বিজ্ঞাপন

ডলারের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়বে

May 18, 2022 | 9:13 pm

গোলাম সামদানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা : প্রবাসী আয় কমার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশে ডলারের চাহিদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মুদ্রাবাজারের এই অস্থিরতার কারণে অর্থনীতিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে, দেশে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা হবে। নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ‘র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে করে সরাসরি আমদানি করা ভোগ্যপণ্য বিশেষ করে ভোজ্যতেল, ডাল, গমসহ অনেক পণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।’

দ্বিতীয়ত, কিছু ভোগ্যপণ্য রয়েছে যেগুলোর জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বেড়ে গেলে আর টাকার মান কমে গেলে তখন সেসব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। শুধু তাই দেশীয় শিল্প কারখানার উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বেড়ে গেলে দেশীয় উৎপাদিত অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘ডলারের দাম বাড়লে রফতানিনির্ভর দেশের জন্য সুবিধা হয়। কিন্তু আমরা আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় সে সুফল পাবো না। এছাড়াও বর্তমানে প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে। কার্ব মার্কেট আর ব্যাংকের মাঝে ডলার বেচাকেনার পার্থক্য বেশি হলে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরোও কমে যাবে। হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বেড়ে যাবে। তখন সরকার ডলার সংকটে পড়বে।’

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বর্তমানে সুযোগ কৃত্রিমভাবে কেউ ডলার মজুদ করছে কিনা? সেটাও নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের দাম বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রফতানির তুলনায় আমদানি অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে ইউক্রেইন রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, সার, গমসহ প্রায় সব ধরনের পণ্য বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। এতে করে ডলারের চাহিদা বেড়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রবাসী আয়ে নিম্নগতি ও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে আমাদের রেকর্ড ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। সাধারণত টাকার মান কমানো হলে রফতানিকারকরা উৎসাহিত হন। কারণ, আগের তুলনায় প্রতি ডলারে বেশি স্থানীয় মুদ্রা পাওয়া যায়। আর টাকার অবমূল্যায়ন করলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। বাংলাদেশ আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় টাকার অবমূল্যায়ন মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশে এখন এটিই হচ্ছে। এখন বাংলাদেশ যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে, তার চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, কয়ে কয়েকদিন কার্ব মার্কেটে (খোলাবাজারে) ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল ১৭ মে প্রথমবারের মতো ডলারের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে প্রতি ডলার ১০০ থেকে ১০২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বুধবার খোলাবাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের মূল্য আগের দিনের চেয়ে কিছুটা কমে প্রতি ডলার ৯৯ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। উল্লেখ্য বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ গত ১৬ মে প্রতি ডলার ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা বেঁধে দিলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তা মানছে না। ব্যাংকে এলসি করতে গেলে ডলারের বিপরীতে নেওয়া হচ্ছে ৯২ থেকে ৯৬ টাকা।

এ ব্যাপারে রেইনবো মানি এক্সচেঞ্জের পরিচালক রফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘মঙ্গলবার প্রতি ডলার ১০০ থেকে ১০২ টাকায় বিক্রি হলেও আজ বুধবার তা ৯৯ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘রফতানির তুলনায় আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সরবরাহ করছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক চা‌হিদার বিপরী‌তে ব্যাংকগুরোর কাছে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করা হয়েছে। বাজারের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রযোজন অনুযায়ী ডলার সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।’

রেকর্ড ডলার বিক্রি : চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের গত ১৮ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে। অথচ ২০২০-২১ অর্থবছরে টাকার মান ধরে রাখতে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

আমদানি ব্যয় বেড়েছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রফতানি বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। একইসময়ে আমদানি বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রফতানি আয় হযেছে তিন হাজার ৬৬২ কোটি ডলার। একই সময়ে আমদানির ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দুই হাজার ৪৯০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ: এদিকে আমদানির ব্যয় পরিশোধ করতে ডলার ওপর চাপ পড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল। বর্তমানে তা কমে গত ১১ মে (বুধবার) ৪১.৯৩ বিলিয়ন নেমে এসেছে। এখন দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, তা দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা যাবে। আগে এটা ছিল আট মাসেরও বেশি।

সারাবাংলা/জিএস/একে

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন