বিজ্ঞাপন

জামায়াত নেতার ছেলের হাতে নৌকা, আওয়ামী লীগে তোলপাড়

January 7, 2022 | 10:18 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাতকানিয়া উপজেলার এক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জামায়াত নেতার ছেলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা আওয়ামী লীগ বলছে, তৃণমূল থেকে মনোনয়নের যে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে সেখানে তার নাম ছিল না। ওই ব্যক্তি কখনোই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন না। তার মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দিয়েছেন তারা।

৭ ফেব্রুয়ারি সপ্তম ধাপের ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড সপ্তম ধাপের নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে। দলটির দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সই করা একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি শুক্রবার গণমাধ্যমে আসে।

বিজ্ঞাপন

ওই তালিকায় দেখা গেছে, সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মো. রুহুল্লাহ চৌধুরী। তিনি জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রয়াত মুমিনুল হক চৌধুরীর ছেলে। অবশ্য তার ভগ্নিপতি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য, যিনি জামায়াত ঘরানা থেকে দলটিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পান বলে প্রচার আছে। আসনটিও জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মুমিনুল হকের মেয়ে অর্থাৎ নদভীর স্ত্রী রিজিয়া রেজা চৌধুরী মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

এদিকে, আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সাংসদ হলেও নদভী এবং তার পরিবারের সদস্যদের ছাড় দিতে রাজি নন দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগের একাংশের বিরোধিতার মধ্যেই নদভী ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ‍দুই দফায় সাংসদ নির্বাচিত হন। জামায়াত নেতার ছেলে ও নদভীর শ্যালক রুহুল্লাহ চৌধুরীর মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বড় অংশের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী সারাবাংলাকে জানান, তৃণমূলের সভার সুপারিশের ভিত্তিতে চরতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নের জন্য পাঁচ জনের নাম দলীয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়েছিল। এরা হলেন- সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি প্রদীপ কুমার চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আবদুল মালেক খান ও মোহাম্মদ মনজুর, চরতী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মঈনুদ্দীন চৌধুরী এবং সদস্য চৌধুরী মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন খান।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, সাতকানিয়া উপজেলার সভাপতি এম এ মোতালেব এবং সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরীর সই করা মনোনয়নের সুপারিশের তালিকা পাঠানো হয় কেন্দ্রে। কিন্তু, কেন্দ্রঘোষিত প্রার্থীর তালিকায় সুপারিশ করা পাঁচজনের কারও পরিবর্তে জামায়াত নেতার ছেলে রুহুল্লাহ চৌধুরীর নাম আসার পর কুতুব উদ্দিন চৌধুরী আপত্তি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে তিনি নিজেই ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি দেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, রুহুল্লাহ চৌধুরীর বাবা মুমিনুল হক চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত হয়ে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী আব্দুল কাদের মোল্লার জন্য চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় ইমামতি করেছিলেন। মুমিনুলকে রাজাকার ও জামায়াত নেতা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর চরতী ইউনিয়নের তুলাতলীতে বালুমহাল দখল করে এলাকার কৃষিজমি নষ্টের প্রতিবাদকারী কৃষকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের অভিযোগে রুহুল্লাহ’র বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কুতুব উদ্দিন চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) মনোনয়ন বোর্ডের সভার পর আমরা শুনেছিলাম, আমাদের সুপারিশ করা প্রদীপ কুমার চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আজ যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হল, তাতে দেখলাম রুহুল্লাহ চৌধুরীর নাম। অথচ এই ব্যক্তি কোনোদিন আওয়ামী লীগ করেনি। তিনি জামায়াত পরিবারের সন্তান। তার বাবা জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ছিল। আমরা উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে বর্ধিত সভা করে যাদের নাম মনোনয়নের জন্য সুপারিশ করেছিলাম, সেখানে এই রুহুল্লাহ চৌধুরীর নাম ছিল না। আমি জানি না, রাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত কিভাবে সকালে পাল্টে গেল ? মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভেতর আর আওয়ামী লীগ নেই। আওয়ামী লীগ কারা চালাচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।’

অবশ্য রুহুল্লাহ চৌধুরী দাবি করেছেন, বাবা জামায়াত করলেও তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছেন। সাতকানিয়া তাঁতী লীগের সঙ্গেও জড়িত। আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না।

‘আমার আব্বা জামায়াতের নেতা ছিলেন, এটা অস্বীকার করব না। কিন্তু চরতী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি যিনি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সবসময় সভা-সমাবেশে বলেন যে, আমার আব্বা একাত্তরে উনার জীবন বাঁচিয়েছিলেন। আমি চট্টগ্রাম শহরে ইসলামিয়া কলেজে পড়ালেখা করেছি। তখন আমি ছাত্রলীগের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে সাতকানিয়া উপজেলা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার আব্বা জামায়াত করতে পারেন, কিন্তু আমি তো আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।’- বলেন রুহুল্লাহ চৌধুরী

জানতে চাইলে ‍কুতুব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সাতকানিয়ায় তাঁতী লীগের বৈধ কমিটি আছে। সেখানে একবার রুহুল্লাহ চৌধুরী পদ পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমাদের প্রতিবাদের মুখে তার চেষ্টা সফল হয়নি। তখন তিনি নিজেই নিজেকে সাধারণ সম্পাদক বলে প্রচার করতে থাকেন। কিন্তু হালে পানি না পেয়ে সেই প্রচারও একসময় বন্ধ করেন।’

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘চরতী ইউনিয়নে যাকে প্রার্থী করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। তিনি আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শে বিশ্বাস করেন কি না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমরা বিষয়টি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে জানিয়েছি। অনুরোধ করেছি, বিষয়টি যেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। আশা করি, কেন্দ্র থেকে এই মনোনয়ন পরিবর্তন করা হবে।’

মুমিনুল হক চৌধুরী ২০১৯ সালের ২১ জুন মারা যান। পরদিন তার জানাজার আয়োজন করা হয় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের মাঠে (প্যারেড গ্রাউন্ড)। সেই জানাজায় বিপুল সংখ্যক জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীর সমাগম হয়। তাদের প্রতিরোধে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্যারেড গ্রাউন্ডের আশপাশে জড়ো হন। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

পাশাপাশি, সাতকানিয়া উপজেলার নলুয়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে লেয়াকত আলী নামে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ ওই মনোনয়ন নিয়েও আপত্তি জানিয়ে দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের কাছে চিঠি দিয়েছে। এতে লেয়াকতের বিরুদ্ধে জামায়াতকে পৃষ্ঠপোষকতা, শিবিরকে মদদ এবং দুর্নীতি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়।

সারাবাংলা/আরডি/একেএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন