বিজ্ঞাপন

এবার গ্রাহকের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও লাকসুরা!

January 10, 2022 | 1:01 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউ কম, সিরাজগঞ্জ শপ, আলেশা মার্টসহ বিভিন্ন প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠানের পর এবার গ্রাহকের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে আরেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান লাকসুরা এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটি ধামাকা অফার দিয়ে পণ্য বিক্রির পর এখন আর ডেলিভারি দিচ্ছে না। বরং অফিস বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে নানা টালবাহানা শুরু করেছে।

বিজ্ঞাপন

গ্রাহকদের অভিযোগ, টাকা পরিশোধের পর বেশ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে না। আবার পণ্যর বিপরীতে দীর্ঘদিন পর চেক দেওয়া হলেও সেই চেকে টাকা তোলা যাচ্ছে না। গ্রাহকরা অনেকদিন ঘুরে শেষ পর্যন্ত অফিসে গিয়েও কাউকে পায়নি। এক পর্যায়ে লাকসুরা কর্তৃপক্ষ অফিস বন্ধ করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন
এবার গ্রাহকের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও লাকসুরা!
বাজারের চেয়ে কম দামে মোটরসাইকেল বিক্রির অফার দিয়ে লাকসুরা আত্মসাৎ করেছে কোটি কোটি টাকা

গ্রাহকরা জানায়, মাঝে মধ্যে লাকসুরার প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন ফেসবুক লাইভে এসে টাকা পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের কাছে সময় চান। আবার অনেক দিন এমন হয়েছে যে, লাইভে আসতে চেয়েও আসেননি। তবে সবশেষ গত ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানির ফেসবুক পেজে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন লাকসুরার চেয়ারম্যান জাকির হোসেন।

বিজ্ঞাপন

লাকসুরার চেয়ারম্যানের ফেসবুক বার্তাটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

‘আমি মো. জাকির হোসেন গত কিছুদিন যাবত শারীরিক ও মানসিক প্রবলেমে ভুগছি এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে আছি। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আজ রিপোর্ট দেখে বললেন, অন্তত মাসাধিককাল বেড রেস্ট থাকার প্রয়োজন। অসুস্থতাজনিত কারণে হাসপাতালে থেকেও আমি লাকসুরার সকল গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ রাখছি। ভবিষ্যতেও যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। আপনাদের নিকট লাকসুরা এন্টারপ্রাইজের যে চেক আছে সেই চেক গুলো info@laksura.com ই-মেইলে পাঠাবেন। ইমেইল থেকে প্রাপ্ত চেকগুলো যাচাই-বাছাই করে আমরা আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে পণ্যের টাকা পরিশোধ করে দেব। ই-কমার্সের এই ক্রান্তিকালে লাকসুরা এন্টারপ্রাইজ সবসময় আপনাদের পাশে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশাআল্লাহ। একমাত্র আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা পেলেই আমরা আপনাদের সকল পাওনা পরিশোধ করে দিতে পারব বলে আশা রাখি। লাকসুরা এন্টারপ্রাইজকে একটু সময় দিন, আমরা অবশ্যই শতভাগ ডেলিভারি প্রদান করব। আমার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করবেন, যাতে অতি দ্রুত সুস্থ হয়ে আপনাদের মাঝে ফেরত আসতে পারি। লাকসুরা এন্টারপ্রাইজ এর সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।’

বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে লাইভে আসার কথা থাকলেও বাহানা শুরু করেছেন জাকির হোসেন। সর্বশেষ ৯ জানুয়ারি রাতে লাইভে আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে তিনি লাইভ এড়িয়ে গেছেন।

বিজ্ঞাপন
এবার গ্রাহকের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও লাকসুরা!
কয়েকজন গ্রাহককে মোটরসাইকেল দেওয়া হলেও বঞ্চিত হয়েছেন অধিকাংশরা

লাকসুরার চেয়ারম্যান জাকির হোসেন নিজেকে বেড রেস্টে রাখার কথা জানালেও কোম্পানির ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মকর্তা এস এম সাথী মোবাইল ফোনে সারাবাংলাকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান স্যার এই মুহূর্তে দেশের বাইরে আছেন। কোন দেশে আছেন তা বলা যাবে না। চেয়ারম্যানের কনসার্ন ছাড়া আমরা কোনো তথ্য আপনাকে দিতে পারব না। ফেসবুক লাইভে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।’

দুই মাস ধরে কোম্পানির অফিস বন্ধ রয়েছে কেন? জানতে চাইলে সাথী বলেন, ‘আমরা অফিস বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ কাজের সময় কাস্টমাররা এসে ডিস্টার্ব করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অফিস বন্ধ থাকলেও আমরা মোবাইল ফোনে কাস্টমারদের সঙ্গে কথা বলছি। আমাদের টাকা গেটওয়েতে আটকা পড়েছে, তাই দিতে পারছি না।’

রাজধানীর রামপুরা এলাকার এস এম সালমান নামে এক গ্রাহক গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি মোটরসাইকেল (পালসার এনএস ১৬০ এবিএস) অর্ডার করেন। দুই লাখ টাকার মোটরসাইকেল ধামাকা অফারে তিনি এক লাখ ৪১ হাজার ৭০০ টাকায় অর্ডার করেন। সেই অনুযায়ী তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর এক লাখ ৪২ হাজার টাকা ৩১, ডেল জননী, বনানী মডেল টাউনের অফিসে গিয়ে দিয়ে আসেন। তার পণ্যটি ৪৫ দিনের মধ্যে ডেলিভারির কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তিনি মোটরসাইকেলটি পাননি।

গ্রাহক সালমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘৪৫ দিন পার হওয়ার পর পণ্য না পেয়ে তাদের অফিসে গেলে টালবাহনা শুরু করে। পণ্য না পেয়ে টাকা দাবি করলেও তারা সেটা আমলে নিতে জায়নি। এক পর্যায়ে ৬০ দিনের মাথায় এক লাখ ৯৬ হাজার টাকার ব্রাক ব্যাংকের একটি চেক দেয় আমাকে। যেটি দিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে টাকা উত্তোলনের কথা বলা হয়। কিন্তু ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার ব্যাংকে গিয়ে চেক জমা দিলেও ওই হিসাব থেকে কোনো টাকা পাওয়া যায়নি।’

এবার গ্রাহকের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও লাকসুরা!
ছবিতে লাকসুরা এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন

সালমান বলেন, ‘ধামাকা অফার, ঝড়ো অফার দিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। হাজার হাজার গ্রাহকের এসব টাকা নিয়ে এখন চেয়ারম্যান বিদেশে পালিয়ে আছেন। কারও টাকা দিচ্ছেন না। চেক দিয়েও প্রতারণায় মেতেছেন লাকসুরা এন্টারপ্রাইজ। প্রায় দিনই লাইভে এসে গ্রাহকদের অপেক্ষা করার জন্য নানাভাবে আবেগ-আপ্লুত করছেন। অথচ কর্তৃপক্ষ অফিস বন্ধ করে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে আছেন।’

মো. জিয়া উদ্দিন নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘মানুষের টাকা নিয়ে জায়গা জমিতে ইনভেস্ট করছে। এখন টাকা দিতে পারছে না। দেশের বাইরে থেকে লাইভ করে সময় না চেয়ে টাকাটা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ জাকির হোসেন নামে একজন লিখেছেন, মূল টাকা ফেরত দিয়ে দিন। লাইভ চাই না।

এদিকে, লাকসুরার সঙ্গে জড়িত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে বলেন, ‘লাকসুরা মোট তিনটি অফার দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম অফারের পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অফারের ৮০ ভাগ পণ্য ডেলিভারি বাকি রয়েছে। আর তৃতীয় অফারের কোনো পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয়নি। দুই অফার থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে কোম্পানির কয়েকজন ব্যক্তি। এর মধ্যে চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের নেতৃত্বে তার আত্মীয়-স্বজনরা বিদেশে রয়েছেন।’

এবার গ্রাহকের ৩০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও লাকসুরা!
প্রতারণার কাজে লাকসুরার চেয়ারম্যান ব্যবহার করেছেন তার টিম

তিনি আরও বলেন, ‘এখন তারা সময় ক্ষেপণ করছেন। সময়ক্ষেপণের কারণ হচ্ছে— গ্রাহকদের চেকে যে তারিখ দেওয়া হয়েছে তার মেয়াদ শেষ হওয়া। মেয়াদ শেষ হলেই আর কেউ ডিজঅনার করতে পারবেন না। তখন তাদের কাউকে ধরারও বুদ্ধি থাকবে না। এই সুযোগে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরাও সহজে পার পেয়ে গেলেন।’

লাকসুরার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমার রিলেশন বিভাগের কর্মকর্তা নিজেকে আলম নাম দিয়ে বলেন, ‘আমার সিইও স্যার ২৯ ডিসেম্বর থাইল্যান্ডে গেছেন। তিনি এই মাসের ২০ তারিখের মধ্যে দেশে ফিরবেন।’

চেয়ারম্যান বিদেশে চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

লাকসুরার কাস্টমার রিলেশন বিভাগের ম্যানেজার আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্যার দেশের বাইরে আছেন। আমাদের কাছে আর কোনো তথ্য নেই।’

গ্রাহকদের পণ্য কিংবা টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে আতিকুল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই। সিইও স্যার ভালো বলতে পারেন।’ আর কিছু জানতে হলে অফিসে যাওয়ার জন্য বলেন আতিকুল।

অফিস তো বন্ধ উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘অফিস বন্ধ রয়েছে। ফোন দিয়ে অফিসে আসতে হবে।’

ডেলিভারি ইউনিটের হেড রাহাত বলেন, ‘কত গ্রাহকের ডেলিভারি পেন্ডিং রয়েছে, আমরা ওইভাবে হিসাব করিনি। খুব শিগগিরই আমরা অডিট করব, অডিট করার পর বলতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন এখন ই-কমার্সের ক্রান্তিকাল চলছে। এই কারণে আমরা গ্রাহকদের অর্ডারগুলো দিতে পারছি না। আমরা শিগগিরইে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব।’

লাকসুরার প্রতারণার বিষয়ে জানতে চেয়ে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) মিডিয়া শাখার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একে আজাদকে ফোন করা হলেও তিনি কিছু বলতে পারেননি। তবে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন