বিজ্ঞাপন

যাত্রীর অপেক্ষায় গাড়ি, ভেতরে ছিনতাইকারী

January 13, 2022 | 2:25 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেট

চট্টগ্রাম ব্যুরো : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে মাইক্রোবাস। ভেতরে বসা থাকে আরও কয়েকজন। গন্তব্যে পৌঁছাতে সাধারণ কেউ আরোহী হলেই বিপত্তি। ভেতরে বসা যাত্রীদের স্বরূপ বেরিয়ে পড়ে। আসলে তারা পেশাদার ছিনতাইকারী।

বিজ্ঞাপন

তারা কেড়ে নেয় টাকা-মোবাইল, ব্যাংকের কার্ড। বিকাশ নম্বর থাকলে ট্রান্সফার করে নেয় টাকা। শুধু সম্পদ নয়, অনেকসময় কেড়ে নেয় প্রাণও।

এমন ছয় 'ছিনতাইকারী' বুধবার (১২ জানুয়ারি) রাতে গ্রেফতার হয়েছে নগর গোয়েন্দা পুলিশের বন্দর ও পশ্চিম এবং আকবর শাহ থানার যৌথ অভিযানে। নগরীর অলঙ্কার মোড় থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (বন্দর) নোবেল চাকমা সারাবাংলাকে জানান, চট্টগ্রাম নগরী থেকে মীরসরাইয়ে যাবার পথে সম্প্রতি এক ব্যক্তি এই চক্রের কবলে পড়ে প্রাণ হারান। ওই মামলার ছায়া তদন্তে নেমে চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গ্রেফতার ছয়জন হলেন- শাহ আলম আকন (৩২), আবুল কালাম (৪৭), জাকির হোসেন সাঈদ (৩৬), মো. আল আমিন (২৯), মিজানুর রহমান (৫৩) এবং নাহিদুল ইসলাম ওরফে হারুন (৩১)।

বিজ্ঞাপন

নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার একেএম মহিউদ্দিন সেলিম সারাবাংলাকে জানান, চক্রে ১০ থেকে ১২ জন সদস্য আছে। বাড়ি বরিশাল, বরগুনা ও ঢাকার কেরাণীগঞ্জে। তারা ছিনতাই-ডাকাতির উদ্দেশে ঢাকায় এসে মিলিত হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাইক্রোবাস নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। যাত্রী তুলে জিম্মি করে ছিনতাই করে।

এক বছরে এই চক্রটি অন্তঃত ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রীকে গাড়িতে তুলে জিম্মি করে বিকাশ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানান নোবেল চাকমা। তিনি বলেন, ‘জিম্মি করে বিকাশ নম্বরে টাকা জমা থাকলে সেগুলো স্থানান্তর করে নিজেরা তুলে নেয়। পিন নম্বর নিয়ে নেয়। অনেকসময় ভিকটিমের মাধ্যমে তার স্বজনের কাছ থেকে বিকাশে টাকা এনে আগের সিম ও অ্যাকাউন্ট-পিন নম্বর ব্যবহার করে টাকাগুলো তুলে নেয়।’

বিজ্ঞাপন

যেভাবে মেলে চক্রের সন্ধান

গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর অলঙ্কার মোড় থেকে দুবাই প্রবাসী হোসেন মাস্টার মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জে বাড়িতে যাবার জন্য মাইক্রোবাসে ওঠেন। দুবাইয়ে ফিরে যাবার জন্য বিমানের টিকেট কিনতে চট্টগ্রাম নগরীতে এসেছিলেন তিনি। গাড়িতে ওঠার পর চলন্ত অবস্থায় চক্রের সদস্যরা তাকে জিম্মি করে ১০ হাজার টাকা ও মোবাইল ছিনতাই করে নেয়। এরপর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বেতারিয়া এলাকায় আহত অবস্থায় ফেলে দেয়। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হোসেন মাস্টার মারা যান। এ ঘটনায় পাহাড়তলী থানায় মামলা হয়।

বিজ্ঞাপন

অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (ডিবি-বন্দর) নোবেল চাকমা সারাবাংলাকে জানান, টাকা-মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার পর চক্রের সদস্যরা দেখেন, তার বিকাশ নম্বর আছে। তাকে জিম্মি করে বিকাশ নম্বরে টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। হোসেন মাস্টার এক লাখ টাকা এনে দেওয়ার আশ্বাস দেন নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে। কিন্তু টাকা এনে না দেওয়ায় তাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে তিনি মারা যান।

যাত্রীর অপেক্ষায় গাড়ি, ভেতরে ছিনতাইকারী

গ্রেফতার ছয়জনের মধ্যে চারজন এই ঘটনায় জড়িত ছিল উল্লেখ করে আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহির হোসেন সারাবাংলাকে জানান, গ্রেফতার হওয়া শাহ আলম, আবুল কালাম, জাকির ও আল আমিন মাইক্রোবাসে ছিলেন। গাড়ি চালাচ্ছিল শাহ আলম। চট্টগ্রাম শহরে ছিনতাই শেষে সেদিন চক্রের সদস্যরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। সর্বশেষ টার্গেট হিসেবে হোসেন মাস্টারকে গাড়িতে তুলেছিল। তাকে মারধর করে যাবার পথে কুমিল্লায় ফেলে দিয়ে যায়।

ছায়া তদন্তে নেমে ডিবি একই প্রক্রিয়ায় ছিনতাইয়ের শিকার একজনের বিকাশ নম্বর থেকে টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে এমন একটি মোবাইল নম্বরের সন্ধান পায় ডিবি। সেই নম্বরটি ছিল চক্রের একজন সদস্যের। ওই নম্বর দিয়ে চক্রটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে মাইক্রোবাস শনাক্ত করা হয়। সর্বশেষ ছিনতাইয়ে জড়িত চারজনকে চিহ্নিত করে তাদের নজরদারির আওতায় আনা হয়।

এরপর বুধবার (১২ জানুয়ারি) একই চক্র আবারও মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ এলাকা থেকে বিদেশগামী একজনকে গাড়িতে তুলে পাসপোর্ট ও নগদ টাকা ছিনতাই করে। এরপর অলঙ্কার মোড়ে এসে অপেক্ষা করছিল আরেকজন যাত্রী তুলে ছিনতাইয়ের জন্য। পুলিশ অভিযান চালিয়ে মাইক্রোবাস আটক করে সেখানে ছয়জনকে পায়।

ওসি জহির বলেন, ‘আমরা তাদের ব্যবহৃত দু’টি মাইক্রোবাসে সন্ধান পেয়েছি। একটি গ্রেফতার জাকিরের শ্বশুরের। আরেকটি বরিশাল থেকে ভাড়া করা। ১৯ ডিসেম্বরের ঘটনা তারা করেছিল বরিশাল থেকে ভাড়া করা মাইক্রোবাস দিয়ে। সর্বশেষ ঘটিয়েছে জাকিরের শ্বশুরের গাড়ি দিয়ে। গ্রেফতার আবুল কালাম, চান মিয়া, শাহআলম ও জাকির চারজনই গাড়ি চালক। আল আমিন ও হারুন মোটর সাইকেল চালাতে পারে।’

গ্রেফতার আবুল কালাম সাত বছর আগে চট্টগ্রামে বোমা মেরে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির পর আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নগরীর কোতোয়ালী থানার জিপিওর সামনে গিণি গোল্ড জুয়েলার্সে এই ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কালামের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি মামলা আছে। শাহআলমের বিরুদ্ধে ১১টি, জাকিরের বিরুদ্ধে ৫টি, হারুনের বিরুদ্ধে তিনটি, আল আমিনের বিরুদ্ধে ২টি এবং মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ৭টি মামলা আছে।

এই চক্রের সদস্যরা মহাসড়কে বিশেষ কায়দায় ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ডিবি-পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি-ছিনতাইও করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অস্ত্র হাতুড়ি-গামছা

গ্রেফতার হওয়া ছিনতাইকারীদের মাইক্রোবাস তল্লাশি করে হাতুড়ি, গামছা, স্ক্রু ড্রাইভার, প্লাস, ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত ছিনতাইয়ে তারা এসবকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিন সেলিম।

‘এই চক্রের সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। তারা গাড়িতে তোলা ব্যক্তির কাছ থেকে প্রথমে আপসের মাধ্যমে টাকা-মোবাইল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। ওই ব্যক্তি রাজি না হলে হাতুড়ি দিয়ে পেটায়। স্ক্রু ড্রাইভার-প্লাস দিয়ে জখম করে। একদম কাজ না হলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দেয়।’- বলেন মহিউদ্দিন সেলিম

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাকির, আবুল কালাম ও শাহআলম চক্রের দলনেতা। তাদের নেতৃত্বে আরও ছয় থেকে আটজন আছে। আবুল কালামের বেশভূষায় ধর্মপ্রাণ বলে মনে হয়। সেজন্য সে মাইক্রোবাসে চালকের পাশে বসে সবসময় যাতে কেউ সন্দেহ না করে। জাকের কোরআনে হাফেজ। তার কাজ হচ্ছে, মাইক্রোবাসে তোলা ব্যক্তির সঙ্গে প্রথমে সুন্দর আচরণ, না হলে ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত করে টাকা-মোবাইল স্বেচ্ছায় নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা নোবেল চাকমা সারাবাংলাকে জানান, নিজ নিজ বাড়ি থেকে এসে প্রথমে ঢাকার দিকে ছিনতাই করে। তারপর চট্টগ্রামে আসে। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারের চৈতন্যগলিতে একটি হোটেলে থাকে। প্রতিদিন সকাল ৮টায় বের হয়, রাত ১০টা পর্যন্ত মহাসড়কে ঘুরে ঘুরে ছিনতাই করে। একদিন কিংবা সর্বোচ্চ দুইদিন ছিনতাই করে বাড়িতে ফেরত যায়। এভাবে প্রতিমাসে ১০ থেকে ১২দিন তারা ছিনতাই করে। তবে ছিনতাইয়ের টাকার ভাগ সবাই সমান পায় না। তিন দলনেতার বাইরে অন্যরা ২-৩ হাজার টাকা করে পায় প্রতিটি ছিনতাইয়ের পর। ছিনতাই করা মোবাইলগুলো নিজেদের মধ্যেই নিলামে তুলে বিক্রি করে।

যাত্রীর অপেক্ষায় গাড়ি, ভেতরে ছিনতাইকারী

যে কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত চার মাসে অন্তঃত নয়জনকে মাইক্রোবাসে তুলে ছিনতাইয়ের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র দু’টি। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্মকর্তা, বিএসআরএম’র সহকারি ব্যবস্থাপক, ইমপেরিয়াল হাসপাতালের কর্মকর্তা, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারিসহ কয়েকজন আছেন।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার (বন্দর) একেএম মহিউদ্দিন সেলিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেই মূলত তারা ছিনতাই করে। আবার মহাসড়কের মধ্যে শহরের এ কে খান মোড় থেকে ফেনীর মহীপাল পর্যন্ত এলাকাতেই তারা ছিনতাই করে। এই মহাসড়ক চার লেইনের, ফলে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো যায় এবং নিরিবিলি, তাই অপরাধ সংঘটনে সুবিধা হয়। ঢাকা-সিলেট সড়ক একলেইনের। ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে বেশি যানজট হয়। এই দুই সড়ক ছিনতাই-ডাকাতির জন্য সুবিধাজনক নয়।’

সারাবাংলা/আরডি/একেএম

বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন