় পড়েছি। শিপিং এজেন্টগুলোও নানা বাধা তৈরি করে। কৃষি পণ্য রফতানি করতে গেলে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুমতি নিতে হয়। সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষকে আগেই টাকা জমা দিয়ে রাখতে হয়। আবার বন্দরে একটি পণ্য জাহাজে উঠতে পাঁচ থেকে ছয় দিন লেগে যায়। অথচ এটি পচনশীল পণ্য, জাহাজিকরণে এত সময় লাগানো কোনোভাবেই উচিত নয়। এসব কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারি না আমরা। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ পণ্যই বৈশ্বিক মানের নয়। বিদেশিরা আমাদের পণ্য কিনছেন না কেবল স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ার কারণে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেই বেশিরভাগ ব্যবসা করছি আমরা। সরকার সহযোগিতা করলে এখান থেকে বের হতে চাই। বিদেশিরাও আমাদের পণ্য কিনুন— এটাই চাই।

ব্যাংকের সমস্যা তুলে ধরে রাশেদ শামীম চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক আমাদের ঋণ দিতে চায় না। কারণ আমাদের রফতানির পণ্য গোডাউনে থাকে না। সরকারকে রফতানিবান্ধব হতে হবে। সবজি রফতানির ক্ষেত্রে রফতানিকারকদের বিশেষ প্রণোদনা দেয় সরকার। কিন্তু তার জন্য টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। রফতানিকারকর সংগঠনের কাছে সার্টিফিকেট নিতে হয়, সেখানেও রাজনীতি আছে। সব মিলিয়ে এর জন্য অনেক সময় নষ্ট হয়। এই প্রক্রিয়াই ডিজিটাল করা গেলে জটিলতা কম হতো, সময় বাঁচত। এই কাজটিই করছে ভারত।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- সবজি রফতানির রোডম্যাপ মন্ত্রণালয়ে, বৃহত্তমখাত হওয়ার হাতছানি

রফতানিকারক ও দ্বীপ ইন্টান্যাশনালের মালিক পরিতোষ চন্দ্র দাস বলেন, ২০০৭ সালের আগে আমরা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবজি রফতানি করতাম। একটা সময় মালেশিয়া, ভিয়েতমান, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ আমাদের প্রতিযোগী হয়ে ওঠে। এরপর আর তাদের সঙ্গে আমরা পেরে উঠিনি। বিদেশি ব্যবসায়ীদের ধারণা, বাংলাদেশি পণ্য মানেই সস্তা। আর সস্তায় পণ্য দিতে গিয়ে মান ও প্যাকেজিং ভালো করতে পারিনি। এক্ষেত্রে ভারত অনেক এগিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, প্যাকেজিংয়ের মান ভালো করতে গেলে কারখানা লাগে, যার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের পুঁজি কম। ফলে আমাদের পক্ষে এখানে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে সরকার একটি প্যাকেজিং হাউজ করছে। সরকার প্যাকেজিং করে দিলে বা প্যাকেজিংয়ে প্রণোদনা দিলে হয়তো এ বিষয়ে সমস্যাগুলো দূর করা সম্ভব।

বিমানবন্দরে কার্গো সমস্যা এবং ব্যাংকিংয়ের সমস্যার কথা জানালেন এই ব্যবসায়ীও। তিনি বলেন, মাঝে তিন সপ্তাহের মতো স্ক্যানিং মেশিন নষ্ট ছিল। ওই সময় আমরা রফতানি করতে পারিনি। এরকম সময়ে কিন্তু মার্কেটের দখল অন্য দেশ নিয়ে নেয়। একই কার্গো দিয়ে গার্মেন্টস, চামড়া ও সবজিসহ সব ধরনের পণ্য রফতানি হচ্ছে। কিন্তু সবজি পচনশীল হওয়ায় এর জন্য আলাদা কর্গো প্রয়োজন। এদিকে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রণোদনা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু মর্টগেজ না দিতে পারায় সেই প্রণোদনা নিতে পারিনি। ওই সময় টাকার অভাবে রফতানিও করতে পারিনি। সরকার ন্যূনতম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে আমাদের সুবিধা হতো।

বিজ্ঞাপন

সবজি রফতানিতে জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করে নিচ্ছে  কৃষি বিপণন অধিদফতরও। সবজি রফতানির রোডম্যাপ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ রাজু আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ফল ও সবজির ৯৫ শতাংশেরও বেশি বিমানবন্দর দিয়ে রফতানি হয়। আর প্রক্রিয়াজাতকরণ কৃষিপণ্যগুলো যায় সমুদ্রবন্দর দিয়ে। দুই বন্দরেই সমস্যা রয়েছে। বিমানবন্দরে সবজি রফতানির জন্য আলাদা কার্গো স্পেস ও স্ক্যানার মেশিন নাই। অন্যদিকে তৈরি পোশাকও এই এখান দিয়ে রফতানি হয় বলে কৃষিপণ্য কম গুরুত্ব পায়। ফলে যাত্রীবাহী বিমানে আগে স্থান পায় তৈরি পোশাক। এতে অনেক সময় কৃষিপণ্য অফলোডিং হয়ে পড়ে। তাছাড়া কার্গোর ওখানে এসব পণ্য সংরক্ষের মতো কোল্ড স্টোরেজ সুবিধাও নেই।

আরও পড়ুন- কৃষিপণ্যের রফতানি ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে রোডম্যাপ

এসব সমস্যা সমাধানে অবশ্য কাজ চলছে বলেও জানান কৃষি বিপণন অধিদফতরের এই কর্মকর্তা। বলেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কৃষিমন্ত্রী একাধিক বৈঠক করেছেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কৃষিমন্ত্রী একাধিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠক থেকে সবজি রফতানির জন্য বিমানবন্দরে আলাদা কার্গো স্পেস ও স্ক্যানার মেশিন বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর জন্য কাজ এরই মধ্যে শুরুও হয়েছে।

মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ তুলে ধরে রাজু আহমেদ বলেন, গুড এগ্রিকালচার নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে কাজ শুরুও হয়েছে, আরও অনেক কাজ করতে হবে। গুণগত মানসম্পন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমরা দিতে পারি না। জৈব কীটনাশকের ব্যবহারে আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি। কৃষকরাও ততটা প্রশিক্ষিত নন। রফতানির লক্ষ্যে পণ্য উৎপাদন করতে গেলে খরচ বেশি হবে। সেক্ষেত্রে তাকে সেই মার্কেটটাও দেখাতে হবে। এসব বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। তবে বিষয়গুলো নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কাজ শুরু করেছে, কাজ করছে।

সবজি ও ফল রফতানির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেশনকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়টি নিয়ে কাজ হচ্ছে জানিয়ে রাজু বলেন, কোনো সবজি বা ফল রোগ-জীবাণুমুক্ত কি না, তার জন্য ফ্যাগোসাইটোসিস সার্টিফিকেট প্রয়োজন। এখন সেটি দেয়া হয় গাজীপুরের শ্যামপুর থেকে। সব সবজি বা ফল সেখানে নিতে হয়। আমরা এর বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়েছি। যেমন— আম একটি সম্ভাবনাময় পণ্য। যেসব এলাকায় আমের উৎপাদন বেশি, সেসব এলাকায় সংগ্রহ পয়েন্ট করে সেখান থেকে ফ্যাগোসাইটোসিস সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। এতে রফতানিকারকদের হয়রানি কম হবে। আবার আলুর জন্য কন্টেইনারের ব্যবস্থা করতে পারলে আলুর গুণগত মান ভালো থাকবে, কৃষকের খরচও কমবে। আমরা সেই কন্টেইনারের ব্যবস্থাও করার চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুন- ‘কৃষিপণ্যের রফতানি বাধা দূর করতে কাজ করছে সরকার’

এদিকে, সমুদ্রবন্দর দিয়ে সবজি রফতানির ক্ষেত্রে রফতানিকারকদের বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অগ্রিম ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে এত টাকা ফেলে রেখে তাদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না।

জানতে চাইলে এ সমস্যাটিও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানালেন কৃষিপণ্য বিপণন অধিদফতরের উপপরিচালক রাজু আহমেদ। এ ক্ষেত্রে জনবল সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। বলেন, বন্দরের একেক স্থানে একেক সেবা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বন্দরের সবগুলো সেবা এক ছাতার নিচে আনা গেলে ভালো হতো। তখন খরচ কম হতো। সেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একটি ইউনিট আছে। কিন্তু মাত্র তিন জন দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া সম্ভব না। এক্ষেত্রে জনবল সংকট রয়েছে, তার সমাধান করতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে একাধিক সার্টিফিকেশনগুলোকেও এক ছাতার নিচে আনতে পারলে ভালো হবে। এগুলো আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে।

সবজি রফতানির সরকারি বিশেষ প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতার বিষয়ে রাজু আহমেদ বলেন, এটি সত্যিই একটি সমস্যা। এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন। সরকার কিছু কিছু কৃষিপণ্যে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। এজন্য ডিজিটালাইজেশনটা জরুরি। বাংলাদেশ ট্রেড ফ্যাসিলিটির সঙ্গে আমাদের প্রকল্প আছে। এই প্রকল্পের আওতায় এই সমস্যা সমাধান করার পরিকল্পনা আছে। তবে এক্ষেত্রে একটু সময় লাগবে।

সারাবাংলা/এনএস/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন