বিজ্ঞাপন

আমেরিকার হঠকারিতায় চীনের উত্থান, বাংলাদেশ ঠিক বন্ধুর সঙ্গেই চলবে

December 29, 2021 | 6:36 pm

মুজাহিদুল হক সৌরভ

আমেরিকা কিছুদিন আগে গণতান্ত্রিক জোট সমূহের একটি সম্মেলন ডাক দেয় এবং নিজে নেতা সেজে একটি তালিকা বানিয়ে বিভিন্ন দেশকে সেই অনুষ্ঠানে অনলাইনে যোগদানের আহ্বান জানায়। সময়ে সময়ে বিভিন্ন কাজ-কর্মে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতান্ত্রিক দেশ সমূহের নেতা হিসেবে জাহির করে। গণতান্ত্রিক দেশের জোট যদি হয় তবে প্রশ্ন আসে— অন্যান্য বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ সমূহকে পাশ কাটিয়ে আমেরিকা নিজে নেতা হয় কিভাবে? আমেরিকা যে নিজেই একটি অগণতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী হানাদার রাষ্ট্র তার বহু নজির রয়েছে। তারা ফিলিপাইনে জঘন্যভাবে স্থানীয়দের দমন করে উপনিবেশ গেড়েছিল। এই আমেরিকাই হাওয়াই এর রাজাকে হত্যা করে এই দেশকে দখলে নিয়েছে। এই আমেরিকা যুদ্ধের মাধ্যমে মেক্সিকো দখলপূর্বক ধ্বংস করে পরবর্তীতে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেখান থেকে সরে আসে।

বিজ্ঞাপন

স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে আমেরিকা নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর খবরদারি দেখাতো। পেশোয়ারে বসে খবরদারি দেখাতে পারার সুযোগের বিনিময়ে আমেরিকা পাকিস্তানকে অস্ত্র সহযোগিতা দিতো। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান আমেরিকার এই অস্ত্র সহযোগীটা থেকে বের হয়ে আসতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। কিন্তু আইয়ুব খানের হার্ট অ্যাটাকের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক পন্থায় আইয়ুব খানের কাছ থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেয়।

ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেওয়ার এই সময়টিতে ইয়াহিয়া খান ও আমেরিকার তৎকালীন প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জারের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে কখনোই পেশোয়ারের সেই ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার সমঝোতা হয়। এই প্রেক্ষিতে কিসিঞ্জারের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের ভিন্ন মাত্রার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

আইয়ুব খান যে তলে তলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল তা ইয়াহিয়া খান আমেরিকার কাছে ফাঁস করেছিল। তাছাড়া পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্ম যুদ্ধের সময় আমেরিকা ও চীন উভয়ই নিজ নিজ স্বার্থে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এই শিশু রাষ্ট্রকে গলা টিপে হত্যা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল।

আমেরিকা যখন দাবি করে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের বিকাশ ও বাড়বাড়ন্ত থেকে শুরু করে সবকিছু তার হাতে, তখন প্রশ্ন চলে আসে— এখন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীন বিরোধী ভূমিকা নিয়েছে তা ২০০০ সালে কেন নেয়নি? তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেন চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছিল? বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে কেনইবা আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ‘এভাবে গণতন্ত্রের ছোঁয়া লাগতে থাকলে চীনেও দ্রুত গণতন্ত্র কায়েম হবে!’ প্রশ্ন এসে যায়- বিগত এই বছরগুলোতে চীনে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসেনি কেন? ভুলটা তবে কোথায় হয়েছিল? ভুলটাই বা কে করেছিল? সে সময়ে ভুল যারা করেছিল (ডেমোক্রেটিক পার্টি) তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায়।  আর আমেরিকার সে ধারণাকে যারা (কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না) ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে তারাও চীনের ক্ষমতায় রয়েছে এখনো। এখন যারা চীনের বর্তমান বাড়বাড়ন্তের হিসাব কষে চিন্তিত, মূলত বিশ্বরাজনীতিতে তাদের বাড়বাড়ন্তের কারণেই চীনের এতো উত্থান! এবং চীনের এই উত্থানের কারণেই আমেরিকা শঙ্কিত। আদতে যে আমেরিকা গণতন্ত্র গণতন্ত্র করে সারা পৃথিবীতে ছবক দেয়, গণতন্ত্রের নামে এতকিছু করে তারাই মূল সমস্যাটা বাধিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা চীনের যে উন্নয়নের কথা আলোচনা করি তা ২০০০ সাল পর্যন্ত স্বাভাবিক গতিতে এসেছে ১৯৭৮ সালে
চীন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর। এই সময়টাতে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬%- ৭%। ২০০০ সালের পরে গিয়ে এই প্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। চীন যে এই অস্বাভাবিক গতিতে আগানোর সুযোগ পেল এর দায়ও বর্তায় আমেরিকার ওপর।

এই আমেরিকাই যদি সব ভুল করে এবং এই ভুলের ফলে চীনের উত্থানে আবার আমেরিকাই যদি শঙ্কিত থাকে, এ ইস্যুতে আমেরিকাই যদি বিশ্বরাজনীতিতে চীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জোট গঠন করে চীনকে দমাতে চায়, এই সব কাজ যদি শুধু আমেরিকাই করে তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়? গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যেসকল কারণ রয়েছে তার অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। এই দারিদ্র্য দূরীকরণে ব্রেটন উড সিস্টেম এর আদলে পশ্চিমারা বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ গঠন করে ১৯৪৪ সালে। তাদের এই দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে যে কটি দেশ বের হয়ে এসেছে তার মধ্যে বাংলাদেশের নামই আমল যোগ্য। কারণ মালদ্বীপ, ভানুয়াতুঁসহ অন্য যে কটি দেশ বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ এর সহায়তায় দারিদ্র্য বিমোচন করেছে তাদের জনসংখ্যা খুবই নগণ্য যা ৩-৫ লক্ষের বেশি নয়, পক্ষান্তরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদনে একটু খেয়াল করলে দেখা যায়—গণতন্ত্রের মাধ্যমে, বিভিন্ন দেশের দারিদ্র্য বিমোচন-সুশাসন-জনগণের নিরাপত্তা সহ অন্যান্য, এই পৃথিবীতে ফলপ্রসূ পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বিশ্ব ব্যাংক উন্নয়নশীল দেশ সমূহকে আর্থিক সহায়তার নামে ঋণ দেয়, এটা সত্য। তবে এই ঋণের টাকা খরচে বিভিন্ন শর্ত আরোপ থাকে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন মৌলিক খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য চাপ প্রয়োগ করে বিশ্ব ব্যাংক। শুধু তাই নয়, তাদের কথা অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক দেশের সরকারের সে দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। যেমন— শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, খাদ্যসহ বিভিন্ন মৌলিক খাত নিজেদের চাহিদা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়নের জন্যই সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণ তাদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসায়। এখন যদি বিশ্ব ব্যাংক চাপ দিয়ে জনগণের চাহিদা উপেক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে বাধ্য করে তাবে তা হয় চরম অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক।

বিজ্ঞাপন

দারিদ্র্য দূরীকরণ থেকে শুরু করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেখানোর মতো কোন সাফল্য যদি থেকে থাকে তবে তা চীনের হাতেই রয়েছে। কারণ দারিদ্র্য দূরীকরণে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বাইরে ভিন্ন পদ্ধতিতে চীনই বিশ্বের কাছে বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে গণতান্ত্রিক হিসাবনিকাশ নস্যাৎ করে চীনই দেখিয়েছে এই পদ্ধতি ছাড়াও ভিন্ন পদ্ধতিতে চরম প্রান্তিক দারিদ্র্যের হাত থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে হয়। তাছাড়া চীন যখন কোন দেশকে ঋণ দেয় তখন তারা বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ এর মতো সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত পরিবর্তনের শর্ত আরোপ করে না। চীন একটা আদর্শ ও মান সামনে নিয়ে আসে যাঋণ নেওয়া দেশ অনুসরণ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে। এক্ষেত্রে কিছু শিখতে চাইলে চীনের কাছ থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে।

কিছুদিন আগে কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশ সহ গণতান্ত্রিক কয়েকটি দেশকে বাদ দিয়ে আমেরিকা গণতান্ত্রিক সম্মেলনের ডাক দেয়। এর পরপরই বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, র‍্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়নের (র‍্যাব) সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে। অথচ এই কয়েকজন কর্মকর্তা জঙ্গী, সন্ত্রাসী ও মাদক চোরাকারবারি দমনে জিরো টলারেন্স দেখিয়ে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রেখেছেন ও রেখে চলেছেন বাংলাদেশে। এই নিষেধাজ্ঞার সপ্তাহান্তে সন্ত্রাস দমনে র‍্যাবের ভূমিকার প্রশংসা করে আরেকটি বিবৃতি প্রকাশ করে আমেরিকা। ইতিহাস থেকে দেখা যায় আমেরিকার মধ্যে অতর্কিতভাবে বাংলাদেশকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে বা বিপদে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তৎকালে নিজের দেশের আয়ের জন্য কিউবায় বস্তা রফতানি করার কারণে আমেরিকা বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তখন সরকারি পণ্যবাহী জাহাজ আটকে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে খাদ্য সংকট দেখা দেয়; যা থেকে পরিত্রাণ পেতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সময় আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে! ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে অস্ত্র ব্যবহার করে বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল সে অস্ত্র,গোলা-বারুদ, কামান ইত্যাদি আমেরিকার দেওয়া৷ আমেরিকার দেওয়া অস্ত্রে আমাদের ওপর হলোকাস্টের চেয়েও নৃশংসভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে তা জানার পরও আমরা সব ভুলে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলাম।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইন্ধনে এবং সহায়তায় অনেক দেশকে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ এর মাধ্যমে ঋণের ফাঁদে ফেলে সেসব দেশের জনপ্রিয়, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সরকার উৎখাতের কালো দাগ আমেরিকার হাতে রয়েছে। যেমন: ইরানের জনপ্রিয় ড. মোসাদ্দেগ (১৯৫৩), ব্রাজিলের নির্বাচিত গাউলাট (১৯৬৪), ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণ (১৯৬৫), গুয়াতেমালায় আরবেনজ (১৯৫৪), ঘানার জাতীয়তাবাদী নক্রুমা (১৯৬৬), মালিতে কাইটা (১৯৬৮) সহ বিভিন্ন সরকার প্রধানকে খুব নির্মম ও অশ্লীলভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। তাছাড়া ১৯৭৩ সালে চিলির ক্ষমতায় আসীন জনপ্রিয় সরকার প্রধান সালভাদোর আইয়েন্দেকে (১৯৭৩-৭৪) হত্যা করে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযোগ বারবার আমেরিকার দিকে এসেছে। বড় বড় তেল কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্রকে বলি দিতে আমেরিকা কখনো পিছপা হয়নি (ইরান)। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে আমেরিকার খুব একটা লাভ হয়েছে তাও নয়। বরং সে সময়ে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে ব্যঙ্গ করা আমেরিকার পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জারের ডেপুটি জনসন এর তীর্যক মন্তব্যে কিসিঞ্জারের বিদ্রূপাত্মক অট্টহাসিকে ভুল প্রমাণ করে আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান পৃথিবীর এক বিস্ময়।

ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকা কখনোই প্রয়োজনের সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল না; বরং বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। প্রায় প্রতিবার অসমর্থিত সূত্রের দেওয়া তথ্য যাচাই এবং এসব সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ ফলাফল কি হতে পারে তা নিরীক্ষা না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু বছর আগে আমেরিকা বাংলাদেশের আরএমজি সেক্টরে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার ফলে আন্তর্জাতিক পোশাক বিপনন কোম্পানিগুলো চীনে উৎপাদিত পোশাক অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রয় করতে থাকে এবং চীন অর্থনৈতিকভাবে আরও রমরমা অবস্থায় পৌঁছে যায়। একই ধারাবাহিকতায় চীনের অন্যান্য শিল্প- প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। বিষয়টি এমন নয় চীন বড় ধরণের কোন শিল্প বিপ্লব ঘটিয়ে এগিয়েছে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমূহের ওপর ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণেই চীন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে আমেরিকাসহ তাদের মিত্র দেশগুলো চীনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেওয়ার ফলেই আজ চীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশ হিসেবে নিজেদের জানান দিচ্ছে।

প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। অস্ট্রেলিয়া নিজেদের নৌবাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। পরবর্তীতে আফগানিস্তান থেকে সরে যাওয়ার সময়ে আমেরিকা অস্ট্রেলিয়াকে প্রলুব্ধ করে (ফ্রান্সের পিঠে ছুরি মারা) চুক্তিটি ছিনতাই করে নিজের কাছে নিয়ে যায়। এর ফলস্বরূপ আমেরিকা ও তার মিত্র দেশসমূহ নিয়ে গঠিত চীন বিরোধী সকল জোট থেকে ফ্রান্স নিজেদের সরিয়ে নেওয়া শুরু করে। এমনকি কিছুদিন আগে আমেরিকা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য শীতকালীন অলিম্পিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ডিপ্লোমেটিক প্রতিনিধি দল না পাঠানোর ঘোষণার পরপরই আমেরিকাকে অনুসরণ করে কানাডাসহ তাদের মিত্র কয়েকটি দেশ একই ঘোষণা দেয়। কিন্তু ফ্রান্স আমেরিকার এই ঘোষণার বিপরীতে নিজেদের ডিপ্লোমেটিক প্রতিনিধি দল বেইজিং এর শীতকালীন অলিম্পিকে পাঠানোর প্রকাশ্য ঘোষণা দেয় অনেকটা আমেরিকাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। অথচ বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে ফ্রান্সের দেওয়া উপহার ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ এখনো আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বন্ধুর সাথে কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই তার বাণিজ্য চুক্তিটি কেড়ে নিতে আমেরিকা একটুও ভেবে দেখেনি এর ফলাফল কি হতে পারে।

আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশ সমূহ বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ সহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় দারিদ্র্য বিমোচনের যে সিস্টেম বানিয়েছে সে সিস্টেমের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনতো সম্ভবই হয়নি বরং অনেক দেশ তাদের এই সিস্টেম অনুসরণ করে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়েছে বা দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে আছে। তবে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ভিন্ন। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ এর নির্ধারিত সূচকে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করা দেশ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র যে দারিদ্র্য বিমোচনের স্বীকৃতিস্বরূপ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে প্রমোশন পেতে যাচ্ছে। অনেকের মনে থাকার কথা, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের এক অধিবেশনে (২০১৩ সাল) প্রদত্ত ভাষণে বিশ্ব ব্যাংক সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া ৬০ বছরের পুরনো ক্ষমতার সমীকরণের প্রতিফলন৷’ ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর অনেক বছর পার হয়ে গিয়েছে৷ বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এসেছে। এখনই সময় বিশ্ব ব্যাংক সহ অন্যান্য সংস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো করার।

সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানে আমেরিকার বিপর্যয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমস্যায় যখন তারা আক্রান্ত তখন তাদেরই দেওয়া গণতান্ত্রিক বিভিন্ন সূচকে এগিয়ে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পাশে রাখা আমেরিকার অবশ্যই প্রয়োজন। এই সময়ে এসে বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে আমেরিকা যদি বাংলাদেশের এই অর্জনকে স্বীকার না করে তবে আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ এর দেখানোর মতো কোনো সাফল্য আর থাকবে না। বাংলাদেশ কিন্তু আমেরিকার কারণেই চীনের সাথে দহরমমহরম সম্পর্কে এতবছর জড়ায়নি। এমনকি বর্তমান করোনা মহামারির সময়ে ভ্যাকসিন রাজনীতির কথা মাথায় রেখে আমেরিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাংলাদেশ শুরুতে চীনের কাছ থেকে ভ্যাকসিন না নিয়ে আমেরিকার অন্যতম মিত্র ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউটে উৎপাদিত ভ্যাক্সিন ক্রয়ের চুক্তি করে অনেকটা বাংলাদেশে বিদ্যমান ভারতবিরোধী অংশের চাপ উপেক্ষা করে। পরে ভারত হুট করে ভ্যাকসিন রফতানি বন্ধ করার ফলে বাংলাদেশ বিপদে পড়ে যায় এবং বাধ্য হয়েই বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ভ্যাকসিন ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন করে। চীনের নেওয়া ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সাথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি লাভ। ‘সবচেয়ে বেশি লাভ’ বাংলাদেশ বারবার দূরে ঠেলে চলেছে আমেরিকার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু এই আমেরিকা বারবার বিভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে বাংলাদেশকে একপ্রকার জোর করে চীনের পেটে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে! বাংলাদেশকে পিঠ দেখিয়ে আমেরিকা বিশ্ব রাজনীতিতে খুব বেশি সফল হতে পারবে না।

শুরু থেকেই আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরণের ভুল রয়েছে! একটা সময়ে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকেও তারা আনঅফিসিয়ালি বা অফ দ্যা রেকর্ড খারাপ ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করত। অসমর্থিত কোন সোর্স থেকে মিথ্যা ও অর্ধসত্য শোনা কথায় কারো সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়া এবং বাজে আচরণ করা কোন সভ্য দেশের লক্ষণ হতে পারে না। আর এই ভুলটাই আমেরিকা বারবার করে আসছে। এই ভুল নীতির ফলস্বরূপ চীনের আজকের উত্থান। এখন আরেকটি ভুল নীতি প্রয়োগ করে চীনের উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করছে আমেরিকা। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের ওপর যদি আমেরিকা বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করত, তবে আজ চীনের এতোটা উত্থান ঘটতো না এবং তা ঠেকাতে চীনের সাথে আমেরিকার উলঙ্গ হয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে একের পর এক জোট গঠন করা লাগত না। একইভাবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে হুমকিধামকি দিয়ে নিজেদের কাছে ধরে রাখার হীনচেষ্টাও করতে হতো না।

বিভিন্ন সময়ে জিম্বাবুয়ে, উত্তর কোরিয়াসহ অনেক দেশকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েও আমেরিকা সফল হতে পারেনি। আফগানিস্তানকে দ্রুত ধ্বংস করতে গিয়ে উল্টো আমেরিকাই ২০ বছর পর সম্মান বাঁচাতে সেখান থেকে সটকে পড়েছে। আমেরিকার আমলে নেওয়া উচিত শুধু বড় দেশ নয়, ছোট দেশগুলোও আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

এখন সময় এসেছে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনঃমূল্যায়ন করার। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ থেকে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক থাকতে হয়। আমেরিকা যেন মনে রাখে ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশ এক নয়। সদ্য স্বাধীন দেশ কিছু টাকা উপার্জনের জন্য সে সময় সামান্য কিছু বস্তা রফতানির কারণে অবৈধভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমাদের সাথে অমানবিক ও নির্মম আচরণ করেছিল আমেরিকা। তখন আমরা কিছুই বলিনি। কিন্তু এবারে কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আমেরিকার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কঠিনভাবে শাসিয়ে দিতে বাংলাদেশ পিছপা হয়নি।

আমেরিকা যেহেতু গণতন্ত্রের কথা বলে সেহেতু তাদের আচার-আচরণ থেকে শুরু করে সবকিছু গণতান্ত্রিক হবে তা সবাই প্রত্যাশা করে। নিজ দেশের ভেতরে আমেরিকার গণতন্ত্রের যে বেহাল দশা তা পুরো পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে ট্রাম্প ও বাইডেনের নির্বাচনের পর। নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আনেন খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে আমেরিকার ক্যাপিটাল হিলের সে সংঘর্ষ ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’তে পরিণত হয়েছিল! মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগ সিআইএর উপদেষ্টা এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক বারবারা এফ ওয়াল্টার সিএনএনএ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন - আমেরিকায় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্র। বছর দুয়েক আগে আমেরিকা দেশ ভেদে এবং নিজের দেশের ভেতর আচরণের ভিন্নতা নিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন মন্তব্য করেছিলেন— I do not understand the United States।

কথায় কথায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং মোড়লপনা আচরণ বর্তমান বাংলাদেশ ও এর জনগণ মেনে নেবে না। বাংলাদেশ তার বন্ধুর সাথেই পথ চলবে।

লেখক: সদস্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং পিএইচডি গবেষক

সারাবাংলা/এসবিডিই/আইই

বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন