বিজ্ঞাপন

এখনো চালু হয়নি বহু স্টল, প্রাণহীণ লিটল ম্যাগ চত্বর

February 22, 2022 | 11:12 pm

এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: অমর একুশে গ্রন্থমেলার লিটল ম্যাগাজিন (লিটল ম্যাগ) চত্বরে এখনো বন্ধ রয়েছে বেশ কিছু স্টল। বরাদ্দ নিলেও সেগুলো ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এই চত্বরে লেখক-পাঠকদের বসার জন্য মাত্র দু’টি বেঞ্চ রয়েছে। সাহিত্যের আড্ডাস্থল হিসেবে পরিচিত হলেও এই চত্বরে ঘাসের ওপর বসে থাকতে দেখা গেছে কয়েকজনকে। প্রতিটি স্টলের ব্যানারও এবার সমান নয়। বিষয়টিকে দৃষ্টিকটু হিসাবে দেখছেন প্রকাশকরা।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও লিটল ম্যাগ চত্বরে স্টলগুলোর ওপরে যে ত্রিপল দেওয়া হয়েছে, তাও ঠিকভাবে টাঙানো হয়নি। তাতে বৃষ্টি হলেই ভিজে যাচ্ছে বই, ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রকাশকরা। গুছিয়ে না উঠতে পারা লিটল ম্যাগ চত্বরে এখন পর্যন্ত বিক্রিবাট্টাও কম। সব মিলিয়ে লিটল ম্যাগ চত্বরকে প্রাণহীন বলছেন কোনো কোনো প্রকাশক।

বাংলা একাডেমি থেকে মেলায় ঢুকলে সোহরাওয়ার্দী অংশে প্রথমেই পড়বে লিটল ম্যাগ চত্বর। মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, এই চত্বরটি একেবারেই ফাঁকা। প্রায় দর্শনার্থীশূন্য। হাতেগোনা কয়েকজনের উপস্থিতি থাকলেও যেন নৈঃশব্দ ভর করেছিল এই চত্বরে। যে কয়জনের উপস্থিতি দেখা গেছে, তাদেরও জন্য বসার জন্য নেই বেঞ্চ। কয়েকজনকে মাঠেই ঘাসের ওপর বসে থাকতে দেখা গেছে। আবার বেশকিছু স্টল একেবারেই বন্ধ রয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে সাহিত্যচর্চায় নতুন ধারা উসকে দেওয়া লিটল ম্যাগ আন্দোলন যেমন ধীরে ধীরে প্রাণ হারিয়েছে, বইমেলার লিটল ম্যাগ চত্বর যেন তারই প্রতীকী রূপ।

বিজ্ঞাপন

লিটল ম্যাগ ‘শালুক’র প্রকাশক ওয়াবেদ আকাশ সারাবাংলাকে বলেন, এবার বাংলা একাডেমি লিটল ম্যাগাজিনকে খুব সুন্দর একটি জায়গা দিয়েছে। তবে লিটল ম্যাগ চত্বরে বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ এখানে বসার জন্য বেঞ্চ প্রয়োজন ছিল। কারণ লিটল ম্যাগ মানেই আড্ডা। এই শূন্যতাটা রয়ে গেছে। তারপরও জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির উদারতা আমাদের খুব ভালো লেগেছে।

এখনো চালু হয়নি বহু স্টল, প্রাণহীণ লিটল ম্যাগ চত্বর

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এখনো বেশকিছু স্টল বন্ধ থাকার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যারা বরাদ্দ নিয়েও স্টল চালু করেনি, সেসব লিটল ম্যাগকে চিহ্নিত করা দরকার। কারণ ভালো ভালো ম্যগাজিনগুলো তাদের প্রকাশনা ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারছে না। অথচ স্টল বরাদ্দ নিয়ে তারা এখনো স্টল চালু করছে না। বাংলা একাডেমির কাছে অনুরোধ করব, ভবিষ্যতে যেন এসব স্টলকে আর বরাদ্দ দেওয়া না হয়।

ওয়াবেদ আকাশ আরও বলেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে লিটল ম্যাগ চত্বরে প্রচুর পাঠক, লেখক ও প্রকাশক এসেছেন। গতকাল খুবই জমজমাট ছিল মেলা। বিক্রিও ভালো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

লিটল ম্যাগাজিন ‘রৌদ্রছায়া’র প্রকাশক আহমেদ রউফ সারাবাংলাকে বলেন, সর্বাঙ্গীনভাবে লিটল ম্যাগ সবসময় অবহেলিত। মেলায় বড় বড় প্রকাশনীকে আগেই স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সবার পরে বরাদ্দ দেওয়া হয় লিটল ম্যাগকে। এবারের মেলায় যদি ধরি— আমরা ঘুরতে ঘুরতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। মেলার মাত্র দু’দিন আগে লিটল ম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে এবার লিটল ম্যাগের স্টলগুলোর ব্যানার সমান হয়নি।

তিনি বলেন, লিটল ম্যাগ থেকেই বড় বড় লেখক উঠে এসেছেন। জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠালে নতুন লেখকদের লেখা ছাপা হয় না। লিটল ম্যাগ সেই লেখা যত্ন নিয়ে ছাপায়। কিন্তু কেউ লিটল ম্যাগের ওপর সুনজর দিচ্ছে না। বড় বড় কোম্পানি আমাদের প্রত্যাখান করে, বিজ্ঞাপন দেয় না। এ কারণে লিটল ম্যাগাজিনগুলো এক দুই বছরের মধ্যে ঝরে পড়ে, বন্ধ হয়ে যায়। এবারেও মেলা শুরুর মাত্র দুই দিন আগে স্টল বরাদ্দ পাওয়ায় তাড়াহুড়ো করে স্টল সাজানো সুন্দর হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এখনো চালু হয়নি বহু স্টল, প্রাণহীণ লিটল ম্যাগ চত্বর

মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, মেলায় মানুষজন আসছে। কিন্তু পাঠক কম। আর যারা আসছে, তারাও মূল মেলাতেই চলে যাচ্ছে। লিটল ম্যাগে আসছে না। ফলে লিটল ম্যাগে বিক্রিও কম।

এক প্রশ্নের উত্তরে আহমেদ রউফ বলেন, লিটল ম্যাগে ৬৪ জেলা থেকেই প্রকাশকরা স্টল বরাদ্দ নেয়। যারা ঢাকার আশপাশে থাকে, তারা প্রতিদিনই মেলায় আসছে। তারা স্টল খুলছে। কিন্তু অনেক দূরের যারা, তারা হয়তো নিয়মিত স্টল খুলতে পারছে না।

লিটল ম্যাগাজিন ‘এবং মানুষ’র প্রকাশক আনোয়ার কামাল সারাবাংলাকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে এবার মেলা নিয়ে দোদুল্যমানতা ছিল। তবে প্রতিদিনই ছোট পত্রিকা বের হচ্ছে। আমাদের সংখ্যাটি জানুয়ারিতে বের করতে পেরেছি। অনেকেই হয়তো করোনার কারণে পারেনি। মেলাতেও অনেকেই আসেনি। যার কারণে লিটল ম্যাগে প্রাণ নেই। তবে লিটল ম্যাগের জন্য স্থান নির্বাচন অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। এজন্য বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানাই।

তিনি আরও বলেন, মেলার সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। মেলা কত দিন চলবে, সেটি এখনো আমরা জানি না। ছোট পত্রিকা বের করতে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেই অর্থ নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। লিটল ম্যাগ তো বিজ্ঞাপন নির্ভর না। আমরা সেই প্রত্যাশা করিও না। পত্রিকাটি কিছু মানুষের মননে টোকা দিলে সেটিই আমাদের বড় প্রাপ্তি। লিটল ম্যাগের মাধ্যমে মুক্তচিন্তার বিকাশ লাভ করে। প্রথাবিরোধী লেখা প্রকাশ হয়। তব সব কিছু মিলিয়ে এবারের লিটল ম্যাগ চত্বর এখনো পূর্ণতা পায়নি। মেলার শেষ দিকে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে লিটল ম্যাগ— আমাদের প্রত্যাশা সেটিই।

এখনো চালু হয়নি বহু স্টল, প্রাণহীণ লিটল ম্যাগ চত্বর

লিটল ম্যাগ ‘নোঙর’র প্রকাশক সুমন শামস সারাবাংলাকে বলেন, ‘লিটল ম্যাগ মূলত তরুণ কবিদের প্ল্যাটফর্ম। নতুন যারা লিখছে তাদের অনেকের বই এখনো বের হয়নি। মেলার শেষ দিতে তা বের হবে। তবে এবার বিক্রি নেই এখনো। আমরা প্রস্তুতিতেই পিছিয়ে গেছি। লিটল ম্যাগ চত্বরের এবারের জায়গাটি খুব সুন্দর। কিন্তু আশপাশে বড় প্রকাশনাগুলোর স্টল না থাকায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি কম। বইমেলার কেন্দ্রের দিকে বড় বড় প্রকাশনার স্টল বা প্যাভিলিয়ন আছে— এমন জায়গায় লিটল ম্যাগ চত্বর করলে ভালো হতো।

তিনি বলেন, লিটল ম্যাগে বসার তেমন ব্যবস্থা নেই। মাত্র দুইটি বেঞ্চ দিয়েছে। কিছু স্টল এখনো ফাঁকা রয়েছে। স্টলগুলোর ওপরে ত্রিপল ঠিকভাবে দেওয়া হয়নি। ফলে লিটল ম্যাগের সবার বই ভিজে গেছে। বাংলা একাডেমি লিটল ম্যাগকে লিটল ম্যাগের মতোই দেখছে। আমাদের খুবই অল্প জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। এজন্য সবগুলো বই প্রদর্শন করা যাচ্ছে না। স্টলে আরও বেশি জায়গা বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল।

সুমন শামস আরও বলেন, বই যে একেবারে বিক্রি হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। প্রতিটি বই বিক্রি করতে পেরছি। আরও বেশ কিছুদিন পর মেলা পুরোদমে জমে উঠবে। তখন লিটল ম্যাগে বিক্রি আরও বাড়বে। শেষ দিকে নতুন বইও আসবে।

লিটল ম্যাগাজিন শালুকের স্টলে কাজ করছিলেন বিক্রয়কর্মী শান্ত জাবালি। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক তো মোটামুটি নির্ধারিত। প্রতিবছরই শেষের দিকে বই বিক্রি হয়। এখন ঢিলেঢালাভাবে বিক্রি হচ্ছে। আজ (মঙ্গলবার) ক্রেতা একেবারেই কম। তবে গতকাল (সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি) প্রচুর ভিড় ছিল। বিক্রিও ভালো ছিল।

একান্নবর্তী নামের আরেকটি স্টলের বিক্রয়কর্মী ঐশ্বর্য বসু ঐশী বলেন, এখন পর্যন্ত তেমন বিক্রি হয়নি। প্রতিদিন দুই-তিনটি করে বই বিক্রি হচ্ছে। গতকাল (একুশে ফেব্রুয়ারি) সাত-আটটি বই বিক্রি হয়েছে। এবার একান্নবর্তীর দ্বিতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে বলে জানালেন তিনি।

এখনো চালু হয়নি বহু স্টল, প্রাণহীণ লিটল ম্যাগ চত্বর

লিটল ম্যাগ চত্বরে কথা হয় ফাহিম নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘মেলার সব জায়গায় লোক আছে। কিন্তু এখানে লোক নেই। এখানে মানুষের উপস্থিতি একেবারেই কম।’ লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত কবির নামের একজন সারাবাংলাকে বলেন, লিটল ম্যাগের দৈন্যদশা চলছে। আগের সেই প্রাণ নেই লিটল ম্যাগে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে, শিল্পসাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিষয়ে চলমান ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারা ও মতামত ব্যক্ত করার মুদ্রিত বাহনই হলো লিটল ম্যাগাজিন। এ ধরনের প্রকাশনা অনেকটা অনিয়মিত ও অবাণিজ্যিক। লিটল ম্যাগ নামে পরিচিত এসব ম্যাগাজিন প্রতিনিধিত্ব করে একটি ছোট সমমনা নব্য গোষ্ঠীর যাদের চিন্তা-ভাবনা-দর্শন চলমান ধারা থেকে ভিন্ন এবং অভূতপূর্ব। শিল্পসাহিত্যে লিটল ম্যাগ একটি আন্দোলনের নামও।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধ্বে ইউরোপ-আমেরিকায় লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু। বঙ্গদেশে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন প্রবর্তন করে প্রমথ চৌধুরী। তার সম্পাদিত সবুজপত্রকে (১৯১৪) আধুনিক লিটল ম্যাগাজিনের আদিরূপ বলে গণ্য করা হয়। অবশ্য অনেকে মনে করেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন (১৮৭২) বাংলা ভাষায় প্রথম লিটল ম্যাগাজিন।

সূচনা যেটিই হোক না কেন, বাংলা সাহিত্যচর্চায় লিটল ম্যাগাজিন একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আশি ও নব্বইয়ের দশকে লিটল ম্যগাজিনে যুক্ত হয়ে পড়েন তরুণ কবি-লেখকদের বড় একটি অংশ।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন