বিজ্ঞাপন

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা অমর একুশে বইমেলা

March 16, 2022 | 11:54 pm

আসাদ জামান

২ চৈত্র (১৬ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫ টা। রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউ গেট দিয়ে অমর একুশে বইমেলা প্রবেশের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রূপকথা’ কবিতার ‘প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ/ এ সংসারের নিত্যখেলায়/ প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়, বাটে ঘাটে হাজারলোকের হাস্য-পরিহাস/ মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ/ আমের বনে দোলা লাগে, মুকুল প’ড়ে ঝ’রে/ চিরকালের চেনা গন্ধ হাওয়ায় ওঠে ভ’রে/ মঞ্জরিত শাখায় শাখায়/ মৌমাছিদের পাখায় পাখায়/ ক্ষণে ক্ষণে বসন্তদিন ফেলেছে নিঃশ্বাস/ মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ’ পঙ্ক্তিগুলো অনুরণিত হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

ঠিক কী কারণে এই অনুরণন, তার পুঙ্ক্ষানুপুঙ্খু বিবরণ লিপিবদ্ধ করা কঠিন। কারণ, হৃদয়ে উত্থিত ভাবানুভূতির শৈল্পিক প্রকাশ কাব্যে যতটা সম্ভব, গদ্যে ততটা নয়। তবে এটুকু বলা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ ও হরফ স্থাপনা ছুঁয়ে রক্তিম সুর্যের লালাভা বইমেলার স্টল ও প্যাভিলিয়নে প্রহর শেষের আলোয় রাঙিয়ে দিচ্ছিল।

বুধবার (১৬ মার্চ) ছিল অমুর একুশে বইমেলার ৩০তম দিন। বৃহস্পতিবার মেলার পর্দা নামছে। শেষ হচ্ছে ৩১ দিনের দিনে সফল আয়োজন। সঙ্গত কারণেই বুধবার মেলায় লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিক্রিও ছিল বেশ।

বিজ্ঞাপন

কথা হয় তাম্রলিপি প্রকাশনীর বিক্রয় প্রতিনিধ মো. আবেদীন অভির সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আজ প্রচুর বই বিক্রি হচ্ছে। গতকালও বিক্রি ভালো ছিল।’

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা অমর একুশে বইমেলা

বিজ্ঞাপন

কোন ধরনের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে মানজেরিন শহিদের ‘সবার জন্য VOCABULARY’ ও ‘ঘরে বসে SPOKEN ENGLISH’ বই দু’টি দেখিয়ে এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘আমার হাত দিয়ে এই দু’টি বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি করেছি। ক্যারিয়ার সচেতন তরুণেরা এই বই দু’টি বেশি কিনছে।’

পুরো দুই ব্যাগ বই নিয়ে মেলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন হাবিবুর রহমান। ধানমন্ডি থেকে মেলায় আসা এই গার্মেন্টস কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘কাল যেহেতু মেলা শেষ হচ্ছে, তাই আজ শেষবারের মতো মেলায় এলাম। সপ্তাহে অন্তত একবার মেলায় আসি। পছন্দের বইগুলো কিনে নিয়ে যাই। আজও বেশ কয়েকটা বই কিনেছি।’

বিজ্ঞাপন

কী ধরনের বই কিনলেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মেলায় বেস্ট সেলর বইগুলো সংগ্রহ করা এবং পড়া আমার অভ্যাস। পত্রপত্রিকা ও অনলাইনে যে বইগুলোকে বেস্ট সেলর হিসেবে প্রেজেন্ট করা হয়, সেগুলোই কিনি। কিন্তু ‘বেস্ট সেলর’ বই আর ‘বেস্ট বই’ সব সময় একরকম হয় না। তারপরও কিনি, পড়ি এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি।”

হাবিবুর রহমানের দু’টি ব্যাগের একটিতে ছিল রাসেল এ কাউসারের ‘সেল মি দিস পোন’, ড. রাম লক্ষণ প্রসাদের ‘মোটিভেটিং দ্য আনমোটিভেটেড’, মাহমুদুল হাসান নিজামীর ‘নারীতত্ত্ব ও নারীর মন বিখ্যাত নারীদের বহুগামী জীবন’, সাজিয়া জাহান সিনহার ‘বেইন গেইম’ বইগুলো। ব্যাস্ততার কারণে অন্য ব্যাগটি দেখার সুযোগ হয়নি।

বিজ্ঞাপন

শেষ সময়ে বই বিক্রি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। মিশ্র প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। আগামী প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ওসমান গণি বলেন, ‘মেলায় অনেক বই বের হয়েছে। বইয়ের সংখ্যার চেয়ে মানের দিকে নজর বাড়াতে হবে। তবেই বইমেলা পরিপূর্ণ হবে।’

অপেক্ষাকৃত নতুন প্রকাশনীও কিছু ভালো বই এনেছে এবারের বইমেলায়। বিক্রিও হয়েছে মোটামুটি। কথা হয় বাংলানামা প্রকাশনীর বিক্রয়প্রতিনিধির সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এবারের বইমেলায় আমাদের প্রায় ৩০টির মতো বই বেরিয়েছে। দুই/তিনটা বই এখনো আসেনি। ২৭/২৮টি বই অলরেডি চলে আসছে।’

কোন বইটি বেশি বিক্রি হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসিফ মো. নজরুলের ক্ষমা করে দিও বইটি বেশি বিক্রি হয়েছে।’

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা অমর একুশে বইমেলা

সর্বাধিক মানসম্মত প্রন্থ প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী

বইমেলায় প্রকাশকদের মধ্যে সব সময় একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলে। কারণ, ভালো বইয়ের জন্য প্রকাশনীকে এবং নান্দনিক অঙ্গসজ্জার জন্য প্যাভিলিয়ন ও স্টলকে পুরস্কার দেওয়া হয়। বুধবার বসেছিল সেই পুরস্কার ঘোষণার আসর। এতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন। এবার মানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য আগামী প্রকাশনী পেয়েছে চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২২।

শৈল্পিক ও গুণমান বিচারে সেরা গ্রন্থ বিভাগে আবুল হাসনাত সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ স্মারক প্রকাশের জন্য বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, জালাল ফিরোজ রচিত ‘লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর একদিন’ গ্রন্থের জন্য জার্নিম্যান বুক্স-কে এবং সৈয়দ আবুল মকসুদ রচিত ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময়’ গ্রন্থের জন্য প্রথমা প্রকাশন-কে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২২ প্রদান করা হয়। এছাড়া শিশুতোষ গ্রন্থের জন্য কথাপ্রকাশ-কে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০২২ প্রদান করা হয়।

বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নবান্ন প্রকাশনী, নিমফিয়া পাবলিকেশন এবং পাঠক সমাবেশ-কে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার-২০২২ প্রদান করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৭ মার্চ) সমাপনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কাপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

বুধবার বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘শহিদ জননী জাহানারা ইমাম: আমৃত্যু সংগ্রামী এক মহাপ্রাণ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তপন পালিত। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাবিহা পারভীন, জয়দুল হোসেন এবং আহমেদ আহসানুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়কে জাহানারা ইমাম নিজের চেতনায় ধারণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, তেমনি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সংগঠিত করার জন্য আজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সর্বোপরি তিনি বাংলাদেশের বিজয়ের প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।’

প্রহর শেষের আলোয় রাঙা অমর একুশে বইমেলা

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মিনার মনসুর এবং সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি ইউসুফ রেজা, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, মাহবুবা লাকী, বাপ্পী রহমান এবং লুৎফর চৌধুরী। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এবং রূপা চক্রবর্তী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল মো. মোশাররফ হোসেনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দৃষ্টি’, মো. সুজাতুল আলমের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আদি গম্ভীরা দল’র পরিবেশনা। নৃত্য পরিবেশন করেন কবিরুল ইসলাম রতন। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আশরাফ মাহমুদ, অমিয় বাউল, মুন্নী কাদের, রত্না সরকার, সাধিকা সৃজনী তানিয়া, জান্নাত-ই-ফেরদৌসী, শাহীনা আক্তার পাপিয়া, শামীমা নাসরিন চমন।

বুধবার বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৭৭টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে প্রত্যয় প্রকাশন প্রকাশ করেছে অমর মিত্রের উপন্যাস ‘ধ্রুবপুত্র (প্রথম খণ্ড)’, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘ঝর্ণাধারার সঙ্গীত’, ফারুক নওয়াজের কাব্যগ্রন্থ ‘হারিয়ে যাওয়া হয় না আমার’ ও আহসান হাবীরের উপন্যাস ‘এক এবং একা’, কথাপ্রকাশ প্রকাশ করেছে মুস্তাফিজ শফির উপন্যাস ‘স্পর্শ’, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে মুনতাসীর মামুনের ইতিহাসবিষয়ক বই ‘ইতিহাস হত্যা এবং পাঠক্রম ও পাঠ্যবই (১৯৪৯-২০২০)’, জার্নিম্যান বুক্স প্রকাশ করেছে তারিক সুজাতের বঙ্গবন্ধুবিষয়ক ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : কমেট বিমান ও ব্রিটিশ গোপন দলিল’, পাঠক সমাবেশ প্রকাশ করেছে মুহম্মদ নূরুল হুদার গীতিকবিতা ‘সীতা সংহিতা’, ছোটদের বই প্রকাশ করেছে হাসান হাফিজের জীবনী ‘বিশ্বসেরা ১২ বিজ্ঞানী’।

সারাবাংলা/এজেড/পিটিএম

বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন