বিজ্ঞাপন

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

January 4, 2022 | 9:35 pm

নিয়াজ মোর্শেদ এলিট। একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা। বর্তমানে জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) নগদের নির্বাহী পরিচালকও তিনি। কাজ করছেন তরুণ উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা তৈরিতেও তার সংগঠনটি কাজ করছে। তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালাকে সময়ের দাবি বলে মনে করছেন তিনি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী ২০ বছরের দেশের তরুণদের গড়ে তুলতে হবে বলেও মত তার। এসব বিষয় নিয়েই সারাবাংলার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন নিয়াজ মোর্শেদ এলিট। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সারাবাংলার সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এমদাদুল হক তুহিন। ছবি তুলেছেন সিনিয়র ফটো করেসপন্ডেন্ট হাবিবুর রহমান। ভিডিও ধারণ করেছেন সেতু পোদ্দার

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: দেশের নানামুখী উন্নয়নের মধ্যেও বেকার সমস্যা এখনো দূর হয়নি। বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে আবার বেশিরভাগই তরুণ। এই তরুণদের বেকার সমস্যা সমাধানে করণীয় কী বলে মনে করেন?

নিয়াজ মোর্শেদ: বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, জাতীয় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। একইসঙ্গে আমাদের শিক্ষিত তরুণের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা এমন— আমরা কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে পারিনি। ফলে আমাদের দেশের বিশেষায়িত শিল্প খাত, তৈরি পোশাক, ইস্পাত থেকে শুরু করে আইসিটি খাতেও কিন্তু পাশের দেশ ভারত, শ্রীলংকা কিংবা নেপালেরও অনেক নাগরিক কাজ করছেন। তারা প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের এখানে শ্রমিকদের গড় বেতন হয়তো ২০০ ডলার।

বিজ্ঞাপন

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

আমরা যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বহুমুখী করতে পারি, নতুন নতুন শিল্প খাতসহ কারিগরি বিভিন্ন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা দিতে পারি, তাহলে কিন্তু বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমাদের এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জনবল তৈরি করতে হবে। আমাদের ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বা ৫০ বছর। এটাকে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এরকম খুব কম দেশেই আছে। সেদিক থেকে আমরা খুব সৌভাগ্যবান। এখন এই তরুণ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য তৈরি না করতে পারি, তাহলে এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আমাদের জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিজ্যাস্টারে পরিণত হবে। বেকারের সংখ্যা আরও বাড়বে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের এখনই চিন্তা করতে হবে। নতুন শিল্পায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তরুণ প্রজন্মকে তৈরি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা: তরুণদের উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা কী?

নিয়াজ মোর্শেদ: তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা অনেক। প্রথম আমাদের তরুণ উদ্যোক্তা নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নীতিমালা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সব ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া আছে, যার আওতায় তারা সিংগেল ডিজিটে সহজ শর্তে ঋণ পায়। আকারে ছোট হলেও নারী উদ্যোক্তারা এই সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু নীতিমালা না থাকায় তরুণরা এ ধরনের কোনো সুবিধাই পাচ্ছে না। নীতিমালা না থাকার প্রথম সমস্যা হলো— তরুণ উদ্যোক্তা কারা, কাদের আমরা তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে চিহ্নিত করব, আমরা কার জন্য অর্থায়ন করব, কাকে কাকে উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেমে নিয়ে আসব— এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই।

বিজ্ঞাপন

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

আমি জুনিয়র চেম্বারের সভাপতি হিসেবে এই উদ্যোগটি নিয়েছি, আমি তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালার জন্য কাজ করছি। তরুণ উদ্যোক্তা চিহ্নিত করতে ১৮ থেকে ৪০ পর্যন্ত বয়সকে যদি রেঞ্জ হিসেবে ধরে নিয়ে তাদের জন্য  কটি নীতিমালা করি, তাহলে সেই নীতিমালার আলোকে তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর জন্য ১০০ কোটি টাকা ইমপোজ করে, এখান থেকে ব্যাংকগুলো তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারবে। আইডিয়া আছে কিন্তু ক্যাপিটাল নেই— ফলে তরুণরা উদ্যোক্তা হতে পারছেন না। এরকম ৫০০ উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারলে তাদের একেকজনের অধীনে ১০ জনের কর্মসংস্থান হলেও কিন্তু পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারব। কিন্তু পুঁজির অভাবে ওই তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠাই সম্ভব হয় না।

বিজ্ঞাপন

কাজ করতে গিয়ে যা দেখেছি তরুণদের নতুন নতুন আইডিয়া আছে। কিন্তু ব্যাংকের কাছে গেলে ব্যাংক বলে— অভিজ্ঞতা নেই, অর্থায়ন করা যাবে না। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থের সংস্থান তাই বড় একটি ইস্যু। সেজন্যই আমরা নীতিমালা নিয়ে কাজ করছি। আমরা সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপন করেছি। শিগগিরই হয়তো আমরা একটি নীতিমালা পাবো। এছাড়াও রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স, ভ্যাট— এরকম অনেক জায়গায় আমাদের প্রতিবন্ধকতা আছে। একটি নীতিমালার মাধ্যমেই কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান সহজেই করা সম্ভব।

আরেকটি বিষয় বলতে হয়। একটা সময় শিল্প কারখানা স্থাপন করতে গিয়ে ৬০ শতাংশ বিনিয়োগই চলে যেত ভূমিতে। সব দেশে কিন্তু পরিস্থিতি এমন নয়। অন্যান্য দেশের সরকার জায়গা দেয় নামমাত্র মূল্যে, বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে। এরপর প্রধানমন্ত্রী আমাদের এখানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিলেন। এখন আমাদের ভূমিতে বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে অন্য খাতে বিনিয়োগ বেশি করতে পারছি। আমরা চাওয়া— তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট পাওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। আমরা নীতিমালার একটি খসড়া বা প্রস্তাবনা সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন ঘটবে।

সারাবাংলা: তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে আপনাদের সংগঠন কী কী কাজ করছে?

নিয়াজ মোর্শেদ: তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একমাত্র সংগঠন জুনিয়র চেম্বার। বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোনো সংগঠন নেই, যারা তরুণদের নিয়ে কাজ করছে। যাদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ৪০ বছর, এর বাইরে কেউ জুনিয়র চেম্বারের সদস্য নয়। এই সংগঠনের সদস্য উদ্যোক্তা হতে পারেন, আবার চাকরিজীবীও হতে পারেন। এই সদস্যদের আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। আবার আমরা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের কাজও করি। কোনো সদস্যের কোনো সমস্যা থাকলে সেগুলো নিয়ে কাজ করি। আমরা বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করি। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা যে নীতিমালা করছি, সেটিও কিন্তু বিজনেজ ডেভেলপমেন্টর একটি অংশ।

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

আমরা নিজেদের মধ্যে একটি ইয়ুথ সামিট করি, যেখানে তরুণ সদস্যদের সেবা ও পণ্যগুলো প্রদর্শন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থাকে। এতে বিজনেস আইডিয়াগুলো শেয়ারের সুযোগ তৈরি হয়, যেন ব্যাংক চাইলে তাদের অর্থায়ন করতে পারে। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারাই অংশ নিতে পারে। সেখান থেকে অনেকেই নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট করে। জুনিয়র চেম্বারের একটি ফাউন্ডেশন আছে, সেখান থেকেও আমরা সদস্যদের অর্থায়ন করি।

আমাদের তিন দিনের এই ইয়ুথ সামিট একটি বড় নেটওয়ার্কিং প্লেস, যেখানে দুই থেকে তিন হাজার সদস্যদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং হয়। একজনের রিসোর্সের সঙ্গে আরেকজনের ক্যাপাসিটি শেয়ার করতে পারে। এভাবে বিজনেস ডেভেলপমেন্টটা হয়। এখন কিন্তু যার যত বেশি নেটওয়ার্ক থাকবে, তার তত বেশি গ্রোথ হবে। সেটি আমাদের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সদস্যরা করতে পারছেন।

সারাবাংলা: তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা নিয়ে বলছিলেন। বিষয়টি নিয়ে যদি আরেকটু বলতেন...

নিয়াজ মোর্শেদ: নীতিমালা নিয়ে আমাদের একটি প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আমাদের কাছ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাবনা চাওয়া হয়েছে। নীতিমালার জন্য তো অনেক গভীরে যেতে হবে। সেখানে আমরা একটি টপলাইন আইডিয়া দিচ্ছি। তারপর আরও বিস্তারিত তথ্য চাইলে সেটি আমরা দেবো। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করেই এটি করতে হবে। আপাতত আমরা নীতিমালার টপলাইনটি করেছি, যা জমা দেবো শিগগিরই। আর নীতিমালার যে প্রয়োজন রয়েছে, সেই দাবিটিই আমরা উত্থাপন করেছি। যেহেতু আমাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ এর ভেতরে, তাই আমরা এই বিষয়টি আলোচনায় এসেছি। এ সংশ্লিষ্ট একটি চিঠি আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠাচ্ছি। তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা আসলে এখন সময়ের দাবি।

সারাবাংলা: আইসিটি খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

নিয়াজ মোর্শেদ: আইসিটি খাতে যে উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ হচ্ছে, এর ৯০ শতাংশই হয়েছে তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। তারা যে সময়ে লেখাপড়াটা করেছে, গত কয়েক বছরে যারা কম্পিউটার রিলেটেড বিভিন্ন বিষয়ে লেখাপড়া করেছে, তারা এই খাতে এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের তরুণরা কিন্তু প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলে কাজ করতে চায় না। তারা দেখতে চায় সফটওয়্যার সংশ্লিষ্ট ও সেবাভিত্তিক কী ধরনের ব্যবসা করা যায়। এ ক্ষেত্রে আমি চালডাল ডটকম, সেবা এক্সওয়াইজেড, নগদের কথা বলব। নগদে আমি একজন নির্বাহী পরিচালক। আমরা তো তরুণরা মিলেই করেছি। এটিও কিন্তু সফওয়্যারের বিজনেস।

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

আইটি খাতে তরুণদের অবদানই বেশি। এই খাতের যে ভবিষ্যৎ, সেখানেও তরুণরাই নেতৃত্ব দেবে। আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর আইটি খাতে তারাই নেতৃত্ব দেবে, যারা গত ২০ বছরে এই খাত নিয়ে পড়ালেখা করেছে। ঘরে বসে কেনাকাটা করা, রাইড শেয়ারিং, মুহূর্তেই টাকা পাঠানো, ঘরে বসে বিল দেওয়া, গাড়ির মেকানিক অনলাইনে ডাকার সুযোগ— এই বিষয়গুলো কিন্তু আমরা ১০ বছর আগেও চিন্তা করিনি। এগুলো হয়েছে তরুণদের হাত ধরেই। তাই আগামী সময়গুলোর উপযোগী হিসেবে তরুণদের গড়ে তোলার কাজটি করে যেতে হবে।

সারাবাংলা: তরুণরা কোনো আইডিয়া নিয়ে এলে তাদের সহায়তায় আপনারা কী করেন?

নিয়াজ মোর্শেদ: আমরা তো আমাদের সদস্যদের জন্য কাজ করি। প্রথমত আমরা আমাদের ট্রাস্ট থেকে ছোট আকারে অর্থায়নের ব্যবস্থা করি। এর বাইরে বড় আকারের অর্থায়ন প্রয়োজন হলে আমরা তখন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই। আইটি খাতে আমাদের ব্যাংকগুলো এখনো বিনিয়োগ করতে চায় না। তারা তৈরি পোশাক, ইস্পাত বা ভারী শিল্পে বিনিয়োগ করতে চায়। ফলে আইটি বা সফটওয়্যারভিত্তিক আইডিয়া নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তাদের জন্য এই সমস্যাটি রয়েছে গেছে।

বাংলাদেশে আইডিয়াভিত্তিক বিনিয়োগ নেই, যেটি সিলিকন ভ্যালিতে আছে। সেখানে অনেক ছোট ছোট বিনিয়োগকারী আছে। আমাদের এখানে ওই নলেজটাই নেই যে আইডিয়া বুঝে নিয়ে বিনিয়োগ করবে। সরকার স্টার্টআপ বাংলাদেশ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই ইকোসিস্টেম তৈরির কিছুটা চেষ্টা করছে। এর ফলে কিছু কিছু ইনভেস্টর আইডিয়া নিয়েও কাছ করছেন। তবে সার্বিকভাবে আইটি খাতে অর্থায়ন একটি বড় সমস্যা। মেধাস্বত্ব বা এর মূল্যায়ন আমরা করতে পারি না। এ ক্ষেত্র আমাদের কোনো গাইডলাইনও নেই। এক্ষেত্রে আমাদের সংগঠনেরও কিছু করার আছে। তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গে আইটি সেক্টরে তরুণ উদ্যোক্তাদের অবদান নিয়ে তাদের অর্থায়ন নিয়ে আমরা কথা বলব। এটি আমাদের পরিকল্পনার মধ্যেই আছে।

সারাবাংলা: তরুণরা কীভাবে উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে, বিষয়ে কী পরামর্শ দেবেন?

নিয়াজ মোর্শেদ: শিক্ষাজীবনে কিন্তু অনেকেরই ব্যবসা করার স্বপ্ন থাকে। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে পরে তারা চাকরিকেই বেছে নেয়। খেয়াল করলে দেখবেন, আমি-আপনি অনেকেই কিন্তু ব্যবসা করতে চেয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছি। হয়তো পারিপার্শ্বিক কারণে সেটি হয়ে উঠেনি। এখন তরুণ যারা উদ্যোক্তা হতে চান, তাদের জন্য দুইটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ— প্রথমত ধৈর্য্য, দ্বিতীয়ত একাগ্রতা। কারণ উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা অনেক কঠিন। কেউ সাফল্য পেলে তার সাফল্য আমরা দেখি, কিন্তু এর পেছনে কতটা কঠিন পথ তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে সেটি আমরা দেখি না। আমি যখন ব্যবসা শুরু করি, তখন ব্যাংকের কাছে গিয়ে ঋণ পাইনি। ব্যাংক টাকা দেবে না, কারণ আমি নতুন এবং আগে কখনো ঋণ নেইনি। আরও প্রতিবন্ধকতার কথা তো আগেই বলেছি। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে ধৈর্য্য ও একাগ্রতা নিয়ে লেগে থাকতে পারলে তবেই কোনো তরুণ নিজেকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

তরুণ উদ্যোক্তা নীতিমালা সময়ের দাবি: নিয়াজ মোর্শেদ

সারাবাংলা: সফল তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি কোনো পরামর্শ?

নিয়াজ মোর্শেদ: যারা সফল তাদের প্রতি আমার অনুরোধ— যে তরুণরা ব্যবসা করতে চায়, তাদের সঙ্গে যেন আমরা সমন্বয় করতে পারি। নিজেদের সফলতার গল্পগুলো যেন তাদের কাছে তুলে ধরতে পারি। পাশাপাশি আমরা যদি অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর হিসেবে কাজ করতে পারি, সেটি হবে একটি বড় বিষয়। আমি একজন সফল উদ্যোক্তা, আরেকজন উদ্যোক্তার বিজনেস আইডিয়াতে কন্ট্রিবিউট করে কিন্তু অংশ হয়ে যেতে পারি। আমি আহ্বান জানাব— অপানারা সফল উদ্যোক্তা, আপনারা সফল হয়েছেন— তরুণ যাদের বিজনেস আইডিয়াগুলো ভালো, তাতে বিনিয়োগ করে অংশীদার হোন। এতে আরও অনেক বেশি তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

সারাবাংলা: জুনিয়র চেম্বার নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যদি বলতেন।

নিয়াজ মোর্শেদ: আমরা একটি ট্রাস্ট গঠন করেছি, যে ট্রাস্টের টাকা দিয়ে আমরাই সরাসরি তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করতে পারব। আমরা চাই, সরকারের ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরা কিছু অর্থায়ন করব। সেই অর্থায়নে যদি ৫০ জন উদ্যোক্তাও তৈরি হয়, সেটাই হবে আমাদের অর্জন। তার জন্য আমরা কাজ করছি। আমরা যে ট্রাস্ট করেছি, তার জন্য ফান্ড রেইজ করছি। এই ফান্ড থেকেই আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন শুরু করব। এটাই আমাদের আপাতত পরিকল্পনা।

সারাবাংলা: আপনার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্পটা যদি বলতেন...

নিয়াজ মোর্শেদ: আমি ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান। বাবার সঙ্গে ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক বিষয়েই দ্বিমত হতো। উনি একভাবে চাইতেন, আমি অন্যভাবে চাইতাম। পরে ২০০৭-০৮ সালের দিকে বাবার ব্যবসা থেকে সরে যাই। ওই সময় আমি যে ব্যবসাটি শুরু করি, তার জন্য প্রথম মূলধনটা দিয়েছিলেন মা— ২০ লাখ টাকা। ওই টাকা দিয়ে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে প্রথম থ্রি হুইলার আমদানি শুরু করি। প্রথমে তিন-চারটি থ্রি হুইলার এনেছিলাম। এরপর যখন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিই, আমি প্রায় ২০০ গাড়ির অর্ডার পেয়ে যাই। তখন পাঁচ থেকে সাত টাকা অ্যাডভ্যান্স পাই। সেই অ্যাডভান্সের টাকা দিয়ে বড় লটে থ্রি হুইলার আনতে শুরু করি। পরে থাইল্যান্ডে আমি একটি কারখানার মালিকানা নিই। সেই কারখানা পরে আমি বাংলাদেশে স্থাপন করেছি।

বাংলাদেশে আমরা শুধু ইঞ্জিন চেসিসটা আনতাম। এর বাইরে ফুল বডি আমাদের মিরসরাইয়ে কারখানায় উৎপাদন করা হয়। আমি ফোর স্ট্রোক সিএনজি নিয়ে কাজ করি। পরে আমি মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলিং করি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক ইকুইপমেন্ট হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ শুরু করি। এরপর আসি নগদে। আমি প্রতিষ্ঠানটির একজন অংশীদার।

সবকিছু মিলিয়ে যাত্রাটা অনেক কঠিন। আমি ভাগ্যবান যে আমার ব্যবসায়িক পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে। তা না করলে কিন্তু আমাকে নিঃস্ব হয়ে যেতে হতো। আমার সবগুলো ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই কাজ করেছে বলে আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।

সারাবাংলা: সারাবাংলাকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

নিয়াজ মোর্শেদ: সারাবাংলাকেও ধন্যবাদ।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন