বিজ্ঞাপন

‘আদালতের পর্যবেক্ষণ মেনে’ মিতুর বাবার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন

January 25, 2022 | 5:53 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদ খানম মিতু হত্যায় তার বাবা মোশাররফ হোসেনের দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

বিজ্ঞাপন

আদালতের পর্যবেক্ষণ মেনে একই ঘটনায় বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলার তদন্ত এগিয়ে নিতে মোশাররফের মামলাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে— এমনটিই জানিয়েছে পিবিআই।

মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুক চট্টগ্রাম আদালতের প্রসিকিউশন শাখায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন- ২ মামলা আর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ‘জালে’ ঝুলছে মিতু হত্যা মামলা

জানতে চাইলে আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মিতু খুনের ঘটনায় দু’টি মামলা আছে। এর মধ্যে তার স্বামী বাবুল আক্তার যে মামলা করেছেন, সেটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আমরা জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু আদালত সেটি গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের জন্য বলেছেন। একই ঘটনায় দুই মামলা নিয়ে আদালত পর্যবেক্ষণও দিয়েছেন। আমরা সেই পর্যবেক্ষণ মেনে দ্বিতীয় মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। তবে দ্বিতীয় মামলার ডকেট প্রথম মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্তের জন্য আদালতের অনুমতি প্রার্থনা করেছি।’

বিজ্ঞাপন

ঘটনাক্রম

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার ও আর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি করে ও ছুরিকাঘাতে খুন করা হয় মিতুকে। স্ত্রী খুনের ঘটনায় পুলিশ সদর দফতরের তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

বিজ্ঞাপন

গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তার পর ২০১৬ সালের আগস্টে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। হত্যাকাণ্ডের পরের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন প্রথম এই খুনে বাবুলের জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন-

বিজ্ঞাপন

‘আদালতের পর্যবেক্ষণ মেনে’ মিতুর বাবার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন

নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাত ঘুরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলার তদন্তভার পড়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। প্রায় দেড় বছর পর ২০২১ সালের ১১ মে বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। পরদিন বাবুল আক্তারের মামলায় আদালতে ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়— তদন্তে বাদী বাবুল আক্তারের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

ওই দিনই অর্থাৎ ১২ মে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আট জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার বাকি সাত আসামি হলেন— মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক প্রকাশ হানিফুল হক প্রকাশ ভোলাইয়া, মো. মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম কালু, মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু ও শাহজাহান মিয়া।

পিবিআই হেফাজতে থাকা বাবুল আক্তারকে ১২ মে মোশাররফের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বর্তমানে বাবুল আক্তার কারাগারে আছেন।

২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর মামলার এক আসামি এহতেশামুল হক ভোলা আদালতে জবানবন্দি দিয়ে জানান, বিশ্বস্ত সোর্স কামরুল ইসলাম শিকদার মুছাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাকে দিয়ে স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে খুন করান পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার। তার ঘনিষ্ঠ সাইফুল হক, গাজী আল মামুন, মোকলেসুর রহমান ইরাদ এবং আসামি মুসার স্ত্রী পান্না আক্তারও আদালতে জবানবন্দি দেন।

তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এসব জবানবন্দির একপর্যায়ে নিজের মামলায় পিবিআইয়ের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর নারাজি আবেদন দাখিল করেন বাবুল আক্তার। ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর শুনানি শেষে আদালত বাবুল আক্তারের নারাজি আবেদন প্রত্যাখান করেন। একইসঙ্গে পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখান করে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন।

ফলে মোশাররফ হোসেনের দায়ের করা মামলাটির পাশাপাশি ‘আপাত নিষ্পত্তি‘ করা বাবুল আক্তারের মামলাটিও সক্রিয় হয়ে যায়। দুই মামলার সমান্তরাল তদন্তভার এসে পড়ে পিবিআইয়ের ওপর। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর বাবুল আক্তারকে তার নিজের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ৯ জানুয়ারি আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদন মঞ্জুর করেন।

কী ছিল আদালতের পর্যবেক্ষণে

আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও নারাজি আবেদন নিষ্পত্তি করে যে আদেশ ও পর্যবেক্ষণ দেন, তাতে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলায় পিবিআইয়ের তদন্তকে ‘সফল’ বললেও ‘টেকনিক্যাল ত্রুটি’র কথাও উল্লেখ করেছেন। ফৌজদারি কার্যবিধি আইন, ১৮৯৮-এর ১৫৪, ১৫৬ ও ১৯০ ধারার বিধান পর্যালোচনার বিষয় উল্লেখ করে এতে বলা হয়েছে, ‘এটিই আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি যে একটি আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে একটিমাত্র প্রাথমিক তথ্য বিবরণী দায়ের হওয়া উচিত।’

সূত্রমতে, আদালত উল্লেখ করেন— ‘প্রথম এজাহারের পর পরবর্তীকালে তদন্তে বর্ণিত ঘটনায় ভিন্নতা পাওয়া গেলে বা এজাহারে বর্ণিত অপরাধ পরবর্তী সময়ে ভিন্নতর কোনো অপরাধে পরিবর্তিত হলে দ্বিতীয় এজাহার দায়ের করা যাবে মর্মে মহামান্য উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান মামলায় (বাবুল আক্তারের দায়ের করা) সম্পূর্ণ ঘটনা এজাহারে বর্ণিতমতে তদন্তকালে সত্য পাওয়া স্বত্ত্বেও তদন্তকারী কর্মকর্তা কেবল এজাহারকারী তদন্তে আসামি শনাক্ত হওয়ায় অত্র মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যা পুলিশ প্রবিধান ১৯৪৩-এর ২৭৫ নম্বর বিধির স্পষ্ট পরিপন্থি।’

আদালত আরও উল্লেখ করেন— এজাহারকারী বা বাদী তদন্তে আসামি হিসেবে শনাক্ত হলেও তাতে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রভাব পড়বে না এবং সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ২১ ধারার বিধান অনুযায়ী ওই এজাহারটি এজাহারকারীর বিরুদ্ধে বিচারের সময় প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সূত্রমতে, আদালত বাবুল আক্তারের নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে আদেশে পর্যালোচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন— ‘তদন্তকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা এজাহারকারী বাবুল আক্তার মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার মূল আসামি হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন মর্মে উল্লেখ করেছেন। বাবুল আক্তারকে আসামি করে নতুন একটি মামলা দায়েরের উদ্দেশে অত্র মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাবুল আক্তার আসামি হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় তাকে মিথ্যাভাবে জড়িত করা হয়েছে বা সঠিকভাবে তদন্ত না করায় পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে— এসব কারণ উল্লেখ করে নারাজি দরখাস্ত দাখিল করার বা অধিকতর তদন্তের কোনো সুযোগ বাবুল আক্তারের নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়।’

চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখান করে আদালত পর্যালোচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ‘এই মামলায় একটি সফল তদন্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে খুনের মোটিভ ও আসামি শনাক্ত হয়েছে। তদন্তে দু’জন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, দুই সাক্ষীর ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং কার্তুজসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ হয়েছে। একটি সফল তদন্তের পরিসমাপ্তি কেবল টেকনিক্যাল একটি তুচ্ছ কারণে ব্যর্থ করে দেওয়া উচিত হবে না বরং এ মামলায় অধিকতর তদন্ত করে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং পরবর্তী আইনগত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।’

সারাবাংলা/আরডি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন