বিজ্ঞাপন

কফি হাউসের সুরকারের সাথে হঠাৎ আড্ডায়

May 1, 2022 | 9:27 pm

প্রণব সাহা

কফি হাউসের আড্ডার অন্যতম স্রষ্টাকে মান্না দের সামনে বসে তার কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল আরও অনেক বছর আগে। ঢাকায় এসেছিলেন কালজয়ী এই শিল্পী। একটি সংবাদ সম্মেলনে তার মুখোমুখি হয়েছিলাম। তারপর অনেক বছর পেলাম সেই গানের অমর সুরের জনককে। শুধু কথা নয়, রীতিমত মাত করে গেলেন আমাদের নিউজরুমকে। তিনি সুর্পণকান্তি ঘোষ। কফি হাউস ছাড়াও ‘সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোটবোন’, মান্না দের গাওয়া এই জনপ্রিয় গানেরও সুরকার তিনি।

বিজ্ঞাপন

কফি হাইজের সেই আড্ডাটা, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখলেও, এই গান রচনার পেছনেও আছেন সুর্পণকান্তি ঘোষ। আর গানের সূত্রপাত তাদের বাসায়ই, ভারতের প্রয়াত নামকরা সুরকার ও সংগীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের ছেলেই সুর্পণকান্তি ঘোষ। তো তিনি ঢাকায় আসছেন শুনে আমি নিজেই খানিকটা এক্সাইটেড। আর যেদিন সত্যিই এসে গেলেন আমাদের ডিবিসি নিউজের অফিসে, সেদিন রীতিমত আপ্লত। একটি সাক্ষাতকার দিলেন সুর্পণকান্তি। কিন্তু সজ্জন মানুষ তাই স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের আগে পরে মাতালেন সবাইকে। আর যখন সবাই জানলো কফি হাউসের আড্ডার স্রষ্টাদের তিনজনের একজন সুর্পণকান্তি; তখন সবাইও আবেগতাড়িত হলো। ফলে রেকর্ডিং শেষ করে আরও সময় দিলেন কালজয়ী অনেক গানের এই সুরকার, যিনি মান্না দের গানের সাথে বঙ্গও বাজিয়েছেন। আর মিউজিশিয়ান হিসেবেও কাজ করেছেন সেই গানটিতে ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে দিয়ে বললাম, চললাম…’।

কফি হাউসের আড্ডার অন্যতম স্রষ্টা সুর্পণকান্তি ঘোষ

কফি হাউসের আড্ডার অন্যতম স্রষ্টা সুর্পণকান্তি ঘোষ

শুধু গানের সুর দিয়ে নয়, নিজের বৈঠকী আচরনে মানুষকে কাছে টানারও এক বিস্ময়কর গুণ আছে সুপর্ণকান্তি ঘোষের। আর সেজন্যই সাক্ষাতকার রেকর্ডিং হওয়ার পর যেমন ফটোসেশন হলো, তেমনি করেই তিনি কয়েকজনকে নিয়ে চলে গেলেন ‘বিড়ি সিঁড়িতে’! না ঢাকার বাইরে নয়, আমাদের অফিসের ধূমপায়ীরা যেখানে সিগারেট ফোঁকে, সেখানে! ছাদে যাবার সিড়ি, আর ওখানেই চলে বিড়ির সুখটান, তাই নাম বিড়ি সিঁড়ি। আর আমি গিয়ে দেখি জমে গেছে আড্ডা। তো বেনসন, লাল নাকি সাদা; কোনটার বেশি স্বাদ তা নিয়ে আলোচনা। আমি অধুমপায়ী তাই কথা ঘোরাতে চাইলাম। সুর্পণদা বললেন ‘ক’টা গরম পেঁয়াজু হবে?’

সে দিন বিদায় নিলেন কালজয়ী এই সুরকার। এরই মধ্যে যিনি পছন্দ করে ফেলেছেন দেশের প্রতিশ্রুতিশীল গায়ক ইউসুফ হাসান খানকে। বারবার তাকে বলছেন, পরে দেখা করার জন্য। আর গীতিকার পান্নালাল দত্তকে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন ইউসুফকে হোয়াটসঅ্যাপে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার করা গানটি পাঠানোর জন্য। হ্যাঁ, কফি হাউসের আড্ডাখ্যাত সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ গান বেঁধেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও। ‘আমাদের শেখ মুজিব’ নামের সেই সিডিও পেয়ে গেলাম তাৎক্ষণিক। বাংলাদেশের পান্নালাল দত্ত লিখেছেন সেই গান, সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ আর সঙ্গীতায়োজনসহ কন্ঠ দিয়েছেন ওপার বাংলার শিল্পী সুরজিৎ চ্যাটার্জি। সুর্পণদা বারবারই বলছিলেন কীভাবে তার এই আয়োজনটি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পৌঁছানো যায়?
হটাৎ করেই পান্নালাল দত্ত জানিয়েছিলেন সুর্পণদার ঢাকায় আসবার কথা। ডিবিসি নিউজের জন্য একটা সাক্ষাকারের লোভ সামলাতে পারিনি। আর যথাসময়ে কিছু না জেনেই হয়তো সাড়া দিয়েছিলেন সুপর্ণকান্তি ঘোষ। কিন্তু মাত্র দুঘন্টায় তিনি যেমন করে সবাইকে আপন করে নিয়েছিলেন সেদিন, তাতে বলতেই হয় এমন বড়মনের মানুষ বলেই হয়তো ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’ বা ‘সে আমার ছোট বোন, বড় আদরের ছোট বোনের’ মতো কালজয়ী সব গানের সুরকার হতে পেরেছেন।

বিজ্ঞাপন
‘আমাদের শেখ মুজিব’ নামের সেই সিডি

‘আমাদের শেখ মুজিব’ নামের সেই সিডি

আমার সৌভাগ্য সুরকারের নিজ মুখেই কফি হাউজের আড্ডার সৃষ্টি কথাটি জানতে পেরেছি। সুর্পণদার বাবার নচিকেতা ঘোষ গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের হরিহর আত্মা। সুপর্ণদাদের বাড়িতেই তাদের আড্ডা। তো তেমন আড্ডায় এসেই ১৭ বছরের সদ্য কৈশোর উর্ত্তীণ সুপর্ণকে তার গৌরীকাকু কিছুটা কটাক্ষ করেছিলেন ‘আড্ডা’ নিয়ে। ঠোঁটকাটা সুপর্ণ বলে বসলো, ‘কি সব প্রেমের গদগদ গান করো, আড্ডা নিয়েও তো একটা গান লিখতে পার!’ বয়সে ছোট হলেও স্নেহাষ্পদের কথা রাখলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তাৎক্ষণিকই লিখলেন, ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালী বিকেলগুলো সেই…’। বাকিটুকু নিজের বাসায় আর সুপর্ণকান্তির পীড়াপিড়িতে ট্রেনে উঠে লিখেছিলেন শেষ স্তবক। আহা সেভাবেই সৃষ্টি একটি কালজয়ী গানের। সুর্পণকান্তি যা মুম্বাই গিয়ে গাইয়েছিলেন মান্না দেকে দিয়ে। এমন সুরকারকে কাছে পেয়ে আসলেই আপ্লুত ছিলাম বেশকিছুক্ষণ।

এরপরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। একদিন পরেই কানাডা আর কলকাতা থেকে ফোন পেয়েছি। ‘সুপর্ণকান্তি ঘোষ নাকি ঢাকায় গিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, কি করে সম্ভব? উনি তো ক্ষ্যাপা মানুষ!’ কলকাতা থেকে করা ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে যিনি এমন মন্তব্য করলেন, তার নাম প্রকাশ করলাম না। কিন্তু কানাডা থেকে সঙ্গীতশিল্পী মৈত্রী দেবী যখন ফোন করলেন, ‘আরে দাদা সুর্পণকান্তি ঘোষ কিন্তু আমার লেখা একটি গান সুর করে গাইয়েছেন জয়তী চক্রবর্তীকে দিয়ে। ওনার সাথে কথা হলো তোমাদের ডিবিসি নিউজের খুব প্রশংসা করলেন, যে তোমরা তাকে অনেক যত্ন করেছো,সম্মান দিয়েছ।’ হায়! একজন জনপ্রিয় আর কালজয়ী অনেক গানের সুরকারকে কি যোগ্য সম্মান দেওয়া ক্ষমতা আছে আমাদের। মৈত্রী দেবী ফেসবুকেও বিশাল স্ট্যাটাস দিয়েছে সুর্পণকান্তি ঘোষের ঢাকা সফর নিয়ে। জানিয়েছে ঢাকার ইউসুফ হাসান খানকে দিয়েও গান করাবেন সুর্পণকান্তি ঘোষ। কি একটা খুশী হবার ব্যপার, তাই না?

ডিবিসির নিউজরুমে সুর্পণকান্তি ঘোষ

ডিবিসির নিউজরুমে সুর্পণকান্তি ঘোষ

সুপর্ণকান্তি ঘোষ বলে গেলেন শুনেছি এ দেশে বাংলা গানের কদর আছে, আমার দুর্ভাগ্য আমি যখন জন্মেছি তখন থেকে ওপারে গানের কদর কমতে শুরু করেছে। কিন্তু ‘কফি হাউসের আড্ডাটা আজ আর নেই’, এটা ১৯৮৩ সালের গান। আগামী বছর এই কালজয়ী অমর গানটি সৃষ্টির ৪০ বছর পূর্ণ হবে। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কয়েক কোটি বাঙালি যে আরও কত বছর নস্টালজিক হবে এই গানে, তার আগাম র্পূবাভাস দেবার মত যোগ্য ব্যাক্তি আমি নই, কিন্তু অল্পসময়ের জন্য সুর্পণকান্তি ঘোষকে কাছে পাওয়া যে সারাজীবনের এক অনন্য পাওয়া তা বলতে দ্বিধা নেই। আর যতদিন বেচে থাকবেন সুপর্ণদা, নিশ্চয়ই আরও অনেক কালজয়ী গান উপহার দেবেন, সেই আশা আমাদের সবার।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন