বিজ্ঞাপন

কিংবদন্তির ভাগীরথী; মুক্তিযুদ্ধের জাগ্রত আখ্যান

December 9, 2021 | 4:46 pm

আবদুল্লাহ আল মোহন

১.
কথাশিল্পী মনি হায়দারের গল্পের ভুবন মানুষের কথকতায় ভরা, তিনি মানুষের গল্প লেখেন, লেখেন ছোটোদের-বড়োদের সকলের জন্য। মনি হায়দারের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ পাঠ করলাম সম্প্রতি। ১৯৭১ সালে পিরোজপুর মহকুমা শহরে ভাগীরথী নামে এই নারীকে পাকিস্তানের বর্বর সেনাবাহিনী গাড়ির পিছনে বেঁধে রাস্তায় টেনে-হেঁচড়ে হত্যা করেছিল, সেই ভাগীরথীকে নিয়েই তার এই উপন্যাস। উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে চরিত্রগুলোর সাথে জন্ম নেয় নানা প্রশ্ন, আত্মজিজ্ঞাসা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা লড়াই-এর ময়দানে প্রবলভাবে সক্রিয় ছিলেন, যে বীরাঙ্গনাগণ দুর্বিষহ জীবন যাপন করেছেন তাদের অন্যতম একজন পিরোজপুরের ভাগীরথী। তার মতোন বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে এই রকম রচনা সৃষ্টির অকৃত্রিম প্রীতি নিবেদনের, বিন¤্র শ্রদ্ধাঞ্জলি দানের প্রচেষ্টার চেয়ে অনন্য উপহার আর কীইবা হতে পারে?

বিজ্ঞাপন

২.
যে-কোনো পাঠই মনকে সচেতন করে, জাগ্রত করে ভাবনার বাষ্প, অনুভবের জলে স্নাতক হতে উদ্বুদ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধে নারী, নারীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু পাঠক হিসেবে মনি হায়দারের ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ পাঠকালে অজস্র ভাবনা ঘিরে ধরে। মনি হায়দারের আরেকটি রচনা থেকেই ধার নিয়ে বলার লোভ সামলাতে পারছি না। সেই ভাবনাগুলো এ রকম- আমি বাংলার। বাংলা আমার। এই যে স্বাধীন বাংলাদেশ কোথায় কিভাবে পেলাম? স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ কি মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে? নাকি অযুত রক্তগঙ্গা পার হয়ে, তিমিরের ভেতর থেকে, হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে? গল্প উপন্যাস লিখতে গেলে যেকোনো আখ্যানের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে, চাই মানসভূমি। চাই মাতৃভূমি। বাংলার স্বাধীন সত্তার রূপ একজন লেখকের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেয়, আত্মার প্রতিধ্বনি। তুমি কে? তুমি কোথা থেকে এসেছ? কে তোমাকে দিয়েছে স্বাধীন মানচিত্রে বাস করার মহার্ঘ্য সুযোগ? কে তোমার কিংবদন্তি? বাঙালির ইতিহাস, হাজার বছরের ইতিহাস। সেই হাজার বছর ধরে বাঙালি স্বাধীন ভূখণ্ডের র জন্য লড়াই করেছে, করে আসছিল। নানা পালাবদল, উত্থান-পতন, রক্তপাত, হত্যা, ষড়যন্ত্র আর বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলা করে করে এক খণ্ড মানচিত্র বাঙালির স্বাধীন সত্তার স্বরূপে দাঁড়িয়েছিল গোটা ১৯৭১ সাল জুড়ে। একাত্তরের মার্চ মাস ছিল হাজার বছর ধরে লড়াইয়ের শেষ কেন্দ্রবিন্দু। যে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষ। মুষ্ঠিমেয় আত্মপ্রতারক মাতৃহননকারী ছাড়া- সবাই একটি কাতারে দাঁড়িয়েছিল একজন মহান নেতার পেছনে, যার আঙুলের ইশারায় চলেছে গোটা বাংলাদেশ।

৩.
কেমন ছিল সেই অগ্নিগর্ভ একাত্তর? একাত্তরের মার্চ-ডিসেম্বরের ইতিহাস রয়ে গেছে মানুষের মনে, স্মৃতির জাদুঘরে। অনেকে সেই সময়ের স্মৃতি লিখেছেন, এঁকেছেন আপন অনুভবে অভিজ্ঞতার কাহিনিচিত্র। লিখে রেখেছেন বাঙালির জয়যাত্রার প্রামাণ্য দলিল। আশার কথা প্রচুর মুক্তিযুদ্ধের বই প্রকাশ হয়েছে, সেই প্রকাশ অব্যাহত আছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জনসভার ছায়াচিত্র খুঁজে পাই উপন্যাসে, চরিত্রদের কথোপকথনে এভাবে- ‘বিরটা জনসভা। মেলা মানু আইচে। মুই তো অবাক অইচি- মোগো পিরোজপুর শহরে এত মানু অইলো ক্যামনে?’
‘আইবে না?’ ভাগীরথী ভাতের হাঁড়ি তুলতে তুলতে কথা বলে, ‘সবাই যে স্বাধীন অইতে চায়। আর কত কাল পাকিস্তানিগো গোলাম অইয়া থাকবে?’
‘হাসে ঘনশ্যাম, ঠিকই কইচো। পাকিস্তানিগো তাড়াইয়া দেশটা স্বাধীন অইলে আর কেউ মোগো ইন্ডিয়া যাইতে কইবে না। হেরলাইগা জনসভায় মোজাম ভাই কইচে- মিলিটারিগো বাতে মারবে, পানিতে চুবাইয়া মারবে। মুই ভাবতেছি মিলিটারি অইলে জয় বাংলা কইয়া অগো লড়ান দিমু। লড়ান দিয়া এক্কেরে বলেশ্বর গাঙ্গে হালামু। গাঙ্গে হালাইয়া চুবাইয়া চুবাইয়া ভুরভুরি ছুটাইয়া মাইরা হালামু।’

বিজ্ঞাপন

৪.
অস্বীকার করার কোনো কারণই নেই যে, ইতিহাস আমাদের অনেকের চর্চার বিষয় না হলেও আমাদের যাত্রা তো প্রতিদিনের ইতিহাসের ভেতর দিয়েই। ইতিহাস ছাড়া কি মানুষ হয়? ইতিহাস নিয়ে কাজ করতেও দ্বিধা থাকা উচিত নয়। যেই ভাবা সেই কাজ। খুঁজতে শুরু করলাম একাত্তরের মার্চের ঘটনাবলি নিয়ে লেখা ইতিহাস, আলেখ্য ও মহত্তম স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের ওই প্রজন্মের অনেকে অনেকভাবে লিখেছেন একাত্তরের স্মৃতি ও ভাষ্য। সেই অনুসন্ধিৎসার ইতিহাসের পাতার পাঠ নিতে নিতে মনি হায়দার লেখেন ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’। একাত্তরের ইতিহাস অনুসন্ধান যে-কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিককে আলোড়িত করবেই। আর তিনি যদি হন সৃজনশীল লেখক, তাহলে তো পাঠবৃক্ষের ফসল-ফলের দেখা মিলবেই। মনি হায়দারও স্বীকার করছেন, বলছেন- ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে অবাক হলাম। প্রচুর প্রত্নরাজি রেখে গেছেন আমাদের সেই দুঃসহকালের প্রত্যক্ষদর্শীরা। খুঁজে খুঁজে পাঠ শুরু করি ২০০৯ সাল থেকে। প্রচুর বই কিনেছি। পাঠ করেছি। পাঠ করতে করতে বুকের ভেতর আগুন জ্বলেছে। বুকের ভেতর আগুনের বীণা সাহসের বাদ্য বাজিয়েছে। কখনো কখনো গর্বে, আনন্দে, উল্লাসে চিৎকার করেছি। শত শত বছর, হাজার হাজার বছর পর যখন কোনো বাঙালি পাঠ করবে, তার জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, আমার মতো সেদিন তাদেরও বুকের ছাতি ফুলে উঠবে তিন ইঞ্চি- গর্বে, আনন্দে। জানতে পারবে, তাদের পূর্বপুরুষ কত সাহসী আর পরাক্রম ছিল। বাঙালি জীবন দিয়েছে কিন্তু মাটি দেয়নি। বিসর্জন দেয়নি স্বাধীনতা। প্রমাণ করেছে, বাঙালি সাহসী জাতি। লড়াকু জাতি। বিজয়ী জাতি।’ এই আত্মসমীক্ষারই ফল-ফসল ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’। মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাসের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের অনন্য সংযোজন হয়ে থাকবে উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ উপন্যাস।

৫.
মনি হায়দারের উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’তে ১৯৭১ সালের পিরোজপুরকে পাই। পিরোজপুর শহরের মুচি ঘনশ্যাম যুবতী সুন্দরী স্ত্রী, চার বছরের ছেলে লালশ্যামের জননী ভাগীরথী। আমরা দেখতে পাই, পাকিস্তানি সৈন্যদের শিবিরে ধরে নিয়ে আসা হিন্দু নারী ভাগীরথীকে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র এবং পাক মানসকে। সেই পাক হানাদারদের ক্যাম্পের নানান গোপন খবর মুক্তিবাহিনীকে জানিয়ে দিতে কৌশলে আসা যাওয়া করেন এক নারী- ভাগীরথী। পাকিদের সঙ্গে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু পরিস্থিতি তার ভিন্নতর আসল উদ্দেশ্যকে সফল করতে নিবেদিত করে, মুক্তিদের সহযোগিতার গোপন প্রয়াসে হয়ে উঠেন অসীম সাহসী। কৌশলে খবর সংগ্রহ করে সেই খবর তিনি পৌঁছে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। তার পাঠানো খবরের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি অপারেশনে সফল হন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপন সহযোগিতার পরিচয় ফাঁস হয়ে যায় পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ভাগীরথীর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। দুটি হাত জিপের সঙ্গে বেঁধে দুই কিলোমিটার ছেঁচড়ে নিয়ে যায়। অসহ্য চিৎকারে আর্তনাদে ছটফট করে ভাগীরথী। রক্তে রঞ্জিত হয় পিরোজপুরের সড়ক। অবশেষ ভাগীরথীর লাশ ছুঁড়ে ফেলা হয় বলেশ্বর নদীতে।

বিজ্ঞাপন

৬.
পাকিন্তানী হানাদারদের সহযোগী রাজাকার কর্তৃক ধরে নিতে আসা ভাগীরথীর করুণচিত্র উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে- ‘স্যার, এই সেই মাইয়াছেলে।’ ভাগীরথীকে দেখিয়ে সুলতান বলে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মদকে। ‘স্যার?’ চোখ টেপে সুলতান মাহমুদ, ‘লইয়া লন, মেজর সাব বেঝায় খুশি অইবে।’
পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মদের চোখ লালসায় চকচক করে, মুখের উপর দাঁতাল হাসি, হাসির উপরে এক জোড়া কালো গোঁফ বীভৎসভাবে ঝুলে আছে। ওর পাশে দাঁড়ানো বাকি জওয়ানরাও তাকিয়ে আছে হায়েনার চোখে। দেখছে আলুথালু বিপন্ন ভাগীরথীকে। ভাগীরথী শাড়ি ঠিকই পরেছে কিন্তু ব্লাউজ পরেনি। ফলে স্বাস্থ্যবান সুন্দর শরীরে আলোর তীব্রতায় ওদের চোখ ঝলসে যায়।
নিজের ঘর কিন্তু দখল হয়ে গেছে। এবং দখল হয়ে যাওয়া ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থরথর কাঁপছে ঘনশ্যাম। বুকে তৃষ্ণার ঢেউ। কী করবে বুঝতে পারছে না। পাশে ঘুমিয়ে থাকা ছেলে লালশ্যামের ঘুম নেই। উঠে বসেছে। অবাক ঘরের ভিতরে এত মানুষ, এত আলো, অদ্ভুত পোশাকের মানুষ, হাতে বন্দুক, অজানা ভাষায় কথা বলে। পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ দরজায় পৌঁছে যায়। পিছনের বাকিরা ছুটতে শুরু করে। দরজা পার হয়ে ভাগীরথীকে নিয়ে ছোট্ট উঠানে নামে। আকাশে বিরাট একটা গোলাকার চাঁদ। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। ভাগীরথীকে উঠানে দাঁড় করায় ক্যাপ্টেন আলী মোহাম্মাদ। কিন্তু ভাগীরথী দলামোচা হয়ে উঠানে পড়ে যায়। মেঝেতে পড়ে যাওয়া ভাগীরথীকে ঘিরে দাঁড়ায় পাকিস্তানি আর্মি এবং বাংলাদেশের রাজাকারেরা। ভাগীরথী বিবশ প্রায়। নিজের প্রিয় উঠানে অনেক চাঁদমাখা রাতে এলিপাতার হোগলা বিছিয়ে গরমের রাতে শুয়েছে ছেলের সঙ্গে। নয়তো ঘনশ্যামের সঙ্গে। এই মুহূর্তে ভাগীরথী কি চাঁদের আলোর রোদন দেখছে; তালের পাখা নাড়তে নাড়তে কি লালশ্যামকে বলছে, ‘এক দেশে আছিল তোর নাহান একটা রাজকুমার।’
এমন মনকে অবশ করে ছুঁয়ে যাওয়া বেদনার সুর, শব্দছবি পাঠককে আবেগাক্রান্ত করে, একাত্তরের নির্মমতাকে জাগিয়ে অন্তরে তীব্রভাবে তোলে।

৭.
কীভাবে পশুর মতোন ভয়াবহ অত্যাচারে এদেশের দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে পাকদোসর রাজাকারদের সহযোগিতায়, তারই জ্বলন্তচিত্র এঁকেছেন মনি হায়দার আলোচ্য উপন্যাসে গভীর প্রতয়ে, তীব্র আবেগে, তারই আরো কিছুটা তুলে ধরছি-
‘গুড, ভেরি গুড। বাঙালিদের ধরে ধরে, যাকে যেখানে পাও, নারী-পুরুষ আর শিশু সবাইকে ধরে ট্রাকে বোঝাই করে নদীর পাড়ে নিয়ে যাবে।’
‘স্যার!’
‘নদীর পাড়ে নিয়ে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করবে। এক লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে গুলি খরচ কম হবে। কম গুলি খরচে বাঙালিদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবো। চিরকালের জন্য জলে ভেসে যাবে, শেখ মুজিব সাতই মার্চের ভাষণে কী বলেছিল, মনে আছে?’
‘স্যার!’
‘গর্দভ কোথাকার!’ জেনারেলে কণ্ঠে মৃদু তিরস্কার। ‘শেখ মুজিব নির্দেশ দিয়েছিল বাঙালিদের, আমাদের ভাতে আর পানিতে মারার। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, কারা কাদের ভাতে আর পানিতে ডুবিয়ে মারে। নদীর তীরে দাঁড় করিয়ে গুলি করলে একেবারে সোজা পানিতে পড়বে। তোমাকে আর জোয়ানদের টেনে টেনে সরাতে হবে না। রক্তও থাকছে না। ওদের নদী ওদের রক্ত খেয়ে নেবে।’
‘স্যার!’
‘আরো একটা ব্যাপার মেজর...’
‘বলুন স্যার।’
‘রক্তের দাগ থাকবে না,’ হা-হা হাসিতে জেনারেলের মুখ ভরে ওঠে, মনে হচ্ছে জেনারেল চমৎকার একটা ঠাট্টা করেছে। ‘দেশ-বিদেশের সাংবাদিকেরা এসে দেখবে দেশটা পুতপবিত্র, বাঙালিরা কী যেন বলে, সবুজে শ্যামল দেশ- তাই না?’
‘জি স্যার।’

বিজ্ঞাপন

৮.
মনি হায়দারের উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ পড়তে পড়তে জানার আগ্রহ বাড়ে, খুঁজে পেতে নিজেকেই প্রশ্ন করে থমকে যাই বেদনায়, চরম সত্য তথ্য জেনে- অসীম সাহসী এই নারী মুক্তিযোদ্ধা ভাগীরথী দেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিলেও তিনি পাননি শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। ভাগীরথীর মতো আরো অনেক নারী স্বাধীনতার বেদীতে বলিদান করেছেন নিজের জীবন। তবু ভাগীরথীর মতো মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য নারীর আত্মত্যাগ ও সাহসী ভূমিকার কথা অনেকটা ইতিহাসের আড়ালেই রয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এদেশের সকল শ্রেণি, পেশা, অবস্থানের মানুষের সার্বিক জনযুদ্ধ ছিল। এ যুদ্ধে নারী পুরুষ উভয়েই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু এই জনযুদ্ধে নারীর কৃতিত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা তিন লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে, বন্দি শিবিরে আটকে রেখে ভয়াবহ নির্যাতন করেছে এবং অসংখ্য নারীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তবুও তারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে আপোষ করেননি। অনেকে জীবন দিয়েছেন তবু প্রকাশ করেননি মুক্তিযোদ্ধা স্বামী, ভাই, বাবা বা অন্যদের পরিচয়। আবার অনেক নারী অস্ত্রহাতে যুদ্ধও করেছেন রণাঙ্গনে। শিরিন বানু মিতিল, তারামন বিবি, কাঁকন বিবি এমনই বীর নারীদের মতো আরো অনেকে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তাঁদের পরিচয় সেভাবে সামনে আসেনি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল গেরিলা অপারেশনের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। যুদ্ধের খবর আদান প্রদান, অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া, যোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখা, বাড়িতে আশ্রয় দান, খাবার রান্না করে দেওয়া, পাকিস্তানিদের গতিবিধির খবর জোগাড় করা এসবই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশটির সিংহভাগ করেছিলেন নারীরা। তারা এই ভূমিকা পালন করেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, চরম নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা নিয়েই। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, খাবার সরবরাহ করা, অস্ত্র ও গোপন সংবাদ পৌঁছে দেওয়া এই প্রতিটি ভূমিকার জন্য অসংখ্য বাঙালি নারীকে পাকিবাহিনী হত্যা করেছে, ক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ ও চরম নির্যাতন করেছে। কিন্তু নারীর এই বীরত্বের জন্য স্বাধীন দেশে তাঁকে তেমন কোনো স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি।

৯.
মনি হায়দার উপন্যাসে নারীর জন্য প্রতিকূল সামাজিক অবস্থার ছবি এঁকেছেন পরম মমতায়। নানান গবেষণায় আমরা জানি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান কারও চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এদেশের প্রায় তিন লাখ নারী। তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে এবং প্রচ-ভাবে আঘাত করা হয়েছে। এই প্রবল নির্যাতনের, ধর্ষণের শিকার নারী। আর পাক হানাদার বাহিনী মনুষ্যত্ব হারিয়ে মানুষ থেকে পিশাচে পরিণত হয়। একাত্তরে প্রকৃতপক্ষে সম্ভ্রম হারিয়েছিল পাকিস্তানিরাই। তারাই সারা বিশ্বের চোখে ধর্ষক, হানাদার ও নরপিশাচ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। তাদের প্রকৃত পৈশাচিক রূপ প্রকাশিত হয়েছে। চরম সাম্প্রদায়িক অমানুষের আচরণ প্রকাশ পায় পাকসেনাদের প্রতিটি পদক্ষেপে। ভাগীরথীর অসীম সাহসী দেশপ্রেমিক কাজকে বিশ্বাসঘাতকতা রূপে দেখে তারা। যার প্রকাশ ঘটেছে উপন্যাসে এভাবে, ‘ভাগীরথী! মালাউন কা বাচ্চা!’ দাঁতে দাঁত পিষে ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। ভিতরে ভিতরে রাগে ফুটন্ত পানির মতো ফুটছে, একটা হিন্দু আরওতের কাছে এইভাবে হেরে গেলাম? কেবল নিজের পরাজয়? গোটা কওমের পরাজয়। ছিঃ ছিঃ, নিজের গালে নিজের থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে দিলদারের, শেষ পর্যন্ত হিন্দু আরওতের কাছে এই নির্মম পরাজয়? কেবল আমার জন্য সতেরোজন পাকিস্তানি আর্মি মুক্তিদের অ্যামবুশের শিকার হয়েছে। সতেরোজন বেঁচে থাকলে কওমের সেবা করতে পারত। নিজের চুল নিজের ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। ভাগীরথী বিশ্বাসঘাতক!

বিজ্ঞাপন

১০.
মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ভাগীরথী একসময় ধরা পড়ে যায়। ফলে করুণ পরিণতি বহন করতে হয় তাকে। সে বড়ো করুণ, ভয়াবহ নির্মমতার বেদনাচিত্র মনি হায়দার এঁকেছেন পাঠকের মনকে ভিজিয়ে দিয়ে, ‘আবার জিপের পিছনে যেতে যেতে প্রায় আধা মাইল যায় ভাগীরথী। না, ভাগীরথীর প্রাণ তখনও যায় না। চারপাশের লোকেরা অবাক, বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিদিন কত মানুষের লাশ ফেলে দেয়, কত মানুষকে ধরে এনে পানিতে কোমর পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে গুলি করে লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেয়। সেই পাশবিক পাকিস্তানিরা এ কাকে নিয়ে এসেছে? হাতদুটো থেকে দড়ি ছাড়িয়ে আধামৃত ভাগীরথীকে তুলে নদীর মধ্যে ফেলে দেয় পাকিস্তানি সেন্ট্রিরা। ঝপাত্ করে একটা শব্দ হয়। চারদিকে পানি ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট কয়েকটা ঢেউয়ের পর নদীর পানি নিথর। কয়েক মুহূর্ত ভেসে থেকে টুপ করে ডুবে যায় ভাগীরথী। পানি আবার সমান। মনে হয় না, কয়েক মুহূর্ত আগে একজন ভাগীরথীকে গিলে খেয়েছে নদী!’

১১.
উপন্যাসটির পাঠ আমাকে স্বদেশপ্রেম চেতনাবোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। কারণ নির্যাতনের শিকার এই নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে অপেক্ষা করতে হয় চার দশকেরও বেশি সময়। তবে সকলে এখনো এই স্বীকৃতি পাননি। এই নারীরা বীরযোদ্ধা। তাদের যথাযথ সম্মান জানাতে হবে, স্বীকৃতি দিতে হবে। এবং তাদের বিভিন্ন সহায়তাও দিতে হবে। তাদের আত্মত্যাগের কথা প্রচার করতে হবে গৌরব সহকারে। তারা আমাদের জাতির জন্য গৌরবের। তারা যুদ্ধের বীর নারী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে নারীরা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছেন, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন, যারা খবর পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, যারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের বিজয়ের ইতিহাস, গৌরবের ইতিহাস। মনি হায়দারের উপন্যাস ‘কিংবদন্তির ভাগীরথী’ সেই চেতনাজারিত দেশপ্রেমের অনবদ্য উপস্থাপন, অনন্য উদাহরণ।

সারাবাংলা/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন