বিজ্ঞাপন

গৃহকর্ত্রীর নির্মম অত্যাচারে কেবল হাড্ডিসার দেহই রয়েছে ফারজানার

January 20, 2022 | 5:22 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ‘এই দেখেন হাতের অবস্থা। কত শত দাগ নেবেন। কান ছিঁড়ে গেছে। হাতের কনুই আলাদা। পা থেকে উরু পর্যন্ত কয়েকশ কাটা দাগ। সেই দাগ দিয়ে কোনো কোনো সময় ফেটে রক্ত বের হয়।’— শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ২ নম্বর ব্লকের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৬৪ নম্বর বেডে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন ফারজানা (১৩)।

বিজ্ঞাপন

ফারজানা গৃহকর্মী। রাজধানীর কলাবাগান থানার হাতিরপুল এলাকায় শেখ ইউসুফ আলীর বাসায় কাজ করতো সে। সেই বাসাতেই দীর্ঘ দিন ধরে মধ্যযুগীয় কায়দা নির্যাতন হয়েছে তার ওপর। নির্যাতনের এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে গত বুধবার (১৯ জানুয়ারি) তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় বাবা বেলাল হোসেন কলাবাগান থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে নির্যাতনকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ডিএমপির নিউমার্কেট-কলাবাগান জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ফারজানাকে যেভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে, তা এর আগে কখনও দেখিনি। ফারজানার বাবা থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বাদী কোনো আইডি কার্ড দেখাতে পারেনি বলে মামলা রেকর্ড হতে দেরি হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২০ জানুয়ারি) বিকেল তিনটার দিকে এসি শরীফ বলেন, ‘মামলা নেওয়া হচ্ছে। এরপর জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হবে। আমরা তাদের নজরদারিতে রাখছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশ প্রভাবিত হবে না। উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মামলাটা হতে দেন। এরপর দেখতে পারবেন।’

গৃহকর্ত্রীর নির্মম অত্যাচারে কেবল হাড্ডিসার দেহই রয়েছে ফারজানার

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, হাতিরপুল এলাকায় অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে বাস করে শেখ ইউসুফ আলী। তার স্ত্রী ও তার মেয়ে ওই বাসায় থাকেন। সুমিকে প্রায় দুই বছর ধরে নির্যাতন করে আসছে ইউসুফ আলীর পরিবার। ফারজানা সামান্য ভুল করলেও বিভিন্ন উপায়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করত ইউসুফের মেয়ে ও স্ত্রী। হাসপাতালের বেডে শুয়ে ফারজানা জানায়, গত ১৪ জানুয়ারি একটা গ্লাস আনতে বলেছিল। কিন্তু সেটি আনতে দেরি হওয়ায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এক পর্যায়ে পা দিয়ে তার পেটে সজোরে ৫/৬টি লাথি মারে। পেটে লাথি খেয়ে সেদিনই অসুস্থ হয়ে পড়ে ফারজানা। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ফারজানা জানায়, বাসার লোকজন খাবার খেয়ে যা প্লেটে থাকত তাই খেতে দিত। কথা বললেই মারতো। অনেক সময় গন্ধ খাবার খেতে দিত। মাছ বা মাংস কিছুই দিত না। মাসে হঠাৎ একদিন অর্ধেক ডিম দিত। পোড়া ভাত খেতে হতো অনেক সময়। খাবারের জন্য পাগল হয়ে যেত সে। নিজে সবকিছু করেও খেতে পারতো না। একাধিক রুম ময়লা করতো। সকাল-বিকাল মুছতে হতো। প্রতিদিন অনেকগুলো কাপড় কাচতে হতো। শরীর দুর্বল হওয়ায় ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হতো। কোনো কোনো দিন উঠতে একটু দেরি হলে হাতের কাছে যা পেত তাই দিয়ে মারতো।

বিজ্ঞাপন

ফারজানা বলতে থাকে, ‘বাসায় বাবাকে আসতে দিত না। ফোনে টাকা পাঠাতো বাবার কাছে। আর বলতো, তোমার মেয়ে ভালো আছে।’ কান্না করতে করতে সে বলে, ‘আমি তাদের হাত থেকে বাঁচতে চাই। প্রয়োজনে ভিক্ষা করে খাব। তবুও ওই বাসায় থাকতে চাই না। প্রায় ছয় বছর হলো ওই বাসায় আছি। প্রথমের দিকে কম মারতো। কিন্তু দুই বছর হলো অনেক বেশি মারধর করে। আবার কিছু খেতেও দেয় না।’

গৃহকর্ত্রীর নির্মম অত্যাচারে কেবল হাড্ডিসার দেহই রয়েছে ফারজানার

বিজ্ঞাপন

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিৎসক মো. আলাউদ্দিন শরীফ সারাবাংলাতে বলেন, ‘মেয়েটির শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের দাগ রয়েছে। খেতে না পেয়ে পুরো শরীর কুঁকড়ে গেছে। সংকুচিত হয়ে গেছে পেশীগুলো। মাংস নেই, শুধু হাড্ডিসার দেহ রয়েছে। প্রথমে ক্ষতগুলো সারাতে হবে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো- মেয়েটি ট্রমায় ভুগছে। প্রচণ্ড ভয়ে আছে। এজন্য কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে। চিকিৎসক বোর্ড গঠন করা হয়েছে। যথাসাধ্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

ফারজানার বাবা বেলাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছয় বছর হলো মেয়েকে ওই বাসায় দিয়েছি। মেয়েকে নেওয়ার সময় ইউসুফ বলেছিল, তারা ভালোভাবে রাখবে। মেয়ে বড় হলে বিয়ে দিয়ে দেবে। প্রথমে মাসে এক হাজার করে টাকা দিতেন। গত দুই বছর ধরে দুই হাজার করে টাকা পাঠান। দুই বছর ধরে মেয়েকে দেখা করতে দিতেন না। বলতেন মেয়ে ভালো আছে। আমিও আর সেরকম কিছু মনে নেইনি। কিন্তু গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার মেয়েকে তারা শেষ করে দিয়েছে। মেয়ের শরীরে কিচ্ছু নেই। শুধু হাড্ডি কয়টা পড়ে আছে। আমি তাদের বিচার চাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে বেলাল হোসেন বলেন, ‘মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার পর ইউসুফ ফোন করে জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য যা টাকা লাগবে তা তারা দেবেন। তবুও যেন এ ব্যাপারে থানায় কোনো অভিযোগ না করি।’

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন