বিজ্ঞাপন

দেশে ওমিক্রনের গুপ্ত রূপে আক্রান্ত ৩ জনের খোঁজ নেই

January 14, 2022 | 11:19 pm

সৈকত ভৌমিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর কিছুদিন পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের মিউটেশনে নাকাল বিশ্ব। আলফা, বিটা, ডেল্টা হয়ে সবশেষ বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। তবে এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর, এই ওমিক্রন ভাইরাসেরই ‘গুপ্ত’ একটি সংস্করণ সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশেও ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই উদ্বেগের কমতি নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। কেননা, বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীদের কপালে ভাঁজ ফেলা ওমিক্রনের সেই ‘গুপ্ত’ সংস্করণ যে শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশেও!

ওমিক্রনের ‘গুপ্ত রূপ’ কী?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের লিনেজ মূলত বি.১.১.৫২৯ (B.1.1.529)। তবে এটি তিনটি সাব-লিনেজ বা উপরূপে বিভক্ত— বিএ.১, বিএ.২ ও বিএ.৩। এর মধ্যে বিএ.২ সাব-লিনেজকেই মূলত বলা হচ্ছে ওমিক্রনের ‘গুপ্ত’ রূপ। কেননা, ওমিক্রনের মূল সংস্করণ বিএ.১-এর এস-জিন নামক যে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তা বিএ.২ সাব-লিনেজে নেই। ফলে এটি কেবল জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমেই শনাক্ত করা সম্ভব। আর স্পাইক প্রোটিনে ৬৯ নম্বরে অ্যামিনো অ্যাসিড ডিলেশন না থাকায় এটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ভারতের কলকাতায় সাম্প্রতিক সময়ের প্রায় ৮০ শতাংশ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের এই সাব-লিনেজটি শনাক্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন- উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ওমিক্রনের ‘গুপ্ত সংস্করণ’

বিজ্ঞাপন

দেশে ৩ নমুনায় বিএ.২ সাব-লিনেজ

বাংলাদেশ থেকে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের তথ্য বলছে, এর আগে দেশে ওমিক্রনের বিএ.১ লিনেজের দেখা মিললেও গত ১২ জানুয়ারি জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ফলে বিএ.২ সাব-লিনেজের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ জিআইএসএইড-এর তথ্য বলছে, যশোরে দু’জন ভারতীয় ও কুষ্টিয়ার একজন বাংলাদেশি নাগরিকের কোভিড-১৯ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে ওমিক্রনের এই রূপ পাওয়া গেছে। তবে ওমিক্রনের বিএ.২ সাব-লিনেজ যে তিন জনের নমুনায় পাওয়া গেছে, তাদের অবস্থান বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো ধারণাই নেই। প্রশাসন বলছে, তাদের খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জিনোম সেন্টার থেকে তিন জনের নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে ওমিক্রনের বিএ.২ উপরূপ শনাক্তের তথ্য প্রকাশ করা হয় জিআইএসএইডে। যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও জিনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ সারাবাংলাকে ওমিক্রনের এই নতুন রূপ শনাক্তের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ড. ইকবাল বলেন, যবিপ্রবি’র জিনোম সেন্টারে আমরা সিকোয়েন্সিং করে থাকি। এখানেই তিনটি নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে বিএ.২ লিনেজের উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত হই। এই তথ্য এরই মধ্যে জিআইএসএইডে জমা দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জিআইএসএইডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২ জানুয়ারি যশোর থেকে ৪১ বছর বয়সী এক নারীর কোভিড-১৯ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে সংগ্রহ করা নমুনায় ওমিক্রনের বিএ.২ উপ-রূপ শনাক্ত হয়। এরপর ৫ জানুয়ারি ৩০ বছর বয়সী এক তরুণ এবং এর আগে ৩০ ডিসেম্বর ২৫ বছর বয়সী এক তরুণের কোভিড-১৯ নমুনায় বিএ.২ উপ-রূপটি শনাক্ত হয়।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

ভারতের কলকাতায় সাম্প্রতিক সময়ের সিকোয়েন্সিংয়ে ওমিক্রনের বিএ.২ ধরনটি অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে। জিআইএসএইডের তথ্য বলছে, কলকাতার ৮০ শতাংশ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়েই মিলেছে এর উপস্থিতি।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল বায়োলজির ইম্যুনোলজিস্ট দীপায়ন গাঙ্গুলি বলেন, ওমিক্রনের বিএ.২ ধরনটি স্থানীয়ভাবে গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণের কারণ হতে পারে। এই সাব-লিনেজটি এর অন্যান্য ধরনের তুলনায় আলাদা হলেও জেনেটিক্যালি এটি একই পরিবারভুক্ত। ফলে এর সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট অসুস্থতার সঙ্গে ওমিক্রনের অন্য ধরনগুলোর সৃষ্ট অসুস্থতার তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এটি বর্তমানে কোলকাতার যেসব নমুনা সিকোয়েন্সিং করা হচ্ছে তাতে বেশি মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে।

ওমিক্রনের বিএ.২ শনাক্ত হওয়া ৩ জন কোথায়?

যশোর সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোরে নমুনা পরীক্ষা করানো দু’জন ভারতীয় নাগরিক। তাদের নমুনায় কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর তাদের সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের জন্য তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যোগাযোগ করলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি।

তৃতীয় নমুনাটি সংগ্রহ করা হয় কুষ্টিয়ার একজন অধিবাসীর কাছ থেকে। তার বিদেশ ভ্রমণের কোনো ইতিহাস না থাকলেও কোভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার পরে তার নমুনা সিকোয়েন্সিং করা হয়। তার মধ্যে কোনো উপসর্গ না থাকায় হাসপাতালে ভর্তিরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি কোথায় আছেন— এ বিষয়ে পাওয়া গেছে দুই ধরনের তথ্য।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র বলছে, কুষ্টিয়ার এই তরুণের নমুনা সংগ্রহের সময় দেওয়া তথ্য যাচাই করে ওই ঠিকানায় কাউকে পাওয়া যায়নি।

তবে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান সারাবাংলাকে বলেন, কুষ্টিয়ার তরুণের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। যখন তার কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয় তখন তার তেমন কোনো উপসর্গ ছিল না। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন।

কলকাতার দুই নাগরিকের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ আমাদের এই সিকোয়েন্সিংয়ের ফলাফল জানানোর আরও অনেক আগে মূলত ওই তিন জন আক্রান্ত হন। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের ফলাফল জানানোর আগেই সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন।

স্বাস্থ্যবিধিতে জোর প্রশাসনের

যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমাদের স্থল ও বিমানবন্দরে স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করেছি। যশোর বিমানবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধির বাইরে যেন কেউ ঘুরাঘুরি করতে না পারে, সেজন্য মনিটরিং করা হচ্ছে। বিমানবন্দরেও যেন মানুষ অহেতুক ঘোরাফেরা করতে না পারে, সেদিকেও নজরদারি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জেলার আটটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন হাট-বাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আমরা সব কর্তৃপক্ষকে নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।

জানতে চাইলে যশোর জেলার সিভিল সার্জন কর্মকর্তা ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, গত কিছুদিন যশোরে কোভিড-১৯ সংক্রমণ বেড়েছে। যে তিন জনের নমুনায় ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে, তাদের নমুনা জমা দেওয়ার সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তবু আমরা কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।

দেশে ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে কি না এবং যশোরে শনাক্ত হওয়া ওমিক্রনের নতুন এই রূপ কতটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে— এসব বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ গবেষণা কেন্দ্রের (আইইডিসিআর) দায়িত্বশীল কারও মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিনের মোবাইল নম্বরে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি, এসএমএস পাঠিয়েও উত্তর পাওয়া যায়নি।

২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট তাণ্ডব চালালেও শেষভাগে এসে আতঙ্ক ছড়ায় ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বলে ঘোষণা দেয়। কিছুদিন পরই ৬ ডিসেম্বর সংগ্রহ করা এক নমুনায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় এই ভ্যারিয়েন্ট। পরবর্তী সময়ে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ৩০টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়। তবে এর সবগুলোই ছিল বিএ.১ লিনেজের। সবশেষ ১২ জানুয়ারি যবিপ্রবি থেকে সিকোয়েন্সিং করা তিনটি নমুনায় বিএ.২ লিনেজের উপস্থিতি পাওয়া গেল।

সারাবাংলা/এসবি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন