বিজ্ঞাপন

২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণ শনাক্তের হার পৌঁছাল সর্বোচ্চে

January 28, 2022 | 10:54 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দুই বছরে দুই ঢেউয়ের এবার দেশে চলছে করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের প্রভাবেই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সংক্রমণে। তবে আগের দুইবারের তুলনায় এবারে অনেক দ্রুতই সংক্রমণ শনাক্তের হার রেকর্ডের দিকে ধাবিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দেশে বিগত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬ হাজার ২৬৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৫ হাজার ৪৪০ জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩৭১ শতাংশ। এটি দেশে এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ শনাক্তের হার।

শুক্রবার (২৮ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীরের সই করা প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে ২০ জন।

বিজ্ঞাপন

প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দেশে এখন পর্যন্ত এক কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৪৫টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭১ জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন ২৮ হাজার ৩০৮ জন।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্তের হার

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— শুরুর দিকে এই ভাইরাসের সংক্রমণের গতি ছিল একেবারেই ধীর। যত সময় পার হয়েছে, ততই বেড়েছে সংক্রমণের গতি। ৮ মার্চ প্রথম তিন জনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৮ মার্চ ১০টি নমুনা পরীক্ষা করে চারজনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এ দিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ৪০ শতাংশ হলেও কম নমুনার কারণে এটিকে সর্বোচ্চ ১০ শনাক্তের হারের হিসেবে নেওয়া হয় নি।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২২ সালের ২৮ জানুয়ারি। এ দিন দেশে ৪৬ হাজার ২৬৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৫ হাজার ৪৪০ জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩৭১ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২০ সালের ১২ জুলাই। এ দিন দেশে আট হাজার ৬৮টি নমুনা পরীক্ষা করে দুই হাজার ৬৬৬ জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩৩ দশমিক ০৪৪ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের তৃতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২১ সালের ২৪ জুলাই। এ দিন দেশে ২০ হাজার ৮২৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ছয় হাজার ৭৮০ জনের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ৫৫৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের চতুর্থ সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ৩৯৫ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের পঞ্চম সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ৩৭১ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২১ সালের ২২ জুলাই। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩২ দশমিক ১৮৭ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সপ্তম সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৯৮২ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের অষ্টম সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২০ সালের ৩ আগস্ট। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৯১৩ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের নবম সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৬৪১ শতাংশ।

দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের দশম সর্বোচ্চ শনাক্তের হার দেখা যায় ২০২১ সালের ৮ জুলাই। এদিন সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৬১৭ শতাংশ।

এছাড়াও ২০২১ সালের ৬ জুলাই দেশে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ৩১ দশমিক ৪৬২ শতাংশ।

টানা ৬ দিন সংক্রমণের হার ৩১ শতাংশের বেশি

করোনার তিনটি ঢেউয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিন বারই সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। ৩১ এবং ৩২ শতাংশ অতিক্রমের নজিরও রয়েছে। তবে কোনোবারই সংক্রমণের হার টানা ছয় দিন ৩১ শতাংশের বেশি ছিল না।

এর মধ্যে করোনার প্রথম ঢেউয়ে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে মাত্র দুই দিন। ২০২০ সালের ১২ জুলাই এই হার ছিল ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর ওই বছরেরই ৩ আগস্ট সংক্রমণের হার ছিল ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি তুলনামূলকভাবে কম দিন ছিল। তবে সংক্রমণের হার প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় ছিল অনেক বেশি। এবারে ১৪ দিন সংক্রমণের হার পাওয়া গেছে ৩০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে আট দিন সংক্রমণের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৬ থেকে ১০ জুলাই— এই পাঁচ দিনের প্রতিদিনই সংক্রমণের হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি। ৬, ৭ ও ৮ জুলাই সংক্রমণের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি।

এর ক’দিন পরেই ২১ থেকে ২৫ জুলাই— এই পাঁচ দিনও সংক্রমণের হার টানা ৩০ শতাংশের বেশি ছিল। এর মধ্যেও আবার ২২, ২৩ ও ২৪ জুলাই সংক্রমণের হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। তবে টানা পাঁচ দিন ৩১ শতাংশের বেশি সংক্রমণের হার এবারে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে এসেই প্রথম দেখা গেল।

১৭ জানুয়ারি থেকে সংক্রমণ চরম ঊর্ধ্বমুখী

গেল ডিসেম্বরে করোনার দৈনিক সংক্রমণ নেমে এসেছিল ২শর ঘরে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হারও নেমে এসেছিল ১ শতাংশের ঘরে। তবে নতুন বছরের শুরু থেকেই সংক্রমণের গতি ঊর্ধ্বমুখী। গত ৬ জানুয়ারি আবারও এক দিনে সংক্রমণ ছাড়ায় ১ হাজারের ঘর। ৭ জানুয়ারি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ছাড়ায় ৫ শতাংশ। এরপর দ্রুতই সংক্রমণ আর শনাক্তের হার বাড়তে থাকে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ জানুয়ারি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ছিল ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বরের পর এই প্রথম সংক্রমণের হার ১০ শতাংশ ছাড়ায়। এরপর গত ১৭ জানুয়ারি সংক্রমণের এই হার পেরিয়ে যায় ২০ শতাংশ। এরপর টানা ১১ দিন ধরেই সংক্রমণের হার ২০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই হবে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের কারণেই মূলত সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। বিশ্বব্যাপী ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট যেভাবে সংক্রমণ বাড়িয়েছে, একই ধরনের প্রবণতা বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে। কারণ স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঘোষণাই বলছে, দেশে এই ভ্যারিয়েন্টের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এরই মধ্যে ঘটে গেছে। এ বছর করোনাভাইরাসের যেসব নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার সিংহভাগেও মিলেছে এই ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি।

ওমিক্রনের প্রভাবে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কত দিন থাকবে, সে বিষয়ে অবশ্য এখনই কিছু বলতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। তবে প্রভাব যাই থাকুক, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দিকে সরকারকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। বলছেন, সংকটের এই সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একেবারেই বাইরে চলে যাবে, যার জন্য ভুগতে হবে দীর্ঘ সময়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না কিংবা কবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে— এসব বিষয়ে বলার মতো যথেষ্ট তথ্য এখনো কারও কাছেই নেই। আমাদের দেশেও এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি আরও কমপক্ষে দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলতে পারে। সবাই গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে এরপর হয়তো সপ্তাহখানেক স্থিতাবস্থা থাকবে। তারপর সংক্রমণ নিম্নমুখী হতে পারে।

তবে স্বাস্থ্যবিধি বা বিধিনিষেধ নিয়ে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল। তিনি বলেন, সরকার বিধিনিষেধ দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো কার্যকর করতে প্রশাসন কী করছে? সরকার নির্দেশনা দিলেও প্রশাসনের তেমন তৎপরতা দেখছি না। স্বাস্থ্যবিধি মানানোর দায়িত্ব সরকারের একার নয়, এর সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সেটিই হচ্ছে না। সেটি করার পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীদের অক্সিজেনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা এক লাখ হলে ভালো হতো। বাড়তি জনবল নিয়োগ দিয়ে হলেও এই কার্যক্রম গতিশীল করতে হবে।

ওমিক্রনের প্রভাবে সারাবিশ্বেই করোনা সংক্রমণের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে জানিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, বাংলাদেশেও দুয়েকদিনের মধ্যে হয়তো সংক্রমণের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। ৫০ হাজার নমুনা পরীক্ষায় সেখানে ১৫ হাজারের বেশি শনাক্ত হচ্ছে, ১ লাখ নমুনা পরীক্ষা হলে তো এই সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

তবে সংক্রমণের সংখ্যায় মনোযোগ না দিয়ে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হতে আহ্বান জানালেন ডা. মুশতাক। তিনি বলেন, যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে হবে। পরীক্ষা করার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। করোনা আক্রান্তদের ফলোআপের আওতায় আনতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে আইসোলেশন সেন্টার করতে হবে। এসব না করতে পারলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কোথায় গিয়ে থামবে, বলা মুশকিল।

সারাবাংলা/এসবি/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন