বিজ্ঞাপন

‘গদি টিকিয়ে রাখতে’ ইসি বিল, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি

January 23, 2022 | 11:51 pm

আজমল হক হেলাল, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত আইন বিল আকারে উত্থাপন করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার সপ্তাহ তিনেক আগে উত্থাপন করা এই বিল নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। প্রস্তাবিত এই আইনকে ‘প্রত্যাখ্যান করে’ দলগুলো বলছে, ‘গদি টিকিয়ে রাখতে’ সরকার আইন প্রণয়ন করার জন্য বিলটি সংসদে উত্থাপন করছে।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, সরকার নিজেদের পছন্দসই নির্বাচন কমিশন গঠন করতেই তড়িঘড়ি করে আইনটি পাসের উদ্যোগ নিয়েছে। আইনটি পাস হলে এর অধীনে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে সেটি শক্তিশালী হবে না। সেই নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও আয়োজন করতে পারবে না। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন একটি অন্তর্বর্তী সরকার বা জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে। ওই সরকারই একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে।

শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক দলগুলো আরও বলছে— ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সরকার যে পথে হাঁটছে, তা দেশের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনবে। সরকারও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। কারণ জনগণ সুষ্ঠু, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে জনগণ অচিরেই লড়াই করতে মাঠে নামবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

‘গদি টিকিয়ে রাখতে’ ইসি বিল, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি

বিজ্ঞাপন

রোববার (২৩ জানুয়ারি) সকালে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। বিলে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সিইসি ও কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই আইনের অধীনে এর আগে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশনগুলোকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

ইসি আইন নিয়ে ‘অনাগ্রহে’র কথা জানিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবির কথা জানালেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি যে সংলাপ আহ্বান করেছিলেন, সেখানেই আমরা আগ্রহ দেখাইনি। এই আইন নিয়েও আমাদের আগ্রহ নেই। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ— আগামী জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে। আমরা জনগণের সেই আগ্রহের সঙ্গে একমত।

বিজ্ঞাপন

‘সে কারণেই বর্তমান সরকারকে আগামী জাতীয় নির্বাচন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আয়োজন করতে হবে। এই সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। এ দাবি আদায়ের জন্য সময়মতোই জনগণ মাঠে নামবে,’— বলেন ড. মোশাররফ।

আইনের পক্ষে থাকলেও আইনের মাধ্যমেই নির্বাচনে টাকা ও পেশী শক্তির প্রয়োগ বন্ধের পক্ষে মত দিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আমরা আইনের পক্ষে। আশা করব, আইনটি যেন জনগণের পক্ষে থাকে। জটিলতা যেন না হয়। পাশাপাশি আইনের মাধ্যমে নির্বাচনে পেশী শক্তি ও টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। একজন গরীব মানুষও যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

কেবল আইন নয়, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হলে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবেও সক্ষম করে তুলতে হবে বলে জানান শাহ আলম। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আর্থিক ক্ষমতা থাকতে হবে। নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর শক্তভাবে ন্যস্ত করতে হবে। নির্বাহী ক্ষমতা থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতা পৃথক করতে হবে।

সংসদে উত্থাপিত ইসি গঠন বিষয়ক বিলকে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ’ বলে অভিহিত করছেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকার সংসদে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য যে আইনটি উত্থাপন করেছে, সেটি হচ্ছে নতুন বোতলে পুরনো মদ। নিরপক্ষ কমিশন করার জন্য যে বাধ্যবাধকতা আছে, সেটি না করে ২০১২ ও ২০১৭ সালে যেটি হয়েছে (রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসে সার্চ কমিটি গঠন করে সেই কমিটির প্রস্তাবনা থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন করেন), সেটিকেই কেবল আইনি কাঠামোতে ঢুকিয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।

নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারের কথা বললেন অ্যাডভোকেট সুব্রতও। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করতে হবে। এজন্য জাতীয় সরকারের বিকল্প নেই।

অ্যাডভোকেট সুব্রতের মতো নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও মনে করেন, এর আগের নির্বাচন কমিশনগুলোতে বৈধতা দেওয়ার জন্যই মূলত এই আইন পাস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অবৈধ জিনিসকে বৈধতা দিতে এ পদক্ষেপ (সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে আইন পাস করার উদ্যোগ)। এই আইনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হবে না, বরং এই আইনের মাধ্যমে সরকার তার অতীত উদ্দেশ্য সফল করবে।

আরও পড়ুন-

‘গদি টিকিয়ে রাখতে’ ইসি বিল, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি

প্রস্তাবিত এই আইন প্রত্যাখ্যান করে মান্না সারাবাংলাকে বলেন, আমরা এই প্রস্তাবিত আইন প্রত্যাখ্যান করছি। লড়াই-সংগ্রাম করে এই সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হবে। কারণ এই সরকার জনগণের জন্য একটিও ভালো কাজ করেনি। ফলে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এখনই লড়াই-সংগ্রাম শুরু করতে হবে।

সার্চ কমিটিকে ‘আইনি মোড়ক’ দেওয়ার জন্যই এই আইনটি প্রস্তাব করা হয়েছে বলে মন্তব্য গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকীর। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সম্প্রতি যে তামাশা আয়োজন করা হয়েছিল, সেই তামাশাকে চূড়ান্ত করার ব্যবস্থা করতেই সংসদে আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্চ কমিটির নামে রাষ্ট্রপতির ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার যে তামাশা করেছিল, নির্বাচন কমিশন গঠন আইনের নামে সেটিকে আইনি মোড়কে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই সংসদ জনগণের সম্মতি নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। ফলে এই সরকারের নৈতিক বৈধতা নেই। কাজেই আমরা মনে করি, বর্তমান যে রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থার সংকট, এই ধরনের সংসদে এই আইন করে এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ তৈরি হবে না। এ ধরনের আইন বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শাসনকেই শক্তিশালী করবে। ফলে আইনটি স্বৈরাচারী আইনে পরিণত হবে। তাই আমরা মনে করি, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান সরকারের পদত্যাগ এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচনের জন্য নতুন জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন জানিয়ে জোনায়েদ সাকী বলেন, আমরা আশা করি— জনগণের সংগ্রামের চাপেই সরকার বাধ্য হবে পদত্যাগ করতে। দেশে জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় সরকার গঠন হবে। ওই সরকারের মাধ্যমেই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। অচিরেই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে লড়াই শুরু হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ রয়েছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সংবিধানে আইনের আওতায় রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সেই আইন প্রণয়ন করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে এর আগের দুই বারের মতো এবারও রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ আহ্বান করেন। বিএনপিসহ কয়েকটি দল সেই সংলাপ বর্জন করে। বাকি দলগুলো রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিয়ে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের তাগিদ দেয়।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষের দিকে চলে আসায় আরও আগে থেকেই ইসি গঠন সংক্রান্ত আইনের তাগিদ আসছিল বিভিন্ন মহল থেকে। তবে গত বছরের শেষের দিক থেকেই সরকার বলে আসছিল, এবারে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে এই আইন প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় নেই। সংলাপে শেষ দিন ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ অংশ নেওয়ার পর দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী অবশ্য ব্রিফিংয়ে বলেন, এই আইন প্রণয়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলের দাবি থাকায় চলতি সংসদ অধিবেশনেই আইনটি পাস করার চেষ্টা করা হবে। এর আগে ওই দিন দুপুরেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

এরপর জানা যায়, চলতি সংসদ অধিবেশনেই আইনটি পাস করার জন্য চেষ্টা করা হবে। মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদনের পরদিন মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সারাবাংলাকে বলেন, রোববার (আজ, ২৩ জানুয়ারি) আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হবে। পরবর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চলতি অধিবেশনেই এটি পাস করা হবে।

সারাবাংলা/এএইচএইচ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন