বিজ্ঞাপন

চীন-তাইওয়ান, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত— ২ ফ্রন্টে যুদ্ধ করবে আমেরিকা?

December 14, 2021 | 9:54 pm

আতিকুল ইসলাম ইমন, নিউজরুম এডিটর

ঢাকা: রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধের আবহ। লক্ষাধিক সৈন্য সমাবেশ। যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ক্রেমলিনের নির্দেশের অপেক্ষায় রুশ জেনারেলরা। প্রেসিডেন্ট পুতিনের আদেশ পেলেই ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেনের সীমান্ত ভেদ করে প্রবেশ করবে তারা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, চীনও তাইওয়ান দ্বীপরাষ্ট্রকে মেইনল্যান্ডের সঙ্গে অঙ্গীভূত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কট্টরবাদীরা ডেডলাইন ২০৪৯-এর আগেই তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে মিশে যেতে দেখতে আগ্রহী। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও স্বপ্ন— তার নেতৃত্বেই যেন তাইওয়ান আবার চীনের সঙ্গে মিলে যায়। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেইজিংয়ের সামরিক প্রস্তুতি শেষের দিকে। চলছে একের পর এক মহড়া ও রেকি। হামলার সিদ্ধান্ত আসতে পারে যেকোনো সময়।

পরিস্থিতি বলছে, বিশ্বের দু’টি ভিন্ন মহাদেশে দু’টি ভিন্ন ভূখণ্ড দুই মহাশক্তিধর প্রতিবেশীর হামলার আশঙ্কায় বিশ্বশক্তির কাছে সাহায্য চাইছে। ঠিক এমন সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউজ ও পেন্টাগনের কর্মকর্তারা নানা হিসাবনিকাশ নিয়ে ব্যস্ত। তাইওয়ান ও ইউক্রেন— একইসঙ্গে দু’টি ভূখণ্ড নিয়েই ভাবতে হচ্ছে তাদের। পুতিন ও শি জিনপিং— একইসঙ্গে দুই প্রেসিডেন্টের মাথায় কী খেলছে, সেটিও নির্ভুলভাবে পড়ার তাগিদ রয়েছে মার্কিন কৌশলবিদদের ওপর।

বিজ্ঞাপন

চীন কি আদৌ সামরিক সংঘর্ষের মাধ্যমে পেতে চাইবে তাইওয়ানকে, রাশিয়ার সৈন্য সমাবেশ কি কেবলই দরকষাকষির জন্য— এসব প্রশ্ন নিয়ে বিশ্লেষক মহলে চলছে বিস্তারিত আলোচনা। সমরবিশারদরাও তিন পরাশক্তি ও তাদের মিত্রশক্তির সম্মিলিত শক্তির তুলনা করছেন। সামরিক সংঘর্ষ হলে তা ধ্রুপদী সামরিক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকবে— এমনটি মনে করছেন না বেশিরভাগ বিশ্লেষক। চীন ও রাশিয়া উভয় একইসঙ্গে বা এককভাবে আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারের ঝুঁকিই দেখছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সম্পর্কের ইতিহাস

বিজ্ঞাপন

তাইওয়ান ও ইউক্রেন এক সময় যথাক্রমে চীন ও রাশিয়ার অংশ ছিল। মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্ট বিপ্লবের সময় তৎকালীন রিপাবলিক অব চায়না সরকারের প্রধান চিয়াং কাইশেক পরাজিত হতে হতে শেষ পর্যন্ত ১৯৪৯ সালে তাইওয়ান প্রদেশে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্ববলে মূল ভূখণ্ডের নতুন কমিউনিস্টবিরোধী সরকার গড়েন। কমিউনিস্ট বিপ্লবের পরপর তাইওয়ানের সরকারকেই গোটা চীনের একমাত্র বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই কোরিয়ান যুদ্ধে আমেরিকার কাছে তাইওয়ান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। স্নায়ুযুদ্ধে তাইওয়ান প্রণালী কৌশলগত কারণে প্রভাবক হয়ে উঠলে ১৯৫৪ সালে শিনো-আমেরিকান মিউচুয়াল ডিফেন্স চুক্তি সই করে ওয়াশিংটন। এর মাধ্যমে তাওয়ানকে সামরিক জোটসঙ্গী করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তির ফলে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাইওয়ান যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। আমেরিকার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তায় তাইওয়ানের দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। সে সময় তাইওয়ানে অবস্থিত রিপাবলিক অব চায়না সরকার বিশ্বসভার প্রায় সর্বক্ষেত্রেই চীনের বৈধ সরকার হিসেবে অংশ নিতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

তবে সত্তরের দশকে চীন নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মূল ভূখণ্ডের কমিউনিস্ট সরকার অর্থাৎ, পিপলস রিপাবলিক অব চায়না সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথ বেছে নেন। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানে অবস্থিত রিপাবলিক অব চায়না সরকারের পরিবর্তে মেইনল্যান্ডের পিপল রিপাবলিক অব চায়না সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। ওই সময় বেইজিংয়ের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক জোরদার করে ওয়াশিংটন। ওই বছরের ১০ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট (টিআরএ) সই করেন, যা আজও যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ানের সম্পর্কের ভিত্তি।

টিআরএ’তে বলা হয়, তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র। এশিয়ায় মার্কিন নীতির অপরিহার্য অংশ তাইওয়ান। ওই সম্পর্ক চুক্তির আওতায় তাইওয়ানের যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাইওয়ানের স্বার্থে প্রয়োজনে সামরিক সহায়তা দিতেও প্রতিজ্ঞা করে ওয়াশিংটন।

বিজ্ঞাপন

টিআরএ চুক্তিতে স্পষ্ট বলা আছে, শান্তিপূর্ণ উপায় ছাড়া অন্য কোনোভাবে যেমন— বয়কট বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের যেকোনো প্রচেষ্টাকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে ওই চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবিলম্বে তা কংগ্রেসকে অবহিত করতে বাধ্য থাকবেন, যেন প্রশাসনের সঙ্গে একসঙ্গে উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে।

কৌশলগত কারণ ছাড়াও এমন প্রতিশ্রুতির কারণেই তাইওয়ানের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাত এলে তাতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে সাংবাদিকরা যখন তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য হামলা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে জানতে চান, এতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে কি না— তখন বাইডেন জবাবে বলেন, ‘হ্যাঁ, কারণ আমাদের এ ব্যাপারে একটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে।’

রাশিয়ার বৈরিতায় ইউক্রেনের পাশে যুক্তরাষ্ট্র

ইউক্রেনের ইতিহাসের বড় অংশজুড়ে রয়েছে যুদ্ধ, গণহত্যা, বহিঃশক্তির দখল, নিপীড়নের গল্প। ১০ম শতকে ইউক্রেন ছিল প্রথম পূর্ব স্লাভিক রাজ্য কিয়েভান রাসের কেন্দ্র। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে ইউক্রেন ইউরোপের বৃহত্তম ও সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল। পরে একের পর এক অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বহিঃশত্রু, এমনকি মঙ্গলীয়ানদের আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ে। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে বা কোনো কোনো সময় পরাধীন হওয়ার লম্বা সময় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ইউক্রেন পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। এর আগে ১৯১৮-২০ দুই বছর স্বাধীন ছিল ইউক্রেন। তবে তখনো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পূর্ব ইউক্রেনের একাংশ শাসন করেছে পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও চেকোস্লোভাকিয়া।

মূলত ১৯২১ সালে গোটা ইউক্রেনই সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে পড়ে। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর গঠিত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯২১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউক্রেনের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে নিলে গঠিত হয় ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক। ওই সময় ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিল পোল্যান্ডের হাতে। ১৯৩৯ সালে নাৎসি-সোভিয়েত শর্তের অধীনে পশ্চিম ইউক্রেনও সংযুক্ত করে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠে ইউক্রেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত গোটা ইউক্রেন নাৎসিদের দখলে থাকে। সে সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রায় ৮০ লাখ ইউক্রেন নাগরিকের মৃত্যু হয়।

যুদ্ধ শেষ হলেও ইউক্রেনিয়ানদের কপালে নেমে আসে নতুন বিপদ। যুদ্ধের সময় নাৎসিদের সহযোগিতার মিথ্যা অভিযোগে সোভিয়েত নেতা স্ট্যালিন ২ লাখ ক্রিমীয় তাতার জাতিগোষ্ঠীর লোককে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া নির্বাসনে পাঠান।

সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়েও অনেকটা ব্রাত্য ছিল ইউক্রেন ও ইউক্রেনের ভাষা, সংস্কৃতি। মূল রাশিয়া ভূখণ্ড ও বাকি ইউরোপের মধ্যে একটি বাফার স্টেট হিসেবে ব্যবহৃত হতো ইউক্রেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে মস্কোবিরোধী মনোভাব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ইউক্রেন।

তবে তখনো ইউক্রেন পশ্চিমা দেশ ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রেখে চলার নীতি অবলম্বন করে। ২০০২ সালে ইউক্রেন সরকার উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোতে যোগ দিতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০৫ সালের নির্বাচনে ভিক্টর ইউশচেঙ্কো প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে ভারসাম্য নীতির অবসান ঘটে। তার নেতৃত্বে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা প্রকাশ্যে আসে। গ্যাস, সরবরাহ, ট্রানজিট ফি ইত্যাদি ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়।

২০১৩ সালের নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা ত্যাগ করে ইউক্রেন সরকার। সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হাজারও বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে। তারা সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পেছনে রাশিয়ার চাপকে দায়ী করে। ২০১৪ সালে তুমুল আন্দোলনের চাপে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। সে সময় বিরোধী দল ক্ষমতা গ্রহণ করে।

একই বছরের মার্চে রাশিয়া ক্রিমিয়ায় সামরিক অভিযান চালিয়ে উপদ্বীপটিকে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে। মস্কোর এমন পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এপ্রিলে ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী ডোনেটস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করে। ইউক্রেনও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ওই বছরের মে মাসে পশ্চিমাপন্থি ব্যবসায়ী পেট্রো পোরোশেঙ্কো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

২০০৮ সালে বুখারেস্ট সম্মেলনে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার জন্য ইউক্রেনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানায় সামরিক জোটটির সদস্যরা। ওই সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা সম্মত হয়, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হতে পারে। ইউক্রেন সামরিক জোটটির কার্যক্রমে নানাভাবে মূল্যবান অবদান রেখেছে— এ বিষয়েও একমত হয় ন্যাটো সদস্যরা।

ওই সম্মেলনে ন্যাটোতে যোগ দিতে ইউক্রেনকে মেম্বারশিপ অ্যাকশন প্ল্যান-এ (এমএপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পদক্ষেপের অর্থ— সদস্য হতে চাওয়া দেশটিকে ন্যাটো কয়েক বছর পর্যবেক্ষণে রাখবে। ন্যাটো মিত্ররা স্পষ্ট করে জানায়, এমএপি পর্যায়ে ন্যাটো ইউক্রেনের সঙ্গে উচ্চস্তরের নিবিড় রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করবে, এর মাধ্যমে দুই পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং করণীয় ঠিক করা হবে।

নাকের ডগায় একটি রাষ্ট্র ন্যাটোতে যোগ দিলে তা রাশিয়ার কৌশলগত হুমকির কারণ হয়ে উঠবে বলে মনে করে ক্রেমলিন। ন্যাটো দেশগুলোর ভূসীমানা যেন প্রসারিত হয়ে রাশিয়ার দোরগোড়ায় না পৌঁছায়, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে চায় মস্কো। ফলে ন্যাটোর কাছে মস্কোর স্পষ্ট বার্তা— ২০০৮ সালে ইউক্রেনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যেতে হবে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে নিশ্চয়তা চান— ইউক্রেনকে কোনোভাবেই ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়া হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিভঙ্গের কোনো কারণ নেই। ন্যাটোও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ইউক্রেনকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা রক্ষা করা হবে। দেশটি ন্যাটোতে যোগ দেবে কি না, সেটি একান্তই ওই দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এতে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা শক্তির হস্তক্ষেপ ন্যাটো বরদাশত করবে না।

চীন-তাইওয়ান, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হলে কী করবে যুক্তরাষ্ট্র?

চলমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার লক্ষাধিক সেনা সমাবেশ ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধংদেহী আচরণে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কেবল টেবিলে আলোচনাই যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের মস্তিষ্কে কী চলছে তার ওপর। মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য বলছে, জানুয়ারিতেই ইউক্রেনে হামলা করতে পারেন পুতিন। সেক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কী করবেন? তিনি কি ওই ফ্রন্টে মার্কিন সেনা পাঠাবেন? আবার একই সময় যদি তাইওয়ানে হামলা করে বসে চীন, তাহলে কি দুই ফ্রন্টে সমানতালে লড়বে যুক্তরাষ্ট্র?

মার্কিন এক টিভি সাংবাদিক ঠিক এমন প্রশ্ন করেছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা কিথ কেলগকে। একইসঙ্গে দুটি ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে, অর্থাৎ তাইওয়ান ও ইউক্রেনে যথাক্রমে চীন ও রাশিয়া আলাদা হামলা করলে হোয়াইট হাউজ কী করবে? দুই ফ্রন্টেই কি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা আছে?

প্রশ্নের জবাবে কিথ কেলগের সরাসরি উত্তর ছিল— ‘না’। তিনি বলেন, দুই ফ্রন্টেই যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। কারণ ইউক্রেন ও রাশিয়া ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিতি। ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট ইউরোপিয়ান সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শক্তিশালী মিত্ররা ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। ফলে রাশিয়া হামলা করলে তা ইউরোপীয় শক্তিদেরই মোকাবিলা করতে হবে।

তাছাড়া ইউক্রেন এখনো ন্যাটোর সদস্য হয়নি। দেশটি এমনকি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নেরও সদস্য নয়। ফলে এটি কেবল ইউরোপের সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি জড়িয়ে পড়ার যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। তাছাড়া কিথ কেলগের মতে, রাশিয়া ইউক্রেনে আদৌ কোনো হামলা চালাবে না। কারণ এ পর্যন্ত ইউক্রেন সীমান্তে দুই লাখ সেনাও জড়ো করেনি রাশিয়া। একটি দেশে আক্রমণ চালাতে হলে কমপক্ষে তিন থেকে চার লাখ সৈন্য প্রয়োজন হবে মস্কোর। তাছাড়া রাশিয়ার প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যবসা বাণিজ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে হয়ে থাকে, ফলে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রেখেও রাশিয়াকে নিবৃত্ত করতে পারে ইউরোপ।

এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, আমেরিকার জন্য মূল হুমকি চীন। তাইওয়ানে চীন হামলা করলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা অন্য কোনো আঞ্চলিক শক্তির ওপর ভরসা করতে পারবে না ওয়াশিংটন। ওই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তাইওয়ানকে রক্ষা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে হবে।

ঠিক এ প্রশ্ন হোয়াইট হাউজে এক সাংবাদিক উত্থাপন করেছিলেন জো বাইডেনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা যা যা করা দরকার, তাই করব। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য কূটনৈতিক ও সামরিক দুই ফ্রন্টেই কাজ করা। আমরা নিশ্চিত করতে চাইব, তাইওয়ান পরিস্থিতি যেন কখনই যুদ্ধে রূপ না নেয় এবং ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা করলে যেন তা নিবৃত্ত করা যায়। এই মুহূর্তে এটিই আমাদের নীতি।

জ্যাক সুলিভানের কথার সত্যতা পাওয়া যায় জো বাইডেনের ব্যস্ত সময়সূচির দিকে লক্ষ্য করলেও। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধান রেখে চীনের শি জিনপিং ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন তিনি। বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া বা চীনের যেকোনো একটি দেশও যদি ইউক্রেন বা তাইওয়ানে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে তা সংকটে ফেলবে। যদি দু’টি দেশই হামলা চালায় তাহলে চরম সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হবে। আর দু’টি দেশ একই সময়ে হামলা চালালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়াটাই মুশকিল হয়ে পড়বে।

প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে সমানতালে যুদ্ধ করে নিজ ভূখণ্ড নিরাপদ রাখতে পারবে। কিন্তু একইসঙ্গে নিজেকে রক্ষার পাশাপাশি একাধিক মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়া দেশটির জন্য প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাধর মার্কিন মিত্রদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে। অর্থাৎ, চীন-রাশিয়ার একই সময়ের আক্রমণের অর্থ হবে বিশ্বজুড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ— যাকে আমরা বিশ্বযুদ্ধ বলে জানি।

আরও পড়ুন

সারাবাংলা/আইই/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন