বিজ্ঞাপন

বালুঘাটে আধিপত্য নিয়ে থামছে না সংঘর্ষ, আতঙ্কে ৮ গ্রামবাসী

June 4, 2022 | 8:10 am

মহিউদ্দিন সুমন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

টাঙ্গাইল: ভূঞাপুরের নিকরাইল ইউনিয়নে বালুঘাটে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। গত এক সপ্তাহে সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টা হামলা এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় দুই পক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এসব ঘটনায় উভয়পক্ষই থানা ও আদালতে ১০ থেকে ১২টি মামলা দায়ের করেছে। ফলে এলাকার ৮টি গ্রামের মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, নিকরাইল ইউনিয়নের পুনর্বাসন-১, পুনর্বাসন-২, পুনর্বাসন-৩ ও পুনর্বাসন-৪ এবং পলশিয়া, সারপলশিয়া, সিরাজকান্দি, পাটিতাপাড়া গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের মূল ব্যবসা বালু উত্তোলন ও সরবরাহ। গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর ওই ইউনিয়নের নির্বাচনে ইউনয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল মতিন সরকার নৌকা এবং সাবেক ইউপি সদস্য মাসুদুল হক মাসুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীকে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনারস প্রতীকে মাসুদুল হক মাসুদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বালু ঘাট দখলের চেষ্টায় সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান চেয়ারম্যানের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টা হামলা এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

ওই এলাকায় মোট ১৩টি বালুঘাট রয়েছে। ঘাটগুলো হচ্ছে- নাজির মেম্বারের ঘাট, কদ্দুছ সরকারের ঘাট, ভাবির ঘাট, মাসুদ মেম্বারের ঘাট, নুহু মেম্বারের ঘাট, করিম মেম্বারের ঘাট, বাগানবাড়ি ঘাট, মুক্তিযোদ্ধা ঘাট, মিনহাজ মন্ডলের ঘাট, ছানোয়ারের ঘাট, বাবুর ঘাট, তাঁতি লীগের ঘাট এবং চিতুলিয়াপাড়া ঘাট।

একসময় বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বাসেক) কাছ থেকে ডাব (পুকুরের পার) ইজারা নিয়ে ও জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এলাকার লোকদের সঙ্গে নিয়ে ওইসব বালুঘাট পরিচালনা করতেন।

বিজ্ঞাপন

বালুঘাটগুলোর মধ্যে করিম মেম্বারের ঘাট, বাগানবাড়ী ঘাট, মুক্তিযোদ্ধা ঘাট ও মিনহাজ মন্ডলের ঘাট সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল মতিন সরকার স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পরিচালনা করেন। অন্য বালুঘাটগুলো বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদুল হক মাসুদ (সাবেক মেম্বার) তার নেতাকর্মীদের নিয়ে পরিচালনা করেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মতিন সরকারের নেতাকর্মীদের বালুঘাট চারটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

সিরাজকান্দি গ্রামের বাবলু মিয়া, পলান শেখ, পলশিয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিক, মোখলেছুর রহমান, অটোভ্যান চালক আলামিন, আব্দুর রহিম, সিরাজকান্দি বাজারের খোদাবক্সসহ আরও অনেকে জানান, বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যানের মধ্যকার বিরোধ মূলত ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে। উভয় পক্ষের দ্বন্দ্বে এলাকার মানুষ বাইরে বের হতে পারছে না। তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে ভ্যান-অটোরিকশা থামিয়ে মারপিট করা হচ্ছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, ২৭ মে (শুক্রবার) দুপুরে পাটিতাপাড়া এলাকায় সাবেক চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণাধীন মিনহাজ মন্ডলের ঘাটে বালু তোলা হচ্ছিল। তখন ঘাট দখলে নিতে বর্তমান চেয়ারম্যানের লোকজন ওই ঘাটে হামলা চালায়। পাশের মোজাফ্ফর প্রামানিক ও ফেরদৌস প্রামানিকের বাড়ি থেকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে ও লাঠি সরবরাহ করা হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ৩০-৩৫ জন আহত হয়।

এরপর ২৯ মে (রোববার) সাবেক চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণাধীন বাগানবাড়ী বালুঘাট বর্তমান চেয়ারম্যানের ভাই রফিক ও নুহু মেম্বার ভূঞাপুর পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদের গাড়ি চালক আব্দুল আলীম ও এপিএস পাভেলের উপস্থিতিতে দখল করতে যায়। এসময় দুই পক্ষের লোকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পরে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাশের নেংড়া বাজারে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই পক্ষের ২৫-২৬ জন আহত হয়।

বিজ্ঞাপন

বালুঘাটে আধিপত্য নিয়ে থামছে না সংঘর্ষ, আতঙ্কে ৮ গ্রামবাসী

৩০ মে (সোমবার) ওই দখলকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। ৩১ মে (মঙ্গলবার) বতমান চেয়ারম্যানের সমর্থক জুরান মন্ডল ও নুহু মেম্বারের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন সমর্থক বাগানবাড়ী বালুঘাট দখল করতে যায়। এসময় সাবেক চেয়ারম্যানের সমর্থকদের পাল্টা হামলায় উভয় পক্ষে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১০-১২ জন আহত হয়।

এরপর ১ জুন (বুধবার) ভাবির ঘাট দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।

এসব ঘটনায় গত এক সপ্তায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। তাদের স্থানীয় হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক ও টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এনে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। ওই ঘটনাগুলোয় ভূঞাপুর থানা ও টাঙ্গাইলের আদালতে ১০-১২টি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ইউনিয়নে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

নিকরাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল হক মাসুদ জানান, বালুঘাট কেউ কারোটা দখল করছে না। তবে জমির মালিকরা সাবেক চেয়ারম্যান ও তার লোকজনকে জমি না দেওয়ায় তাদের উপর হামলা করা হচ্ছে। প্রত্যেক ঘটনাই পুলিশকে জানানো হয়েছে। আবার হামলার শিকার যারা হয়েছেন তারাও থানায় অভিযোগ দিয়েছে।

নিকরাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মতিন সরকার জানান, তার নামে কোনো বালুর ঘাট নেই। তিনি বালুর ব্যবসাও করেন না। পরিকল্পিতভাবে তাকে নির্বাচনে হারানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মাসুদ চেয়ারম্যান, নুরুল ইসলাম ওরফে নুহু মেম্বার ও জুরান মন্ডলের নেতৃত্বে প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন ও হামলা চালানো হচ্ছে।

তিনি জানান, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের দিয়ে এই হামলা চালানো হচ্ছে। ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার ইন্দনে বালু ঘাট দখলে নেওয়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

ভূঞাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম জানান, হামলা-পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষ থেকে দু’টি মামলা দায়ের হয়েছে। দু’টি মামলায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। নিকরাইল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থাসহ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ জানান, নিকরাইল ইউনিয়নে বালুঘাটকে কেন্দ্র করে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা তাকে কেউ জানায়নি। সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মতিন সরকার ঘাটসংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের ন্যায্য হিস্যা না দেওয়ায় এসব ঘটনা ঘটছে।

ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. ইশরাত জাহান জানান, সমস্যাটি মূলত রাজনৈতিক। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সারাবাংলা/এমও

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন