বিজ্ঞাপন

‘রাজাকারপুত্রের’ ভয়ে তটস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধার পুত্র

January 26, 2022 | 3:24 pm

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রার্থী হয়েছেন প্রয়াত জামায়াত নেতার ছেলে মো. রুহুল্লাহ চৌধুরী। এই মনোনয়নের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি মঈনউদ্দিন চৌধুরী। নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান উল্লেখ করে মঈনউদ্দিন অভিযোগ করেছেন, রাজাকারের উত্তরসূরীর দাপটে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা এখন তটস্থ অবস্থায় আছেন। আতঙ্কে প্রচার-প্রচারণায়ও নামতে পারছেন না। তাকে গুম-খুনের ‍হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মঈনউদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাবা বজল আহমদ একজন বীর ‍মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। রুহুল্লাহ চৌধুরীর বাবা মুমিনুল হক চৌধুরী একজন রাজাকার, স্বাধীনতা বিরোধী, এটা স্বতঃসিদ্ধ, সবাই জানে। তার ছেলে রুহুল্লাহ চৌধুরী নৌকা প্রতীকে প্রার্থী হবে, আবার আমাদের হয়রানি-নির্যাতন করবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

বুধবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন অভিযোগ করেন মঈনউদ্দিন চৌধুরী, যার বাবা প্রয়াত বজল আহমদ মুক্তিযুদ্ধের সময় চরতী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার ভাই আসহাবউদ্দিন চৌধুরীও চরতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তারা দুই ভাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি পদে আছেন।

বিজ্ঞাপন

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সাতকানিয়া উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গত ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চরতী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মো. রুহুল্লাহ চৌধুরীর নাম ঘোষণা করা হয়।

রুহুল্লাহ চৌধুরীর বাবা জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য প্রয়াত মুমিনুল হক চৌধুরী। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার অভিযোগ করে থাকেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। অবশ্য মুমিনুলের জামাতা আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য, যিনি ‘জামায়াত ঘরানা’ থেকে দলটিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পান বলে প্রচার আছে। আসনটিও জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। মুমিনুল হকের মেয়ে অর্থাৎ নদভীর স্ত্রী রিজিয়া রেজা চৌধুরী মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সাংসদ হলেও নদভী এবং তার পরিবারের সদস্যদের ‘ছাড় দিতে’ রাজি নন দলটির জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগের একাংশের বিরোধিতার মধ্যেই নদভী ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ‍দুই দফায় সাংসদ নির্বাচিত হন। জামায়াত নেতার ছেলে ও নদভীর শ্যালক রুহুল্লাহ চৌধুরীর মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বড় অংশের মধ্যে।

রুহুল্লাহ চৌধুরীর বাবার জামায়াত পরিচয় তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে মঈনউদ্দিন বলেন, ‘মুমিনুল হক চৌধুরী যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত হয়ে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণকারী আব্দুল কাদের মোল্লা, গোলাম আজম ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় ইমামতি করেছিলেন। তার ছেলেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্য লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। নৌকা মার্কায় রাজাকারের উত্তরসূরীকে মানতে না পেরে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। আমার মার্কা আনারস।’

বিজ্ঞাপন

গত ২২ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন ছিল। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় হুমকিধমকি শুরু হয়, এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ’২১ জানুয়ারি রাত ১২টায় ৫০-৬০ জন মুখোশধারী আমার বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। আমাকে জানে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। ২২ জানুয়ারি দুপুরে শহরের চান্দগাঁও থানার ওমর আলী মাতব্বর রোডে আমার বাসায় দুই শতাধিক সন্ত্রাসী গিয়ে আমাকে গুম-খুন করবে বলে ভয়ভীতি দেখায় এবং পরিবারের সদস্যদের অপহরণ করবে বলে হুমকি দেয়। ওইদিন আমার মেয়েকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর আমার বোনকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়।’

কারা হুমকি দিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার খুব ভয় লাগছে। নাম বলতে ভয় লাগছে।’ পরে আবার বলেন, ‘আমার বাসায় পাঁচজন গিয়েছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাদের ছবি আছে। আমার বোনকে ফোন করে হুমকি দিয়েছেন সাংসদ নদভীর সাহেবের স্ত্রী রুহুল্লাহ চৌধুরীর বোন রিজিয়া রেজা চৌধুরী। তিনি আমার বোনকে বলেন, তোমার ভাইকে নেমে যেতে বল। না হলে অনেক সমস্যা হবে।’

বিজ্ঞাপন

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রিজিয়া রেজা চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী মঈনউদ্দিনের বোনকে ফোন করার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘নৌকা মার্কার প্রার্থী, আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি, যাতে নৌকার বিরুদ্ধে দলের কোনো প্রার্থী না থাকে। একটি সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে যেন নৌকা মার্কার প্রার্থী বিজয়ী হন, সেই চেষ্টা আমরা করছি। আমরা তো দলের পক্ষে, নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষেই এটা করেছি। অনেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু নৌকা মার্কার প্রার্থীকে সমর্থন করে উনারা কেউ নির্বাচন করছেন না। শুধুমাত্র মঈনউদ্দিন চৌধুরী আছেন। আমরা চেষ্টা করছি, উনাকেও যাতে নামানো যায়।’

বাবা মুমিনুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও জামায়াতের রাজনীতিতে জড়িত থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা প্রতিষ্ঠিত বিষয়। এর সমাধান হয়ে গেছে। এগুলোর আর কোনো জবাব আমি দিতে চাই না। আমাদের শরীরে জামায়াতের রক্ত যেমন আছে, আওয়ামী লীগের রক্তও আছে। আমার মা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগ নেতার বোন। আমাদের পরিবারে জামায়াত যেমন আছে, আওয়ামী লীগও আছে। আমার স্বামী আওয়ামী লীগের এমপি। আমি মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী। তারপরও কি আমরা আওয়ামী লীগ হতে পারব না? আর কী করে আমাদের আওয়ামী লীগ হতে হবে?’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য রুহুল্লাহ চৌধুরীকে বারবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে মঈনউদ্দিন চৌধুরী সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনেন। তার দাবি, চান্দগাঁও থানা থেকে ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য তার বাসায় গিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। তার গ্রামের বাড়িতেও সাদা পোশাকে পুলিশ গিয়ে ‍হুমকি দিয়েছে।

এসব বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশন, পুলিশ মহাপরিদর্শক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, পুলিশ সুপার, সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন।

মঈনউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আমি এতদিন প্রচারণায় নামতে পারিনি। এলাকায়ও যেতে পারছি না। ইনশল্লাহ আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে আমি প্রচারণায় নামব। আমি পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি। আমার নিরাপত্তা দাবি করছি। আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাঈনুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডাহা মিথ্যা কথা। আমার থানা থেকে কোনো পুলিশ সদস্য তার বাসায় যায়নি। এটা আমাদের কাজ নয়।’

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন