বিজ্ঞাপন

দেশে মিলল ‘বিরল’ সাদা জলঢোঁড়া

January 16, 2022 | 11:49 pm

রমেন দাশ গুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাপ নিয়ে অনেক আতঙ্ক ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একদল তরুণের মধ্যে, যাদের অনেকেই শিক্ষার্থী। ভয়-আতঙ্ক কাটাতে সেই সাপকেই তারা বেছে নিলেন অধ্যয়নের বিষয় হিসেবে। চিনতে শুরু করেন নির্বিষ আর বিষধর সাপের তফাৎ, তাদের বৈশিষ্ট্য— সবকিছুই। আতঙ্ক তাড়িয়ে একসময় জীবিত সাপ উদ্ধার, সংরক্ষণ ও অনুকূল পরিবেশে অবমুক্ত করার কাজ শুরু করেন। গড়ে তোলেন ‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনও। আতঙ্ক তাড়িয়ে এখন বরং সাপ তাদের কাছে ভালোবাসার এক প্রাণী। বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের ডাক পড়ে সাপ উদ্ধারের জন্য।

বিজ্ঞাপন

নভেম্বরে এরকমই ডাক পড়ল এই ‘সাপ বাহিনী’র। স্থান ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার গোপাল ইউনিয়নের মহাজন বাড়ি। জানা গেল, সেখানে রান্নাঘরে আশ্রয় নিয়েছে একটি সাপ। দ্রুত সেখানে ছুটে গেলেন টিমের সদস্য ফেনীর একটি মাদরাসার শিক্ষক ইসমাইল মিথুন। সঙ্গীদের নিয়ে সাপটি উদ্ধারওকরলেন। তবে সাপটির রঙ দেখে সন্দেহ জাগে টিমের সদস্যদের মধ্যে। নিজেদের কাছে রেখে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন তারা।

দুই মাস পর্যবেক্ষণের পর এখন এই টিমের সদস্যদের দাবি— এটি বাংলাদেশে ‘বিরল’ সাদা জলঢোঁড়া, যা দেশে প্রথমবারের মতো পাওয়া গেছে। ইংরেজিতে একে বলা হয় চেকার্ড কিলব্যাক। এই দাবির আসলে সত্যতা কতটুকু?

বিজ্ঞাপন

তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর পাবনা জেলার সদর উপজেলার আতাইকুলা ইউনিয়নের মধুপুর গ্রাম থেকে ‘ন্যাচার অ্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন কমিউনিটি’ নামে একটি সংগঠন একটি সাদা জলঢোঁড়া উদ্ধার করেছিল।

সাপ গবেষকদের মতে, পাবনায় উদ্ধার হওয়া সাদা জলঢোঁড়াটি ছিল ‘অ্যালবিনো’। এ ধরনের প্রাণী জন্মগতভাবে সাদা রঙের এবং এদের চোখের রঙ লাল হয়। অন্যদিকে ফেনীতে উদ্ধার হওয়া সাদা জলঢোঁড়াটি দুই বার খোলস বদলের পর সাদা হয়ে গেছে পুরোপুরি। এর চোখের রঙ কালো। এই বৈশিষ্ট্য লিউসিস্টিকের। সে হিসেবে বলা যায়— ফেনী থেকে উদ্ধার হওয়া সাপটি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাওয়া দ্বিতীয় সাদা জলঢোঁড়া। তবে এটি আবার লিউসিস্টিক বৈশিষ্ট্যের প্রথম সাদা জলঢোঁড়া।

বিজ্ঞাপন

দেশে মিলল ‘বিরল’ সাদা জলঢোঁড়া

দুই মাস ধরে সাপটি নিজেদের কাছে রেখে পর্যবেক্ষণ করা তরুণদের একজন আরশাদ নাফিজ অরবিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাপটি দেখে প্রথমে আমরা অ্যালবিনো মনে করেছিলাম। পর্যবেক্ষণের জন্য সেটিকে আমরা রেখে দিই। গত দুই মাসে সাপটি দুইবার খোলস পরিবর্তন করেছে। প্রতিবার খোলস পাল্টানোর পর আমরা দেখলাম, সেটির রঙ আরও হালকা হয়ে যাচ্ছে। এটা সম্পূর্ণ লিউসিস্টিকের বৈশিষ্ট্য। এ কারণে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছালাম— এটি বাংলাদেশে দৃশ্যমান হওয়া সর্বপ্রথম লিউসিস্টিক সাপ।’

বিজ্ঞাপন

সাপ উদ্ধারকারী টিমের পরিচালক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সিদ্দিকুর রহমান রাব্বি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা যারা সাপটিকে পর্যবেক্ষণ করছি, শুরুতে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল যে এটি অ্যালবিনো কি না। কিন্তু দুই বার খোলস পাল্টানোর পর দেখি যে এটি তার জন্মগত রঙ হারিয়ে ফেলেছে। সাপটির পরিবর্তন ও লিউসিস্টিকের বৈশিষ্ট্য আমরা নিবিড়ভাবে মিলিয়ে নিশ্চিত হই, এটি লিউসিস্টিক সাপ।’

দিন কয়েক আগে সেই জলঢোঁড়া সাপটি নিয়ে তরুণরা গিয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাহাড়ে। আইইআর বিভাগের সামনে মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে সাপটি ছেড়ে দিয়ে তারা এর বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা গেল, সাপটি প্রায় দুধসাদা রঙের। চটপটে, রাগী প্রকৃতির। রঙ ছাড়া বাকি সবই স্বাভাবিক সাপের মতোই। খবর পেয়ে সেখানে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

বিজ্ঞাপন

সাপ গবেষক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটি ডেফিনিটলি আমাদের জন্য নতুন ও ইন্টারেস্টিং একটি বিষয়। এটি নির্বিষ জলঢোঁড়া সাপ এবং বাংলাদেশে পুকুরে কিংবা বিভিন্ন স্বাদু পানির জলাশয়ে সবসময় পাওয়া যায়— এটি ঠিক আছে। তবে সাদা জলঢোঁড়া বাংলাদেশে খুব বেশি দেখা যায়নি। আমরা বিষহীন সাদা দাঁড়াশ, বিষধর সাদা শঙ্খিনী কিংবা কোবরার কথা শুনেছি। কিন্তু জলঢোঁড়ার কথা অতীতে তেমন শুনিনি। আবার এটি জন্মগতভাবে সাদা ছিল না, অর্থাৎ অ্যালবিনো নয়। খোলস বদলানোর পর ধীরে ধীরে রঙ সাদা হয়েছে, যেটাকে আমরা লিউসিস্টিক বলি। অ্যালবিনো কিংবা লিউসিস্টিক— এগুলো একদম ন্যাচারালি হয়। হাজার-লাখো সাপের মধ্যে একটি হয়। এর কোনোটিই বাংলাদেশে হয়তো একেবারে বিরল নয়, আবার সেভাবে দৃশ্যমানও নয়।’

দেশে মিলল ‘বিরল’ সাদা জলঢোঁড়া

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর চিকিৎসক শাহাদাত হোসেন শুভ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাপের সাদা রঙ দুই কারণে হতে পারে— অ্যালবিনো অর্থাৎ জন্মগত, অথবা লিউসিস্টিক অর্থাৎ জিনগত সমস্যার কারণে। মানুষের যেমন শ্বেতী রোগ হয়। এটি জন্মের সময় থাকে না, তার বেড়ে উঠার একপর্যায়ে দৃশ্যমান হয়। সাপের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ডোমিন্যান্ট ও রিসিসিভ— এই দুই জিনের মিশ্রণ থেকে সাপের রঙটা মূলত আসে। রিসিসিভ জিনের বৈশিষ্ট্য প্রকট হলে সাপের রঙের মধ্যে তার প্রকাশ পাবে। অর্থাৎ সাপটি হয়তো জন্মগত সাদা হবে অথবা জন্মের পর ফ্যাকাশে হতে হতে সাদা হয়ে যাবে। বাংলাদেশ শুধু নয়, সারাবিশ্বেই অ্যালবিনো কিংবা লিউসিস্টিক— সাপের ক্ষেত্রে উভয়ই বিরল।’

সাপটির উদ্ধারকারী ইসমাইল মিথুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাপটি যখন উদ্ধার করি, তখন এর রঙে খুব একটা পরিবর্তন ছিল না। সামান্য ফ্যাকাশে বলে আমার মনে হওয়ায় সেটি আমি ফেনী থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসি। এখন টিমের তত্ত্বাবধানে রেখে সেটিকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমরা খাবার হিসেবে সেটিকে ছোট মাছ দিচ্ছি। পরিপূর্ণ যত্নের মধ্যে আমরা সাপটিকে রেখেছি।’

তবে সাদা রঙের কারণে এ ধরনের সাপ সহজে চোখে পড়ায় দ্রুত সাপখেকো পাখির শিকারে পরিণত হয় অথবা আঘাতজনিত মৃত্যুর শিকার হয় বলে জানিয়েছেন ‘সাপ বাহিনী’র তরুণরা। সিদ্দিকুর রহমান রাব্বি জানিয়েছেন, সাপটি আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণের পর অবমুক্ত করা হবে। যেখানে সাপটি নিরাপদ বেঁচে থাকার মতো উপযুক্ত পরিবেশ পাবে, সেখানেই অবমুক্ত করা হবে।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ গত এক বছরে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৫০০ সাপ উদ্ধার করে বন বিভাগের সহায়তায় নিরাপদ পরিবেশে অবমুক্ত করেছে।

টিমের সদস্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ল্যাব সহকারী ফরহাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাপকে জীবিত ও সুস্থভাবে উদ্ধার, সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত পরিবেশে অবমুক্ত করা তাদের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া সাপ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, কেউ সাপের দংশনের শিকার হলে হাসপাতালে পাঠানোসহ সাপের কামড়ে ‍মৃত্যুহার কমিয়ে আনা নিয়েও তারা কাজ করেন। একইসঙ্গে সাপের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিও তাদের লক্ষ্য।

ছবি: হাবিবুর রব, আলোকচিত্রী

সারাবাংলা/আরডি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন