বিজ্ঞাপন

মেলা ও ফাল্গুনে বিদায়ের সুর

March 13, 2022 | 11:19 pm

আসাদ জামান

দুই দিন পরই বিদায় নেবে ফাল্গুন। সে কারণেই হয়তো বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনে ‘মোদের গরব’ ভাস্কর্যটি বেস্টন করে রাখা গাদা ও গোলাপ ফুলের ছোট্ট বাগানটি আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে হয়ে উঠেছে। গাঢ় হলুদ রঙের গাঁদা ফুলগুলো স্বমহিমায় ফুটে ওঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে যেন।

বিজ্ঞাপন

কেননা, ফাল্গুন শেষে চৈত্রে যখন শুরু হবে প্রচণ্ড তাপদহ অথবা বৈশাখে শুরু হবে কালবৈশাখীর ডানা ঝাপটানি, তখন আর ফুল ফোটানোর সাধ্য থাকবে না দুর্বল দেহের গাঁদা গাছগুলোর। অন্যদিকে গাঁদার তুলনায় গোলাপ কিছুটা শক্তপোক্ত হলেও সে তো আর নিজের জন্য ফোটে না। যাদের জন্য ফোটে, মেলা শেষেই বন্ধ হবে তাদের আনাগোনা। তাই মেলার ২৭তম দিনে এসে একটু ‘বেশি করেই’ ফুটেছে তারা।

ফুলেদের এই ‘বেশি করে’ ফোটার সুযোগটা হাতছাড়া করেননি মেলায় আসা লেখক, পাঠক ও দর্শনার্থীরা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানাংশে প্রবেশের আগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে যারা ঢুঁ মেরেছেন, তাদের প্রায় সবাই ভাষা শহিদ রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম ও বরকতের ম্যুরাল পেছনে রেখে ছবি-সেলফিতে মেতে উঠেছেন। নানা বয়সের নারী-পুরুষ নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলে এবারের বইমেলাকে স্মৃতির ফ্রেমে ধরে রাখার প্রয়াস চালিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

গতানুগিত বেচা-বিক্রির বাইরে আড্ডাবাজিরও ‘চমৎকার’ একটা আয়োজন অমর একুশে বইমেলা। এই আয়োজন কখনো সাহিত্যরসিক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের অংশগ্রহণে হয়ে ওঠে সার্থক, কখনো আবার নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার মানসে কিছু না জানা লোকের গলাবাজিতে হয়ে ওঠে অনর্থক।

মেলা ও ফাল্গুনে বিদায়ের সুর

বিজ্ঞাপন

দুই দশক আগে একখানা কাব্যগ্রন্থ রচনা করে মোটামুটি আলোচনায় আসা জনৈক কবি বাংলা একাডেমির পুকুরপারে বসে যখন বলেন— ‘জীবনানন্দ দাশ বড় কবি হলেও নজরুলের প্রভাবমুক্ত হতে পারেননি। তার অমুক কাব্যে, তমুক কাব্যে নজরুলের প্রভাব লক্ষণীয়। এ নিয়ে আমি বেশ বড় একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সেটি কলতার এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।’— অনতিদূরে দাঁড়িয়ে এমন আলোচনা শোনার পর ‘মোদের গরব’ ভাস্কর্য ঘিরে রাখা গাঁদা আর গোলাপ ফুলের মাদকতা মস্তিষ্ক থেকে উধাও হয়ে যায়। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া নূপুর পরা পায়ের শব্দও আর ভালো লাগে না। বর্ধমান হাউজের পাশে প্রাচীন শিরিশ গাছে কোকিলের ‘কুহু কুহু’ ডাক মালবাহী ট্রেনের হুইসেলের মতো মনে হয়!

কী আর করা! কবি আর কবিতার মাঝখানে ঢুকে ক্যাঁচাল বাঁধালে অমর একুশে বইমেলার মাহাত্ম্য নষ্ট হবে। আধো চেনা, আধো জানা কবির সঙ্গেও তৈরি হবে মনমালিন্য— এটা কিছুতেই কাম্য নয়। জীবনানন্দ দাশ যে বয়সে প্রস্থান করেছেন, সে বয়স তিনি (জনৈক কবি) আরও ১০ বছর আগে পার করে এসেছেন। তিনি আরও বাঁচুন, হয়ে উঠুন বাংলা সাহিত্যের আরেক জীবনানন্দ দাশ— এই তো চাওয়া।

বিজ্ঞাপন

মনখারাপ করা আড্ডাবাজির ছায়াতল থেকে সরে এসে মূল মঞ্চে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল ‘তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া: নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন দেলওয়ার হাসান, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন মোফাকখারুল ইকবাল, মো. মিনহাজ উদ্দীন এবং শেখ আদনান ফাহাদ। সভাপতিত্ব করছেন আবেদ খান।

মেলা ও ফাল্গুনে বিদায়ের সুর

বিজ্ঞাপন

প্রাবন্ধিক যখন বললেন— ‘উপমহাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এক অবিস্মরণীয় নাম। মানিক মিয়া ছিলেন এ দেশের সাংবাদিকতার দিকপাল এবং চল্লিশ-পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পূর্ববাংলার সংবাদপত্র জগতের পুরোধা মধ্যমণি এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। একজন ধীমান, নির্ভীক, সাহসী, সৎ এবং নিবেদিত সাংবাদিকতার সব গুণাবলিই তিনি অর্জন ও ধারণ করেছিলেন সহজ-অনায়াসে। সারাজীবন স্বদেশপ্রেম ও সংবাদ-সেবিতায় তার সুস্পষ্ট প্রয়াস এবং প্রতিফলন ছিল লক্ষণীয়।’— তখন মনে হলো আরেকটুক্ষণ থেকে যাই। কিন্তু একবার মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে মেলার অন্য অংশে আর যাওয়া হবে না। তাই মেলার সুনশান নীরব অংশ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে মোটামুটি কোলাহলপূর্ণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানাংশে যাত্রা।

মেলায় ‘লেখক বলছি অনুষ্ঠানে’ নিজের বই নিয়ে আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং নাদিরা মজুমদারের আলোচনা, কবি মুনা চৌধুরী, সোহাগ সিদ্দিকী এবং ফেরদৌসী কুঈনের স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তিশিল্পী বদরুল হুদা জেনু, মেহেদী হাসান আকাশ, লালটু হোসাইন এবং সামিয়া রহমান লিসার আবৃত্তি মেলায় আসা নন্দনপ্রিয় দর্শকের হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে।

মেলার মূল মঞ্চে নীহার দে আকাশের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুরের আলো সংগীত একাডেমী’র পরিবেশনাও ছিল চমৎকার। প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী কাদেরী কিবরিয়া, ফেরদৌস আরা, ইয়াকুব আলী খান, লুনা ফাতিমা, জয়ন্ত আচার্য্য, শিল্পী বিশ্বাস, রেজা রাজনের গানের সঙ্গে কাজী ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি), জুয়েল আল দ্বীন (কিবোর্ড) এবং দীপঙ্কর রায়ের (অক্টোপ্যাড) ঝংকার মেলায় প্রাণের সঞ্চার করে।

মেলা ও ফাল্গুনে বিদায়ের সুর

তবে সবচেয়ে সুখের বিষয় হলো— ছোট বড় আট/দশটি প্রকাশনীর স্টল ও প্যাভিলিয়নের ম্যানেজার ও বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেলায় ভিড় কমলেও বিক্রি বেড়েছে। যারা মেলায় আসছেন, তারা বই কেনার জন্যই আসছেন। নিজের পছন্দের বই তো বটেই, প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্যও বই কিনছেন কেউ কেউ।

সেলিনা হোসেনের ‘কথামালার নুড়িপাথর’, জয়দীপ দে’র ‘উদয়ের পথে’, আকবর আলীর খানের ‘পুরানো সেই দিন কথা’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ বইগুলো নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন বনশ্রী থেকে মেলায় আসা আরেফিন সোহাগ। বই কেনার অভিজ্ঞতা ও অনভূতির কথা জানতে চাইলে সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘মেলায় ভিড় থাকলে বই কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। সে দিকটা মাথায় রেখেই আজ মেলায় আসছি। কিছু বই কিনেছি নিজের জন্য। আর কিছু কিনেছি আমার স্ত্রীর জন্য।’

আবিষ্কার প্রকাশনীর বিক্রয় প্রতিনিধি তৈকির হোসেন খান রাতুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন বেচা-বিক্রি আগের থেকে ভালো। ভিড় কম, কিন্তু বিক্রি বেশি।’

ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রধান বিক্রয় প্রতিনিধি আবু ইউসুফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেলা তো আর মাত্র কয়েকটা দিন আছে। সে কারণে এখন যারা মেলায় আসছেন, তারা বই কেনার জন্যই আসছেন। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, প্রত্যেকের হাতেই দুয়েকটা করে বই আছে। এটি কিন্তু মেলার মাঝামাঝি সময় দেখা যেত না।’

সারাবাংলা/এজেড/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন