বিজ্ঞাপন

প্রজন্মের প্রয়োজন জাতীয় কৃষি জাদুঘর

May 12, 2022 | 1:56 pm

ড. মো. তাসদিকুর রহমান সনেট

চার থেকে পাঁচ লাখ বছর আগে আদি প্রস্তরযুগের মানুষের জীবিকা ছিল শিকার। তখনকার মানুষ বন্য জন্তু-জানোয়ারের পক্ব-অপক্ব মাংস খেয়ে জীবনধারণ করতো। লক্ষাধিক বছর ধরে শিকারের ফলে এবং মহামারিতে অগণিত প্রাণীর মৃত্যুর কারণে জন্তু-জানোয়ারের স্বল্পতা দেখা দেয়। তখন জীবনধারণের বিকল্প হিসাবে বুদ্ধিমান মানুষ শান্ত, নিরীহ জন্তু-জানোয়ারকে গৃহপালিত করে তোলে। ফলে তাদের বংশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে মানুষ শিকারিজীবন বর্জন করে বিকল্প জীবনযাত্রা শুরু করেছিল পশুপালনের মাধ্যমে। এমন জীবনযাত্রার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ আবার বুঝতে পারে, অনুকূল আবহাওয়া ও পরিবেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে কৃষিকাজ করা গেলে নিজেদের ও গৃহপালিত পশুদের খাদ্য সংস্থানের জন্য দেশ-দেশান্তরে আর ঘুরতে হবে না। হিংস্র জন্তু-জানোয়ার অধ্যুষিত বিপজ্জনক অঞ্চল ও অরণ্যাদি থেকে খাদ্যশস্য ও ফলমূলাদি আহরণ করতে হবে না-অনিশ্চিত জীবনযাত্রা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। সুতরাং শুরু হলো কৃষি। পাঁচ থেকে সাত হাজার বছর আগে আদিম মানুষ কৃষিকে ধীরে ধীরে পেশা হিসাবে আয়ত্ত করতে শুরু করে। মানবজাতির ইতিহাসে এটি একটি মহাবৈপ্লবিক ঘটনা। কৃষি মানুষকে শেখালো কারিগরি। মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস করার প্রয়োজনীতা অনুভব করল। সৃষ্টি হলো রাজা, রাজ্য। ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের চাহিদা বেড়ে গেল এবং এর মাধ্যমে সৃষ্টি হলো অন্যান্য পেশার।

বিজ্ঞাপন

কৃষির আধুনীকিকরণ বা বিবর্তন একদিনে হয়নি। প্রস্তর যুগে মানুষ পাথর দিয়ে কর্ষণকাজ করত, নিজেদের দৈহিক শক্তি প্রয়োগে কৃষির কার্যাদি সম্পন্ন করত। জীবন-জীবিকার ও নিজেদের প্রয়োজনে কৃষিকাজ করত, প্রয়োজনীয় সব ফসল নিজেরাই ফলাত। তা থেকে উদ্বৃত্ত অংশ প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে দিত বা পণ্যবিনিময় করত। কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হলো কর্ষণ ও সেচ ব্যবস্থাপনা। মানুষ প্রথমে নিজেরাই ফলা দিয়ে কর্ষণকাজ করত। পরবর্তী সময়ে লাঙল, মই, জোয়াল, কোদাল, মাতুল ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করল। এর সঙ্গে সম্পৃৃক্ত করল গৃহপালিত পশু-গরু, মহিষ, ঘোড়া, গাধাকে। সেচব্যবস্থায় কলস বা টিলা দিয়ে জমিতে পানি দেওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে সেউতি, ডঙ্গা, চাপকল ইত্যাদি দিয়ে নালা করে করা হতো সেচের ব্যবস্থা। কর্ষণ, মাড়াই, ফসল সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে গৃহপালিত প্রাণী ব্যবহার করা হতো। ধীরে ধীরে সেখানে সংযুক্ত হতে থাকল কৃষি যান্ত্রিকীকরণ; যেমন-পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর, বর্তমানে তা এসে কম্বাইন হারভেস্টার ও রাইস রিপারে দাঁড়িয়েছে। সেচব্যবস্থায় সংযুক্ত হয়েছে শ্যালো ও ডিপ টিউবওয়েল।

প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চল বিপুল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত। এর প্রধান কারণ এখানকার কৃষি ও অনুকূল আবহাওয়া। সমগ্র এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষ এ দেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। এভাবে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বাঙালি সংকর জাতিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বাংলা ভাষায় যেমন অনেক বিদেশি ভাষা যুক্ত হয়েছে, তেমনই কৃষির কিছু প্রযুক্তি ও জাত এসেছে বিভিন্ন দেশ থেকে। প্রতিটি বিবর্তন বা উন্নয়নের সঙ্গে আমরা নতুনকে সাদরে গ্রহণ করি এবং পুরোনোকে হারিয়ে ফেলি। উন্নত বিশ্ব তাদের কর্ম, ব্যক্তি ও কৃষির ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য জাদুঘর করে থাকে। ২০১৯ সালে দাপ্তরিক কাজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানকার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের পর জানতে পারি এ শহরকে ‘সিটি অব মিউজিয়াম’ বলা হয়। এ সিটিতে রয়েছে প্রায় ৮৩টি মিউজিয়াম। বিভিন্ন দেশে অন্যান্য জাদুঘরের পাশাপাশি কৃষি জাদুঘর রয়েছে। যেমন কানাডিয়ান কৃষি জাদুঘর, মিসিসিপি কৃষি জাদুঘর, ফ্লোরিডা কৃষি জাদুঘর, জর্জিয়া কৃষি জাদুঘর, সান্তাপাওলো কৃষি জাদুঘর, ডেলাওয়ার কৃষি জাদুঘর, লন্ডন কৃষি জাদুঘর, আজারবাইজান কৃষি জাদুঘর। ভারতে রয়েছে জাতীয় কৃষি বিজ্ঞান জাদুঘর, পাকিস্তানে রয়েছে কৃষি হেরিটেজ জাদুঘর ইত্যাদি। কৃষি জাদুঘরের মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষির ইতিহাস ও হেরিটেজকে সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ বিষয়ে অবহিত করা।

বিজ্ঞাপন

এ দেশেও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২০০২ সালে পাঁচ একর জায়গার ওপর কৃষি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। জাদুঘরটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিমে এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে অবস্থিত। তাছাড়া কলেজ শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম ব্যক্তিগত উদ্যোগে নওগাঁয় ২০০৮ সালে এক একর জায়গার ওপর একটি কৃষি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরের ৫০টি কর্নারে একশর মতো কৃষি যন্ত্রপাতির সমাহার রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ যন্ত্রপাতিগুলো সংগ্রহ করেছেন। এছাড়াও তার একটি কৃষি লাইব্রেরি রয়েছে। সেখানে রয়েছে কৃষির ওপর প্রায় ৭ হাজার বই। দুটি মিউজিয়ামে রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত লাঙল, জোয়াল, মাতুল, কাস্তে, খন্তি, মাটির পাতিল, তৈল ভাঙার ঘানি, গরুর গাড়িসহ বিভিন্ন কৃষিজ যন্ত্রপাতি। কৃষি ছাড়া রয়েছে আমাদের বৃহৎ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টর। এ সেক্টরগুলোর বিভিন্ন গবেষণার কারণে বিলুপ্তপ্রায় অনেক প্রজাতি সংরক্ষিত রয়েছে।

কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাপেক্স বডি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছে ‘জাতীয় কৃষি প্রদর্শনী কেন্দ্র’। এখানে রয়েছে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন ফসলের বীজের সমাহার। তাছাড়াও ডিজিটাল ডিসপ্লে সেন্টারের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা আমাদের কৃষি গবেষণা কর্মকাণ্ডের ভিডিও দেখতে পাবেন। আমাদের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয় রয়েছে জার্মপ্লাজম সেন্টার, সেখানে রয়েছে উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের বীজ।

বিজ্ঞাপন

দেশের ধান গবেষণার ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধানভিত্তিক কৃষ্টি ও কালচার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের প্রথম রাইস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাফল্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুন্দর ও ফলপ্রসূভাবে তুলে ধরার জন্য ব্রিতে একটি অত্যাধুনিক রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। সম্প্রতি একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ব্রিতে একটি অত্যাধুনিক রাইস মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ধানের বীজ থেকে বীজ বৃদ্ধি পর্যায়, গত পাঁচ দশকে ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন উফশী জাতের ধান ও চালের নমুনা, দেশীয় বিভিন্ন আদি জাত, চালের তৈরি পিঠাপুলি, ধানের উপজাত পণ্যগুলো, প্রধান প্রধান আগাছা, রোগবালাইয়ের সচিত্র নমুনা, ধান চাষে ব্যবহৃত দেশীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির রেপ্লিকা, ধানভিত্তিক কৃষ্টি ও কালচারের রেপ্লিকা এবং ধান নিয়ে লেখা দেশি-বিদেশি বইপত্র এক ছাদের নিচে এনে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

পরিশেষে বলা দরকার, সময়ের সঙ্গে সব কিছু পরিবর্তনশীল। বর্তমানে যেসব কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে, একদিন হয়তো সেগুলো সময়ের পালাবদলে হারিয়ে যাবে। পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের কৃষির ধারাবাহিক সাফল্যের কথা যেমন জানাতে হবে, তেমনই কৃষির এ অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি জড়িত ছিল, সেগুলো সংরক্ষণ করে রাখতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। শুধু কৃষি নয়, সব ক্ষেত্রে অগ্রগতির ইতিহাসের সঙ্গে যা কিছু সংশ্লিষ্ট যেমন-রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, প্রযুক্তিসহ সংরক্ষণ করা জরুরি। রাজধানী ঢাকা শহরে জাতীয় জাদুঘরের পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, সামরিক জাদুঘরসহ অসংখ্য জাদুঘর। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিলুপ্তির পথে যেসব প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন একটি জাতীয় কৃষি জাদুঘর। এটি হবে কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের সব কর্মকাণ্ডের একটি সফল ও বাস্তবধর্মী সংগ্রহশালা, যার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মানুষ আমাদের কৃষির ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

লেখক: কৃষিবিদ; সাধারণ সম্পাদক, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন