বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বরে উৎপাদনে যেতে পারছে না রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র

December 7, 2021 | 10:40 pm

ঝর্ণা রায়, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বিবেচনায় রেখে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যেই উৎপাদন শুরুর কথা ছিল রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে। কয়লার সংস্থান না হওয়ায় সেই সময়সীমা থেকে সরে আসতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উৎপাদন শুরু করার জন্য যে কয়লার প্রয়োজন তা এখনো সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। তবে চলতি মাসেই কয়লা আনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও কিছুটা বাকি রয়ে গেছে। ফলে ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা যাচ্ছে না।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সাপমারি- কাটাখালী ও কৈর্গদাশকাঠী এলাকায় ১ হাজার ৮৩৪ একর জমির ওপরে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়। এরপর ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারিতে দুই দেশের রাষ্ট্রায়াত্ত কোম্পানি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) যৌথ কোম্পানি গঠন করে। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র পায়। ২০১৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দরপত্র আহ্বান করে চুক্তি সই করা হয় ২০১৬ সালের ১২ জুলাই। ইকুইটি বিনিয়োগ সমান ভাগে ধরে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট রামপাল বাস্তবায়নে গঠন করা হয় বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল)।

১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল। বাস্তবায়নকারী কোম্পানি বিআইএফপিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, কাজ শুরুর তারিখ থেকে ৪১ মাসের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল। সে হিসাবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরেই রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষম হয়ে ওঠার কথা।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী গত আগস্টে এর উৎপাদন শুরুর কথা ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ করা না গেলে সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়নি। পরে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে উৎপাদন শুরুর চিন্তা করা হয়। সে অনুযায়ী কাজ এগোতে থাকলেও কয়লা আমদানি সংক্রান্ত চুক্তি সই না হওয়া এবং সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ না হওয়ায় ডিসেম্বরেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারছে না।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আফসার উদ্দীন সারাবাংলাকে বলেন, কয়লার বিষয়টি দ্রুতই সুরাহা হচ্ছে। এ কারণেই উৎপাদন সময়টা খানিকটা পেছানো হয়েছে। আমাদের টার্গেট আগামী বছরের মার্চ। এর মধ্যে সব কাজ পরিপূর্ণভাবে শেষ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ খাতের সরকারি নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রামপাল প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আগেই ঠিক করে রেখেছি, ইন্দোনেশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমরা কয়লা নেব। কিন্তু বিষয়টিতে একটু কালক্ষেপণ হওয়ায় উৎপাদন সময় পিছিয়েছে। চলতি মাসেই কয়লা আমদানির বিষয়টি সুরাহা হয়ে যাবে। আশা করছি, দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।‘

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মূল কাজ শেষ করতে দেরি হলেও ভূমি উন্নয়ন, সীমানা প্রাচীর ও স্লোপ প্রোটেকশন নির্মাণ, মূল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফেসিং, বিদ্যুৎ লাইন, নির্মাণ কাজের পানিসহ বেশকিছু কাজের পুরোটাই শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন দু’টি ইউনিট মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি ইউনিটের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ও ভারত সরকারে যৌথ বিনিয়োগে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের পিডিবি ও ভারতের এনটিপিসি যৌথ কোম্পানি গঠন করে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সুন্দরবনের কাছে হওয়ায় প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দেশের পরিবেশবাদীদের ঘোর আপত্তি ছিল। তাদের বক্তব্য, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কারনে রামপাল প্রকল্প পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং নিকটবর্তী সুন্দরবনে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনবে। সরকার এর বিপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি করবে না। নষ্ট হবে না সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

ওই সময়ে কয়েক দফা সময় পিছিয়ে ২০২১ সালের জুনে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু করোনা সংক্রমণের কারণে কাজ বন্ধ থাকায় তা আরও পিছিয়ে এ বছরের ডিসেম্বরে চালুর সময় ঠিক করা হয়। আর দ্বিতীয় ইউনিট চালুর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২০২২ সালের মার্চে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রথম ইউনিটের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাই নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী বছরের মার্চে।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদনের বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রাও এরই মধ্যে বাংলাদেশ অর্জন করে ফেলেছে। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশও উৎপাদনে আসতে না পারা এমন কয়লাভিত্তিক ১০ বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করেছে। এর বদলে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরে। গুরুত্ব রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরও।

সারাবাংলা/জেআর/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন