শনিবার ২৩ মার্চ, ২০১৯ ইং , ৯ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৪ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

স্বাগত ১৪২৫ রঙিন উদযাপনে

এপ্রিল ১৪, ২০১৮ | ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ

।। সারাবাংলা ডেস্ক ।।

ঢাকা: ভোর পাঁচটা ৩৯ মিনিটে রাঙা আলো ছড়িয়ে উঠেছে নতুন সূর্য। নতুন সকাল-নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনা জাগিয়ে এসেছে নতুন বছর ১৪২৫। শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) চৈত্রসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বিদায় নিল বাংলা সন ১৪২৪।

অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চেতনার বাহক পহেলা বৈশাখ প্রতি বছর হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের মেলা। বাংলা নববর্ষ বরণে রাজধানী জুড়ে থাকে নানা আয়োজন।

প্রতি বছরের মতো এবারও রয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন। দিনের প্রথম প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজন করছে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আয়োজন করছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” প্রতিপাদ্য ও মর্মবাণী ধারণ করে সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। দুই বছর পর আবারও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে যাচ্ছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।

বাংলা একাডেমি চত্বরে বসবে বইমেলা, বৈশাখী মেলা। অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজন করেছে হাজারো কণ্ঠে’ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। মুত্তিযুদ্ধ জাদুঘর সকাল ৯টায় থাকবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

জাতীয় প্রেস ক্লাব বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজন রেখেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও আয়োজন করছে বর্ষবরণ উদযাপন অনুষ্ঠান।

ভারতবর্ষের ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।

১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।

এবার পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে র‌্যাব। শুক্রবার রমনা এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে বাহিনীর মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, রমনা এলাকার পাশাপাশি এবার হাতিরঝিলেও র‌্যাবের কন্ট্রোল রুম থাকবে। অতীতের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে রমনা এলাকায় থাকবে র্যা বের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি হেলিকপ্টার থেকে টহল দেবে র্যা ব। এরপর রমনা এলাকা পরিদর্শনে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া।

এবারও নববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে।

নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন।

দেশে-বিদেশের সব বাঙালিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, “অতীতের সব গ্লানি ও বিভেদ ভুলে বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের ঐক্যকে আরও সুসংহত করবে। সকল অশুভ ও অসুন্দরের ওপর সত্য ও সুন্দরের জয় হোক। বাংলা নববর্ষ সকলের জন্য আনন্দের বারতা বয়ে আনুক এ প্রত্যাশা করি।”

রাষ্ট্রপতি বলেন, আবহমানকাল থেকে বাংলা নববর্ষ বাঙালি ঐতিহ্যে লালিত সর্বজনীন উৎসব। দিনটি সবাইকে প্রবলভাবে আপ্লুত করে এবং পুরাতনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। দেশজুড়ে চৈত্রসংক্রান্তী ও বৈশাখী মেলা উদ্যাপন দেশীয় সংস্কৃতির প্রসারেও অনবদ্য ভূমিকা রাখে।

ফসলি সন হিসেবে মোঘল আমলে যে বর্ষগণনার সূচনা হয়েছিল, আজ তা সালগণনার সীমা ছাড়িয়ে সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা মানবসভ্যতার প্রতিনিধিত্বশীল সংস্কৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে যা আজ জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এ স্বীকৃতি আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার পাশাপাশি জাতি হিসেবে আমাদের অসাম্প্রদায়িক অবস্থানকে আরও সমুন্নত করবে, বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে আমরা অতীতের ব্যত্যয় এবং গ্লানি ভুলে জীবনের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে আশায় বুক বাঁধি। দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন করে শুরু হয় জীবনের জয়গান। পহেলা বৈশাখ তাই যুগ যুগ ধরে বাঙালির মননে মানসে শুধু বিনোদনের উৎস নয়, বৈষয়িক বিষয়েরও আধার।’

 

তিনি বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা প্রগতি এবং অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। বাংলাদেশ এখন আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশ্বের ‘রোলমডেল’। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিগত বছরটি ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রভূত সাফল্যময়। বাঙালির এই শাশ্বত সার্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য বাংলা নববর্ষ উৎসব ভাতা প্রবর্তন করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বাঙালি জাতি বর্ষবরণ উৎসবকে ধারণ করেছে তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে। বাংলা নববর্ষের উন্মেষ মূলত গ্রামীণ জীবন ঘিরে। হালখাতা উৎসব এবং গ্রামীণ মেলা ছিল এক সময় এর মূল আকর্ষণ। হালখাতা উৎসব কালক্রমে প্রবেশ করেছে নগর জীবনে। দেশের প্রতিটি শহরেই পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। রাজধানী ঢাকার ষাটের দশকের সংযোজন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, আজ জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

‘আসুন বাংলাদেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এবং সুখীসমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ।’

এছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা নববর্ষে মহামিলনের আনন্দ উৎসব থেকেই বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করবার আর কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করবার অনুপ্রেরণা পায় এবং জাতি হয় ঐক্যবদ্ধ।

তিনি বলেন, নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথ চলা। বুকভরা তেমনি প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি কাল আরও সোচ্চার হবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মৌলবাদ ও জঙ্গি নিধনের দাবিতে।

সারাবাংলা/এটি/এমআইএস

আরও পড়ুন..

আহীর ভৈরব রাগের আলাপে শুরু বৈশাখবরণ

স্বাগত ১৪২৫ রঙিন উদযাপনে

মঙ্গল আলোকে বিরাজও সত্য সুন্দরও (ভিডিও স্টোরি)

মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ ভার্স্কয শিল্পী শামীম

বেলজিয়ামে পহেলা বৈশাখ মাতাবেন পুতুল, রনি আর আশিক

বৈশাখের আগে নগর মাতিয়ে দিল চৈত্র সংক্রান্তি

ফসলি সন থেকে আজকের বৈশাখ

স্বাগত ১৪২৫ রঙিন উদযাপনে
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন