বিজ্ঞাপন

২ বাসের চাপায় কিশোরের মৃত্যু: এক চালক মাদকাসক্ত, অন্যজন হেলপার

January 26, 2022 | 6:34 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাজধানীর মগবাজার মোড়ে বেপরোয়াভাবে চলাচলরত দুই বাসের মাঝে পড়ে প্রাণ হারান বাদাম বিক্রেতা এক কিশোর। এ অভিযোগে দুই বাসের চালককে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাবের দাবি, আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের একটি বাসের চালক মাদকাসক্ত ছিলেন এবং অন্য বাসটি চালাচ্ছিলেন হেলপার।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে কারওয়ান বাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

আল মঈন বলেন, ‘দুটি বাসই ছিল আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের। তাদের মধ্যে মো. ইমরান নামে একটি বাসের চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলেও তিনি একজন মাদকাসক্ত। আর আরেক বাসের ড্রাইভিং সিটে ছিলেন হেল্পার মনির। চালকের অনুপস্থিতিতে তিনি বাসটি চালাচ্ছিলেন। তার নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর মগবাজার মোড়ে বিকাল পাঁচটায় আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুইটি বাস প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়াভাবে চালানোর কারণে রাকিবুল হাসান নামে এক কিশোর মাঝে চাপা পড়ে নিহত হয়।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘গত ২০ জানুয়ারি মগবাজার মোড়ে বিকেল ৫টার দিকে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুইটি বাসের মাঝে চাপা পড়ে আহত হন রাকিবুল হাসান নামে এক কিশোর। ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

দুর্ঘটনার পর দুই ঘাতক ড্রাইভার বাস দুটি রেখে পালিয়ে যান। ভিকটিম ঘটনাস্থলে মাস্ক বিক্রি করছিলেন। তার মাস্ক বিক্রির আয়ে পরিবারটি চলে। ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের সদস্যরা সড়ক ও পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৯৮ ও ১০৫ ধারায় ২০ জানুয়ারি রমনা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং-১৬। র‌্যাব জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়।

র‌্যাব-৩ এর একটি দল গত মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) রাতে রাজধানীর পল্টন এলাকা এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর এলাকা হতে আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের দুটি ঘাতক বাসের চালক মো. মনির হোসেন ও মো. ইমরানকে গ্রেফতার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুজনই ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেন।

বিজ্ঞাপন

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মনির হোসেন জানান, তিনি ৫ বছর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ছিলেন। তিন মাস আগে তিনি বাংলাদেশে তার নিজ গ্রামের বাড়ি ভোলাতে আসেন এবং প্রায় দেড় মাস আগে ঢাকাতে কর্মসংস্থানের জন্য আসেন। এক মাস আগে থেকে আজমেরী গ্লোরী গাড়ির চালকের সঙ্গে ওই গাড়িতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরিতে হেলপারি শুরু করেন। তিনি মাঝে মধ্যে বাসটি নিজেও চালাতেন। তার কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না।

গত ২০ জানুয়ারি বিকাল চারটায় আজমেরী গ্লোরী পরিবহন (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫৭৮৭) সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশে গাড়ির মূল চালক চালিয়ে নিয়ে আসেন। পথে চালক সুমন গুলিস্তানে এসে গাড়িটি হেলপার মনির হোসেনের দায়িত্বে দিয়ে যান। মনির গাড়িটি চালিয়ে মগবাজার মোড়ে নিয়ে আসেন।

বিজ্ঞাপন

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানান, মগবাজার মোড়ের সিগন্যাল ছেড়ে দিলে দ্রুত গাড়ি দুটি এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পরবর্তী স্টপেজে যিনি আগে পৌঁছাতে পারবেন তিনি বাসের জন্য অপেক্ষারত বেশি সংখ্যক যাত্রীকে তার বাসে নিতে পারবেন। এমতাবস্থায় বেপরোয়া প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এক গাড়ি অপর গাড়িটিকে ওভারটেক করার সময় দুই গাড়ির মাঝখানে চাপা পড়ে ওই কিশোর। ঘটনার পরপরই দুই চালক মনির হোসেন ও ইমরান হোসেন বাস দুটি রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ইমরান হোসেন জানান, তিনি ১০/১২ বছর যাবত আজমেরী গ্লোরী নামক কোম্পানির বাস চালিয়ে আসছেন। ঘাতক বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৬০-৫৬) সে আনুমানিক দুই বছর ধরে চালাচ্ছেন। যদিও তিনি এক সময় হেলপার ছিলেন। তিন বছর আগে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছেন। পরে বাসটির মালিকের কাছ থেকে দৈনিক ৩ হাজার ৫০০ টাকা হারে বাসটি ভাড়ায় চালানো শুরু করেন। গত ২০ জানুয়ারি ৪টার দিকে যথারীতি বাসটি নিয়ে সদরঘাট থেকে গাজীপুর চন্দ্রার উদ্দেশে রওনা হন। মগবাজারে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান।

কমান্ডার মঈন বলেন, ‘গ্রেফতার ইমরান মাদকাসক্ত। তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির কারণে ২০২১ সালে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।’

আজমেরী গ্লোরী পরিবহনের ঘাতক বাসের একটির মূল চালক সুমন ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুই ঘাতক বাসের চালকের দায়িত্বে থাকা দুজনকে গ্রেফতার করেছি। আসামিদের থানায় সোপর্দ করা হবে। তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি তদন্তে তাদের ব্যত্যয় বা দায় পান তাহলে অবশ্যই আইনানুগ পদক্ষেপ নেবেন।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মঈন বলেন, ‘সম্প্রতি আন্তঃজেলা গণপরিবহনের চেয়ে ঢাকায় চলাচলকারী বাসেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। ইতোপূর্বে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর দুর্ঘটনার দায়ী চালক হেলপারদের র‌্যাব গ্রেফতার করেছে। তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, চালক-হেলপারদের প্রতিযোগিতামূলক ও বেপরোয়া মানসিকতার কারণে এবং চুক্তিভিত্তিক বাস চালনার কারণে অর্থলোভে দুর্ঘটনা ঘটে।’

এক্ষেত্রে মালিক চালক হেলপারদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদেরও সাবধান ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সারাবাংলা/ইউজ/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন