বিজ্ঞাপন

শহিদজায়া মুশতারী শফী আর নেই

December 20, 2021 | 7:04 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বীর ‍মুক্তিযোদ্ধা, দেশের প্রগতিশীল-অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক গণআন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী আর নেই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বামী-ভাইকে হারিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আমৃত্যু ঘাতকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমৃত্যু সংগ্রামী এই বীরের মৃত্যুতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (২০ ডিসেম্বর) বিকেলে বেগম মুশতারী শফী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ৮৩ বছর বয়সী বেগম মুশতারী শফী দুই ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন।

উদীচী চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক শীলা দাশগুপ্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিনি (মুশতারী শফী) শ্বাসকষ্টসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার উনাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আজ বিকেল চারটার কিছু পরে লাইফ সাপোর্ট খুলে মৃত ঘোষণা করেছেন ডাক্তার।’

বিজ্ঞাপন

সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেন মুশতারী শফী। তবে পৈতৃক নিবাস ফরিদপুর জেলায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার স্বামী মোহাম্মদ শফী এবং ছোট ভাই এহসানকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক ছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর থেকেই তিনি প্রগতিশীল-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পাশাপাশি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা পালনের জন্য তাকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক ২০১৬ সালে ‘ফেলোশিপ’ প্রদান করা হয়। এছাড়া তিনি বেগম রোকেয়া রাষ্ট্রীয় পদকেও ভূষিত হয়েছিলেন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মুশতারী আপার জীবন ছিল ত্যাগের এবং সংগ্রামের। পাকিস্তান আমলেই তিনি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত নারীদের নিয়ে বান্ধবী সংঘ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। বান্ধবী পত্রিকা বের করেন। সেই পত্রিকার সব কর্মীই ছিল নারী। নারীদের নিয়ে নাটক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন। এভাবে তিনি নারী জাগরণে ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনার বাসায় বসেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বৈঠক হয়। চট্টগ্রামে সেটার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল। এর মধ্যেই স্বামী ও ভাইকে হারালেন। পরে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে গেলেন। সেখানে বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলেন।’

বিজ্ঞাপন

‘স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে তিনি কষ্টে পড়ে যান। বেতারের সামান্য চাকরি দিয়ে তিনি তাদের বড় করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি আমৃত্যু নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের আন্দোলন, ‍মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। উনার জীবনটাই ত্যাগের এবং সংগ্রামের। তার মৃত্যুতে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল,’— বলেন আবুল মোমেন।

শিক্ষা উপমন্ত্রীর শোক

বিজ্ঞাপন

শহিদজায়া বেগম মুশতারী শফীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। শোকবার্তায় উপমন্ত্রী বলেন, শহিদজায়া বেগম মুশতারী শফীর স্বামী মোহাম্মদ শফি ও ছোট ভাই এহসান ১৯৭১ সালের এপ্রিলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন। স্বামী ও ভাই হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে মানব মুক্তির সংগ্রামে তিনি যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন সাহসী যোদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা একজন প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার মানুষকে হারালাম।’

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ

শহিদজায়া বেগম মুশতারী শফীর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। নগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা মহিউদ্দিনও শোক জানিয়েছেন। শোকবার্তায় বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ এবং সেটা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কঠিন প্রতিকূল সময়েও বেগম মুশতারী শফী যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন, সেটি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তার মৃত্যুতে বাঙালি জাতি আজ স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করছে।

সিপিবি

শহিদজায়া বেগম মুশতারী শফীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহআলম। চট্টগ্রাম জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল নবী ও সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা পৃথক বিবৃতিতে শোক জানিয়েছেন।

শোকবার্তায় সিপিবি নেতারা বলেন, বেগম মুশতারী শফীর পরিবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। তার স্বামী ডা. শফী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ নিজের হেফাজতে রেখেছিলেন। এ কারণে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাকে এবং মুশতারী শফীর ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। স্বামী-ভাই হারিয়েও মুশতারী শফী মনোবল অক্ষুণ্ন রেখে চট্টগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যান। স্বাধীন দেশে প্রগতিশীল সংস্কৃতির সংগ্রাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন, নারীমুক্তির আন্দোলন, নাগরিক আন্দোলন-সবক্ষেত্রে রাজপথে সোচ্চার থেকেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ছিল তার স্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বেগম মুশতারী শফীর অবদান অবশ্যই স্মরণে রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

ওয়ার্কার্স পার্টি

শহিদজায়া বেগম মুশতারী শফীর মৃত্যুতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি চট্টগ্রাম জেলা কমিটি গভীর শোক প্রকাশ করছে। জেলা সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহানের পাঠানো শোকবার্তায় বলা হয়েছে, বেগম মুশতারী শফী ছিলেন ষাটের দশকে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ফসল। মুক্তিযুদ্ধে তিনি শুধু স্বামী ও ভাইকে হারাননি, মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে তিনি অবদান রাখেন। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সংঘটিত করতেও তিনি অবদান রাখেন। মুশতারী শফীর মৃত্যুতে দেশ একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক এবং দেশপ্রেমিককে হারাল।

উদীচী চট্টগ্রাম

উদীচী চট্টগ্রামের সভাপতি বেগম মুশতারী শফীর মৃত্যুতে সংগঠনের সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাশ ও সাধারণ সম্পাদক শীলা দাশগুপ্তা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় বলা হয়েছে, উদীচীসহ চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সংস্কৃতি অঙ্গনের অভিভাবককে হারিয়ে আমরা গভীর শোকাহত। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল সংস্কৃতি অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

এছাড়া প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পাল, চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অ্যানি সেন ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী, সমাজ সমীক্ষা সংঘের সভাপতি কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু ও নির্বাহী পরিচালক শিহাব চৌধুরী বিপ্লব, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সংসদ কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদস্য সরওয়ার আলম চৌধুরী মণিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক জানিয়ে বিবৃতি পাঠানো হয়েছে।

সারাবাংলা/আরডি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন