বিজ্ঞাপন

শ্রমবাজারের এক-তৃতীয়াংশ নারী, উদ্যোক্তা মাত্র ১২ শতাংশ

March 27, 2022 | 7:59 pm

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: দেশের শ্রমবাজারে ৩৬ শতাংশ বা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী অংশ নিলেও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন মাত্র ১২ শতাংশ নারী। এতে শ্রমবাজারে নেতৃত্বস্থানীয় পদে নারীর উপস্থিতি নামমাত্র।

বিজ্ঞাপন

ইনোভিশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশ মিরাকল সিজন-২’-এর দ্বিতীয় পর্বে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারজানা নাহিদ এ কথা বলেন।

বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) অনুষ্ঠিত এই ওয়েবিনারের থিমেটিক পার্টনার ছিল বহ্নিশিখা, বিষয় ছিল ‘প্রতিকূলতা পেরিয়ে নারী নেতৃত্বের যাত্রা’।

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় যুক্ত হয়ে শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও অধিকারকর্মীরা বলেন, দেশে যত মেয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হয় বা যত মেয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে, সে অনুযায়ী নেতৃত্বের স্থানে নারীদের উপস্থিতি সীমিত। কিছু ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর উপস্থিতির তুলনায় উচ্চ পর্যায়ে তিন শতাংশ পর্যন্ত কম। পরিস্থিতি বদলাতে দেশব্যাপী ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মেয়েদের মধ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান তারা।

আলোচনায় ড. ফারজানা নাহিদ বলেন, নারীর ভূমিকা ও সব লিঙ্গের অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ বেশ উন্নতি করেছে। বেড়েছে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ। সরকারি নিয়মনীতি ও করপোরেট ব্যবসা বেড়ে যাওয়ার কারণে নারীর ভূমিকাও বদলেছে। সব মিলিয়ে সবক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কেবল আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত নারীর সংখ্যাই বাড়েনি, নারীরা এখন অন্য নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে পারছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, দেশে নারী ও শিশু বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় আছে, যা নারীর জন্য আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। পারিবারিক নির্যাতনবিরোধী আইন হয়েছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

শ্রমবাজারের এক-তৃতীয়াংশ নারী, উদ্যোক্তা মাত্র ১২ শতাংশ

বিজ্ঞাপন

তবে পরিস্থিতি কিছুটা বদলালেও সেটিকে যথেষ্ট মনে করছেন না ড. ফারজানা নাহিদ। তিনি বলেন, জেন্ডার সমতা এখনো অনুপস্থিত। অনানুষ্ঠানিক খাতে নারীর উপস্থিতি নামমাত্র। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নারীর জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি না করে বরং অনেক চাকরি ছিনিয়ে নিয়েছে। অনেক নারীই কেবল কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, ঘরে নয়। এর পেছনে কারণ প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, ইন্টারনেটে ব্যবহারের সুযোগের অভাব ইত্যাদি। কিছু সামাজিক কারণও রয়েছে। অনেক মেয়েকেই মাতৃত্ব ও চাকরির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবেও মেয়েরা অনেকসময় অনেক কিছু করতে পারে না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রের সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। এছাড়াও জেন্ডার অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে মাইক্রো ও ম্যাক্রো ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

উইমেন উইথ ডিজ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার নারীদের নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তাদের শিক্ষা ও চাকরি-বাকরি নিয়েও কোনো তথ্য নাই। এমনকি এসব নারীদের অবস্থা বদলানোর জন্য নীতিমালা, ইন্টারভেনশন বা আন্দোলনও তেমন একটা চোখে পড়ে না।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, এক শতাংশেরও কম শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার মেয়েরা অনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পায়। শিক্ষা ছাড়া শ্রমবাজারে নিজেদের জন্য কোনো জায়গা তারা তৈরি করতে পারবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এরই মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার নারী ও পুরুষ অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু শ্রমবাজারে এর সংখ্যা খুবই সীমিত। এছাড়াও সমাজে এমন নারীদের নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় মেয়েরাও নিজেদের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলতে চায় না।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার মেয়েদের অবস্থা বদলানোর জন্য বিশেষ উদ্যোগ ও সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন আশরাফুন্নাহার মিষ্টি। তিনি বলেন, এ ধরনের মেয়েরা কীভাবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেতে পারে, সেটি নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে তাদেরকে কর্মক্ষম হিসেবে তৈরি করে তাদের উপযোগী কর্মক্ষেত্রে তৈরিতে।

বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা তাসাফি হোসেন বলেন, পুরুষের ক্ষেত্রে আমরা কাজকে দায়িত্ব বা বোঝা হিসেবে মনে করি। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে একে অতিরিক্ত প্রাপ্তি হিসেবে মনে করা হয়। আমরা কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়া মেয়েদের সম্পর্কে ভাবি, তারা একঘেয়েমি দূর করতে চাকরি করতে আসে। মনে করা হয়, মেয়েরা শ্রোতা হিসেবে ভালো। তাই তাদের হাতে লিখে করা যায়, এমন কাজেই উৎসাহ দেওয়া হয়। বেশিরভাগ মেয়েকেই তাই অ্যাকাউন্টিং বিভাগে কাজ করতে দেখা যায়।

কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের জেন্ডার বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, মেয়েদের ফিল্ড ওয়ার্কে পাঠানো হয় না। প্রকৌশলী মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের অফিসে বসে মার্কেটিং বা সেলসের কাজ করতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে মূল্যায়নের সময় বলা হয়, তারা প্রকৌশলী হিসেবে প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট কাজ করছে না। ফলে তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।

তাসাফি হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই মনে করে ছেলে কর্মীদের দিয়ে কাজ করা বেশি নিরাপদ। নীতিমালা একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত কাজ করলেও সেটি আমাদের মানসিক অবস্থা ও পক্ষপাত দূর করতে পারেনি।

মিজেল হোজাল-এর স্বত্বাধিকারী তরী চাকমা বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠির নারীদের পর্যাপ্ত তথ্য বা ডেটা নাই। তাই তাদের প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, সেরকম কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ পাহাড়ি নারীদের নিজের সম্প্রদায়ের ভেতরেই শুধু নয়, বাইরেও নানারকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। তারা কোনো ব্যবসা করতে গেলে সবার আগে পরিবার থেকে বাধা আসে। কারণ, ধরেই নেওয়া হয় যে শিক্ষিত মেয়েরা চাকরি করবে, ব্যবসা নয়। তাদের বিশ্বাস, মেয়েরা ব্যবসা করতে পারবে না। ব্যবসায় ছেলেরা টিকে গেলেও মেয়েরা পারবে না। অনেকে ভাবে, নিজের সম্প্রদায়ের বাইরে ব্যবসা করতে যাওয়া অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। আবার মাঠে কাজ করতে যাওয়া পাহাড়ি নারীদেরকেও সহজে আঘাত করা যায় বলে ভাবা হয়।

সরকারি নীতিমালা বিশ্বাসযোগ্য নয়— এমন অভিযোগ করে তরী চাকমা বলেন, তারা আদিবাসী সম্প্রদায়কে যুক্ত করতে চায়। কিন্তু কোনো উদ্যোগে তারা যুক্ত হলে তাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা হয়। আদিবাসী মেয়েদের কেবল নিজস্ব সম্প্রদায়ের পোশাক পরতে বলা হয়, যেন তাদের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়। এভাবে তাদের আদিবাসী সত্ত্বা হুমকির মুখে পড়েছে।

চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) মাইক্রোবায়োলজিস্ট অ্যান্ড সাইন্স কমিউনিকেটর নাজিফা তাবাসসুম বলেন, পরিসংখ্যান বলছে— মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে মেয়েরা ভালো করলেও পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত) তাদের উপস্থিতি কম। এমনকি রসায়ন বিভাগে প্রতি তিন জন ছেলের বিপরীতে মেয়ের সংখ্যা এক। শিক্ষা খাতে ৩৬ শতাংশ নারী থাকলেও উচ্চ পদে যেতে যেতে মেয়েদের সংখ্যা কমতে থাকে।

দুই দশক আগের তুলনায় অবশ্য এখন নারী বিজ্ঞানীদের গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনা হয় বলে জানান নাজিফা। বলেন, এখন তাদের অবদান তুলে ধরা হয় আগের তুলনায় বেশি। তবে এক্ষেত্রেও প্রারম্ভিক পর্যায়ে মেয়েদের উপস্থিতি যতটা দেখা যায়, ওপরের দিকে ততটা দেখা যায় না। এর অন্যতম কারণ মেয়েদের প্রতি সমাজের মনোভাব, যেখানে মনে করা হয়— মেয়েরা কেবল ঘরে থেকে সন্তান পালন করবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন নাজিফা তাবাসসুম। বলেন, মেয়েদের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু এখানেও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক খাতে তাদের আগ্রহ কম। এমনকি গ্রাম পর্যায়ের অনেক মেয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হতে চাইলেও কেউ বিজ্ঞানী হতে চায় না। তাই মেয়েদের বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। যত বেশিসম্ভব স্থানীয় বিজ্ঞানীদের এসব কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হবে। মেয়েদের বোঝাতে হবে, বিজ্ঞান কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, এটি প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সারাবাংলা/আরএফ/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন