বিজ্ঞাপন

ডাঃ আবদুল আলীম: চোখের আলো ফেরানো মৃত্যুঞ্জয়ী

April 2, 2022 | 2:49 pm

রহমান রা'আদ

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ, ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানী সেনারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমপর্ণ করেছে, শত্রুমুক্ত আলো-হাওয়ায় নতুন প্রাণসঞ্চার হয়েছে যেন, নয় মাসের অবরুদ্ধ শহর-গ্রামের হাজারো মানুষেরা বেরিয়ে এসেছে, রাস্তায় রাস্তায় হাতে হাতে নতুন পতাকায় বিজয় মিছিল যাচ্ছে একের পর এক। ঢাকার রাস্তায় মিছিল দেখলেই ছুটে যাচ্ছেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ছুটে যাচ্ছেন শম্পা, নীপা, ছুটে যাচ্ছেন হাফিজ। মিছিলের মুখগুলোতে তারা খুঁজে ফিরছেন খুব প্রিয় আর চেনা এক মুখ, যিনি একাত্তরের নয় মাস জুড়ে চালিয়ে গেছেন এক ব্যাতিক্রমী যুদ্ধ, চোখের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত মানুষটা ফিরিয়ে দিয়েছেন অনেকের চোখের আলো। আশ্রয় দিয়ে, খাবার দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের যুগিয়ে গেছেন অসামান্য অনুপ্রেরণা। যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন পাকিস্তানীদের পরাজিত করে জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনবোই আমরা। শ্যামলী নাসরিনের স্বামী, হাফিজের বড়ভাই এবং শম্পা-নীপা প্রিয় বাবা, অজস্রজনের প্রিয় চিকিৎসক, প্রিয় মানুষ প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এ এফ এম আবদুল আলীমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও!

বিজ্ঞাপন

তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল আলবদর জল্লাদেরা তার আগের দিন বিকেলে। পুরোনো পল্টনের দোতলা বাসার দোতলার বারান্দায় স্ত্রী ও শ্বাশুড়িকে নিয়ে বসেছিলেন আলীম চৌধুরী। শহরে কারফিউ জারি হয়েছে, ভারতীয় বোমারু বিমানগুলো অহর্নিশ চক্করে বোমা ফেলছে পলায়নপর পাকিস্তানীদের অবস্থান লক্ষ্য করে। সারা আকাশে তোলপাড় তোলা ভারতীয় বিমানের ছোটাছূটি দেখতে দেখতে আনন্দে-উত্তেজনায় আপ্লুত আলীম বলছিলেন, ‘এদেশের পাকিস্তানীরা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ভারতীয় বিমানগুলোকে বাধা দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই। দেখো, দেখো, বিমানগুলো ইচ্ছেমতো বোমা ফেলছে। আর এখনও মাওলানা মান্নানের মতো পাকিস্তানীরা বলে কিনা আমেরিকা তাদের রক্ষা করবে। সপ্তম নৌবহর নাকি এসেছে।’ বলেই প্রাণখুলে হাসেন তিনি। অনিশ্চয়তা-আশংকার ঘোর আঁধারে প্রাণখুলে হাসতে পারেনি কেউই। আজ নিশ্চিন্তে হাসতে হাসতেই বলেন আলীম, ‘দেখো, আর দু-এক দিনের মধ্যেই আমরা স্বাধীন হয়ে যাব।’

বলতে বলতেই কাদালেপা একটা ছোটখাটো মাইক্রোবাস এসে নিচতলায় মাওলানা মান্নানের দরজার সামনে দাঁড়ায়। তার ঠিক ৪৫ মিনিট পর তাদের সিঁড়ির নীচের দরজায় বেল বাজলো। আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী ওপর থেকেই দেখলেন, বন্দুক উঁচিয়ে দুজন আলবদর দরজা খুলতে বলছে। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না শ্যামলী। স্বামীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করব?’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলীম বললেন, ‘খুলে দাও।’ বলেই তিনি নিচের তলায় মাওলানা মান্নানের কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। শ্যামলী জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘মাওলানা সাহেবের কাছে। তিনি তো কোনো অসুবিধা হলেই যেতে বলেছেন।’

বিজ্ঞাপন

শ্যামলী নাসরিন বোধহয় আজো আফসোস করেন সেদিন বাধা না দেবার জন্য। কারণ সেই যে নেমে গেলেন আবদুল আলীম, তাকে আর দেখেননি শ্যামলী। মাওলানা মান্নান বারবার বলতো, আলীমের উপরকার সে কখনো ভুলবে না, তার কোন বিপদ বা সমস্যা হবে না, যে কোন সমস্যায় স্রেফ তাকে জানালেই মান্নান সর্বোচ্চ সহায়তা করবে। অথচ সেদিন বিকেলে যখন আলীম সিড়ি দিয়ে নেমে মান্নানের দরজায় টোকা দিলেন, ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিল না। মাওলানা সাহেব, দরজাটা খুলুন বলে প্রাণপণে দরজায় আঘাত করছেন আলীম, কিন্তু ওপাশ থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। অনেকক্ষণ করাঘাত আর ডাকাডাকির পরে শুধু ভেতর থেকে একবার জবাব এলো, ‘ভয় পাবেন না। আপনি যান। আমি আছি।’

মাওলানা মান্নানের সেই বের না হওয়া এবং শীতল গলার স্বর শুনেই যা বোঝার বুঝে ফেলেছিলেন আলীম। ততক্ষণে বন্দুকধারী আলবদরেরা বাড়ির ভেতরে ঢূকে গেছে। আলীম দৌড়ে উপরে নিজের ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন, বাসার কাজের ছেলে হাকিম ও মোমিন দরজাও খুলে দিয়েছিল, কিন্তু তার আর ভেতরে ঢোকা হয়নি। আলবদর জল্লাদেরা পেছন পেছন ছুটে এসে তার দিকে বন্দুক তাক করে বলল, ‘হ্যান্ডস আপ! আপনি আমাদের সাথে চলুন।’ আলীম কাপড়চোপড়টা বদলে আসার ছুতোয় শেষবারের মত স্ত্রী-কন্যাদের বিদায় জানিয়ে আসতে চেয়েছিলেন বোধহয়, কিন্তু সে সুযোগও তাকে দেয়া হলো না। মুখোশধারী আলবদরেরা যদিও বলছিল যে, জরুরি কাজ আছে, কিন্তু তাদের উঁচিয়ে ধরা বন্দুক আর শান্তস্বরে প্রচ্ছন্ন হুমকিই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, আর হয়তো ফিরে আসা হবে না।

বিজ্ঞাপন

আলীমকে নিয়ে বন্দুকধারীরা গেটের বাইরে যেতেই দৌড়ে দোতলায় ওঠে এল হাকিম আর মোমিন। শ্যামলীকে জানালো আলীমকে নিয়ে যাবার কথা। কথাটা শুনেই উদ্ভ্রান্ত শ্যামলী ছুটে এলেন নীচে, এতোদিন ধরে মাওলানা মান্নানের সাথে কোন কথা বলেননি তিনি, কিন্তু উপায়ান্তর দেখে আঘাত করতে শুরু করলেন মান্নানের দরজায়, আলীমের ডাকাডাকিতে সাড়া না দিলেও এবার সাড়া দিল মান্নান, দরজা খুলে দেখে নিল আলবদরেরা আলীমকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে কিনা। কাতরস্বরে অনুনয় করে বললেন শ্যামলী মান্নানকেঃ ‘মাওলানা সাহেব, গাড়িটা এখনও ছাড়েনি। আপনি একটু দেখুন। দয়া করে ওদের বলুন, ওকে যাতে ওরা ছেড়ে দেয়।’

কিন্তু মাওলানার সে অনুনয়ে কর্ণপাত করবার সময় কোথায়? যেন শ্যামলীর আঙ্গুলের ফাঁক গলে পেরিয়ে গেল সিঁড়ি থেকে বাড়ির বাইরে কাদালেপা সাদা মাইক্রো পর্যন্ত আলীমকে ধরে নিয়ে যাবার এই মহামূল্য মুহুর্তগুলো, যেন শ্যামলীর আঙ্গুলের ফাঁক গলে হারিয়ে গেলেন আলীম চিরতরে। স্বামীর জন্য শত অনুনয়েও মূর্তির মত নিষ্প্রাণ বসে থাকা মান্নান শুধু কান খাড়া করে ছিল বাইরের দিকে, অপেক্ষা কখন আলীমকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে সে সচল হলো মাইক্রোবাস ছাড়বার শব্দে। আর কান্না ধরে রাখতে পারলেন না শ্যামলী, তার আহাজারির মধ্যেই মেকি সান্ত্বনায় মান্নান বলল, ‘অস্থির হবেন না। ওরা আমার ছাত্র। ওরাই ওনাকে নিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তার রাব্বিকেও নিয়ে গেছে।’

বিজ্ঞাপন

ডাক্তার ফজলে রাব্বিকেও ধরে নিয়ে গেছে ওরা শুনে যেন পায়ের তলের মাটি সরে গেল শ্যামলীর। মাওলানা মান্নান জানালো, তাদের নাকি সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে চিকিৎসার কাজে, আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। শুনে কিছুটা নিশ্চিত হলেও মিসেস রাব্বির কান্নাজড়িত আহাজারি শুনে আবার অস্থির হয়ে ওঠেন শ্যামলী। ডাক্তার রাব্বিকে বিকেল চারটার দিকে এক প্রকার জোর করে তুলে নিয়ে গেছে ওরা। কিন্তু মাওলানা মান্নান সেই একই রেকর্ড বাজাতে থাকলো। মেজর কাইয়ুমের সাথে নাকি তার কথা হয়েছে, সিএমএইচে চিকিৎসার কাজে নিয়ে গেছে তাদের, ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। যতই নিশ্চয়তা দিক না কেন মান্নান, নিশ্চিত হতে পারেন না শ্যামলী। আলীমকে চিরতরে হারিয়ে ফেললেন কিনা সেটা ভাবতে ভাবতেই বোধহয় তার প্রবল আফসোস হয় মান্নানের পরিবারকে এ বাসায় আশ্রয় দেবার ভুলের জন্য। যদিও তারা তখন জানতেন না যে মাওলানা মান্নান আলবদর জল্লাদদের অন্যতম কুশীলব, তবুও নিজেকে যেন ক্ষমা করতে পারেন না তিনি। অথচ প্রথমে কিন্তু মানাই করেছিলেন তিনি, কি হত যদি আলীম অতটা ভালোমানুষী না দেখাতো! কি ক্ষতি হয়ে যেত এমন!

একাত্তরের কিছু আগে আজিমপুরের বাসা ছেড়ে পরিবারসহ তিন তলা বাড়িতে এসে উঠেছিলেন আলীম চৌধুরী। নীচের তলায় ছিল ক্লিনিক, যুদ্ধ শুরু করার পরেই আলীম ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। জুলাই মাসের মাঝামাঝি একদিন সকাল দশটার দিকে বৃষ্টির ভেতর প্রতিবেশী পিডিপির মতিন পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাওলানা মান্নানকে নিয়ে আসেন আলীমের কাছে। মতিন বলেন, মান্নানের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে কে বা কারা, পরিবার নিয়ে নিতান্তই বিপদের মুখে পড়েছেন তিনি, মাথার উপর একটা আশ্রয় দরকার। সব শুনে আলীম উপরে এসে শ্যামলীকে বললেন সব, কিন্তু শ্যামলী আশ্রয় দেবার ব্যাপারে শুরুতেই ‘না’ করে দিলেন। তার শক্ত ‘না’ শুনে আলীম মানা করে দিতে নামলেন নীচে, কিন্তু মান্নান, মতিনের কাকুতিমিনতি শুনে বাধ্য হয়ে আবার উপরে এসে তার মাকে বললেন শ্যামলীকে রাজি করাতে। শ্বাশুড়ীর অনুরোধে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিমরাজি হতে হলো শ্যামলীকে।

বিজ্ঞাপন

কেন সেদিন রাজি হয়েছিলেন শ্যামলী, সে আক্ষেপে আর আফসোসে ক্ষণে ক্ষণে পুড়তে হচ্ছে তাকে। কারণ অনুমতি পেয়ে স্ত্রী-পুত্রসহ মান্নান তাদের বাড়ির নীচতলায় ক্লিনিকের জায়গায় এসে ওঠার দিন দশেকের পর থেকেই চিরতরে পাল্টে গেল সব। প্রথম কয়েকদিন অসহায় পরিবার ভেবে মান্নানের পরিবারকে তিনবেলা খাবার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ সহায়তা করলেন আলীম আর শ্যামলী, কিন্তু সপ্তাহ পার হতে না হতেই দেখেন মান্নানের ঘরগুলো নানা আসবাবপত্রে ভরে উঠছে। সব পুড়িয়ে দিলে তো নিঃস্ব হয়ে যাবার কথা, সেখানে এতো দামী দামী জিনিসপত্র পাচ্ছে কোথায় মান্নানের পরিবার? দশ-বারোদিনের মাথায় জানা গেল নিজের হাতে খাল কেটে হাঙ্গর এনেছেন আলীম, মান্নান আসলে আলবদর বাহিনীর অন্যতম সংগঠক, স্বাধীনতাবিরোধী প্রধান কুশীলবদের একজন। তার ঘরবাড়ি আসলে জ্বালিয়ে দিয়েছিল মুক্তিবাহিনী।

পরিবার নিয়ে অসম্ভব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়া আলীম চুপিসারে সরে যাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। বাড়িও খুঁজছিলেন, কিন্তু সুযোগ হচ্ছিল না। একেবারেই না হলে পালিয়ে যাবার কথাও ভাবছিলেন তারা। কারণ ততদিনে বাড়ির নীচতলাটা পুরোপুরি চলে গেছে দেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকিস্তানী সেনাদের দখলে, সর্বক্ষণ তারা আসছে যাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ চলছে নিয়মিত। এরমধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটা চিঠি এল মান্নানের কাছে। চিঠিতে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে: আলীম ভাই ওপরে না থাকলে তোকে কবেই বোমা মেরে উড়িয়ে দিতাম।

এরপর থেকেই আলীম চৌধুরীর বাসার নিচ তলার সিঁড়ি দরজার বাইরে দুজন আলবদর দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারা বসানো হল। ব্যাপারটা যাতে আলীমের পরিবার না বুঝতে পারে সেজন্য মান্নানের গেটেও পাহারায় ছিল আরও চার-পাঁচজন। মনে মনে দুরভিসন্ধি থাকলেও মুখে সবসময় আলীম চৌধুরীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে মান্নান। দেখা হলেই বলে, ‘ডাক্তার সাহেব, আপনার উপকার আমি জীবনে ভুলব না। আপনার কোনো ভয় নাই। আপনার কোনো বিপদ হবে না। যদি কখনো কোনো অসুবিধায় পড়েন, সোজা আমার কাছে চলে আসবেন। আমি আপনাকে রক্ষা করব। আমার জীবন থাকতে আপনার কোনো ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।‘

আহা! উদার হৃদয়ের আলীম, মানুষের কল্যাণের জন্য, উপকারের জন্য সদা ছুটে চলা মানুষটা অসহায় অবস্থায় দেখে যে ধর্মের লেবাসে ঢাকা মাওলানা মান্নানকে সপরিবারে আশ্রয় দিলেন, সেই মান্নানই ঠান্ডা মাথায় বেইমানি করল, তাকে ধরিয়ে দিল জল্লাদদের হাতে, যেন তাকে চিরতরে শেষ করে দেয়া যায়। অথচ সারাজীবন মানুষের উপকার ব্যাতীত ক্ষতি করবার কথা কখনো কল্পনাও করেননি আলীম। মুটে, মজুর, দারোয়ান, শ্রমিক জেলে এবং দরিদ্র রোগীর কাছ টাকা-পয়সা কখনো নেননি। বরং তাদের চোখে ছোটবড় অপারেশন করতেন বিনা পারিশ্রমিকে। তিনি বলতেন, ‘ওদের ভাতই জোটে না, তার ওপর আবার ১৬ টাকা ভিজিট!

১৯৭০ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের ত্রয়োদশ পুনর্মিলনী উৎসবে সাবেক সভাপতি হিসেবে প্রদত্ত ভাষণ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এই শহিদ বুদ্ধিজীবী চিকিৎসকের আদর্শনিষ্ঠ জীবন লক্ষ্যের পরিচয়টি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শুধু সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি এবং সমাধান সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছি। তরুণ বন্ধুরা যদি সমস্যাগুলো বুঝবার চেষ্টা করেন এবং সমাধান সম্পর্কে চিন্তা করেন, তা হলেই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে। সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমি বিশ্বাস করি সমাজ পরিবর্তনের যে জোয়ার এসেছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অজস্র নতুন প্রাণ একে ত্বরান্বিত করবে। আজকের এই উৎসবমুখর দিনে, আসুন আমরা দুঃস্থ মানবতার সেবার আত্মোৎসর্গ করি ও সংকল্প গ্রহণ করি যে, আমরা এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা কায়েম করবো, যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা এনে দেবে। আমরা ছাত্রজীবনে দুস্থ মানবতার সেবা করার যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, গণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তবায়নের মাধ্যমে যে স্বপ্ন সার্থক হোক’।

একাত্তরের পুরো সময়টায় কারফিউ উঠে গেলে শুরু হত আলীমের যুদ্ধ। গাড়ির বনেট ভর্তি করে ওষুধ সংগ্রহ করতেন বিভিন্ন ফার্মেসি আর ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে। এগুলো আবার মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ঘাঁটিতে পৌঁছে দিয়ে আসতেন তিনি। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার জন্য একটি গোপন হাসপাতাল ছিল। সেখানে গিয়ে ডা. আলীম, ডা. ফজলে রাব্বি এবং এদের মতো আরও অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তারেরা নিজের এবং তাদের পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। সুস্থ করে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে। ডা. আলীমের মৃত্যুর পর একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেছিল, “আলীম ভাইয়ের দেয়া আমার চোখের ব্যান্ডজটি এখানও আছে। কিন্তু আলীম ভাই নেই। আলীম ভাইকে কোথায় হারালাম?”

নিজের জীবন দিয়ে পরোপকারী মহত্বের দাম চুকিয়ে গেলেন আলীম। ১৫ ডিসেম্বর রাতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এলেন আলীমের খবর জানতে। আলীমকে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে তারা এসেছেন। তারা জানতে চাইলেন, মাওলানা মান্নান কোথায়? রাত থেকে মান্নানের কোনো খবর রাখেননি শ্যামলী। পরিস্থিতি দেখে তাদের খাবার ঘরে এসে লুকিয়েছিল মান্নান। কিন্তু মান্নান যে কখন পালিয়েছে তা তিনি খেয়ালই করেননি। মান্নানকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে গেল মুক্তিযোদ্ধারা। বিজয়ের ১৬ তারিখ পুরো দিনটি কাটল অপেক্ষায়। কিন্তু পরদিন যে খবর এলো, আশংকা থাকলেও সেটির জন্য যেন প্রস্তুত ছিলেন না শ্যামলী। হাফিজ গাড়ী নিয়ে এসেছিলেন, তার ভাইকে খোঁজ জানার জন্য মাওলানা মান্নানকে খুঁজতে বের হলেন সবাই। আজিমপুরের এক বাসায় পাওয়া গেল মাওলানা মান্নানকে, লোকজন তাকে পিটিয়ে মেরেই ফেলতে চাচ্ছিল। হাফিজ ভাবলেন, মেরে ফেললে অনেককিছু অজানা থেকে যাবে। সব খোঁজখবর জেনে নিয়ে পরে মারতে হবে। মান্নানকে তিনি রমনা থানায় সোপর্দ করলেন। আফসোস, সেই মান্নান পরে ছাড়া পেয়ে গেল।

১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। রায়ের বাজারের ইটখোলার বধ্যভূমিতে অনেক মৃতদেহর সন্ধান মিলেছে। লোকজন সেখানে খুঁজছে তাঁদের হারানো স্বজনের মৃতদেহ। হাফিজও ভাইকে খুঁজতে গিয়েছিলেন সেখানে। অজস্র লাশের ভিড়ে ভাইকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না হাফিজ, হঠাৎ গায়ে শার্ট ও লুঙ্গি পরা উবু হয়ে পড়ে থাকা একটা মৃতদেহ দেখে এরশাদ ডাকলেন হাফিজকে। আলবদররা ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আলীমের পরনে ছিল শার্ট আর লুঙ্গি।

শার্টটি গায়েই ছিল। পরনের লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপরে উঠে আছে। হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। চোখ বাঁধার গামছাটা গলায় এসে ঠেকেছে। ছড়ানো ছিটানো ইটের ওপর মৃতদেহটি পড়ে আছে। চারপাশে শুকিয়ে আসা ছোপ ছোপ রক্ত। কাছে গিয়ে মৃতদেহর মুখের দিকটি তুলে ধরলেন হাফিজ। আর কোনো সন্দেহ রইল না। এটাই তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাই। বুকটা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তলপেট ও কপালের বাঁ দিকে বেয়োনেটের আঘাতের চিহ্ন। তাকিয়ে দেখা যায় না, সহ্য করা যায় না বেশিক্ষণ।

আজ ৫০ বছর পরেও শহীদ আবদুল আলীমের সন্তান নুজহাত চৌধুরী শম্পার বাবাহারা শূন্য বুকটা বিরানভূমি হয়ে আছে। ধরা গলায় কাঁদতে কাঁদতে আজো তিনি বলে চলেন, “বাবার যে বুকের উপর ঘুমাতাম, সেই বুকটা ওরা ব্রাশফায়ার আর বেয়নেটে ঝাঁজরা করে দিয়েছিল, আর আমার বুকে সারাজীবনের জন্য এক চরম শূন্যতা ভরে দিয়ে গেল...” আজো লালসবুজ পতাকাটা তার বাবার অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন, পতাকার দিকে তাকালে তার মনে হয়, “..সবুজ পতাকার ভেতর যে লাল অংশটা আছে, সেখানে আমার বাবার একটু রক্ত আছে...”

শহীদ জায়া-সন্তানদের খালি বুকের শূন্য বিরানভূমির হাহাকার কি আদৌ বুঝতে চেষ্টা করি আমরা?

তথ্যসূত্রঃ ১। ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরী/ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী
২। ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ চিকিত্সক: স্মৃতিকথা’
৩। ‘স্মৃতি: ১৯৭১’/ রশীদ হায়দার

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন