বিজ্ঞাপন

হৃদয় মণ্ডল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন— এমন প্রমাণ মেলেনি

April 20, 2022 | 11:27 pm

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

মুন্সীগঞ্জ: বিনোদপুর রামকুমার উচ্চবিদ্যালয়ের গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি। এক সদস্যের এই কমিটির দায়িত্বে থাকা সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল হাই তালুকদার জানিয়েছেন, তদন্তে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক আব্দুল হাই বুধবার (২০ এপ্রিল) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদের কাছে এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

তদন্ত কমিটির একমাত্র সদস্য অধ্যাপক হাই বলেন, গত ১১ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর থেকে আমাকে ঘটনাটি তদন্তের জন্য পাঁচ কার্যদিবস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। গত ১২, ১৩, ১৮ ও ১৯ এপ্রিল আমি ঘটনার তদন্ত করেছি। এসময় মামলার বাদী, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দশম শ্রেণির যে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের কথা কাটাকাটি হয়েছিল তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন-

হৃদয় মণ্ডল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছেন— এমন প্রমাণ মেলেনি

বিজ্ঞাপন

এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে আমি সবার সঙ্গে কথা বলেছি। যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের মধ্য থেকে ১০ জনের লিখিত বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তাদের কারও বক্তব্যেই ধর্ম অবমাননার বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক হাই বলছেন, শিক্ষার্থীদের ধারণ করা অডিও রেকর্ড থেকেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কোনো বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষে সেদিন ইসলাম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান ধর্ম নিয়ে কথা হয়েছিল। তবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে— এমন কোনো কথা সেখানে হয়নি। এ বিষয়ে কারও বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেদিনের শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রমের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল বলে শিক্ষার্থীরা স্বীকার করেছেন অধ্যাপক আব্দুল হাই তালুকদারের কাছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা এ তথ্য স্বীকার করে নিয়েছে। তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এজন্য ক্ষমাও চেয়েছে। তবে বাইরে থেকে কেউ তাদের দিয়ে কাজটি করিয়েছে কি না, এ বিষয়ে কেউ কোনো তথ্য দেয়নি।

অন্য শিক্ষকদের ঈর্ষা এ ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে অবশ্য ধারণা করছেন তদন্ত কর্মকর্তা অধ্যাপক হাই। সবার সঙ্গে কথা বলে যেসব তথ্য তিনি পেয়েছেন তার আলোকে তিনি বলছেন, শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল প্রাইভেট পড়াতেন। অনেক প্রাইভেট শিক্ষার্থী ছিল তার। এছাড়া বিজ্ঞানের এক জন শিক্ষক সম্প্রতি অবসরে গেছেন। এ জন্য গণিতের পাশাপাশি বিজ্ঞানের সব ক্লাসও পেয়েছেন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল। এতে অন্য শিক্ষকরা ঈর্ষান্বিত হতে পারেন। এসব কারণেও হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হতে পারে। শিক্ষার্থীদের দিয়ে কেউ এটি করাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর গঠিত তদন্ত কমিটির একমাত্র সদস্য অধ্যাপক আব্দুল হাই তালুকদার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন— শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগটি কোনোভাবেই প্রমাণিত হয়নি।

এর আগে, ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে গত ২২ মার্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ বাদী হয়ে মামলা করেন। ওই দিনই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ২৩ ও ২৮ মার্চ আদালতে জামিন চেয়েও প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। পরে ১০ এপ্রিল জামিনে কারামুক্ত হন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল।

এ ঘটনা তদন্তে গত ১১ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হাই তালুকদারকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্রপাত গত ২০ মার্চ। ওই দিন দশম শ্রেণির মানবিক শাখার বিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলেন হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল। বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ে তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কয়েকজনের দীর্ঘ কথোপকথন হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল সেগুলোর উত্তর দেন। এই কথোপকথনের ভিডিওধারণ করে এক শিক্ষার্থী, যা পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষের এই কথোপকথনে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল ধর্ম অবমাননা করেছেন অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দীনকে জানায়। প্রধান শিক্ষক সেদিনই হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন এবং শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকতে বলেন। তবে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় কয়েকজন ও সাবেক শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানালে পরদিন সকালে তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ওই শিক্ষককে গ্রেফতারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে অফিস সহকারী মামলা দায়ের করলে পুলিশ গ্রেফতার করে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে।

 

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন