বিজ্ঞাপন

রাসায়নিকে আগুন লাগলে কী করতে হয়?

June 5, 2022 | 3:21 pm

সন্দীপন বসু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোয় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা আজ গোটা দেশের আলোচিত বিষয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ৭ জন, যারা আগুন থেকে বিপন্ন মানুষদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। বিস্ফোরণে আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৭০ জন। এদের মধ্যে ৪ জন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।

বিজ্ঞাপন

সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোতে আগুনের মূল কারণ এখনো দাফতরিকভাবে জানা যায়নি। তবে ফায়ার সার্ভিস, ডিপোর কর্মী ও স্থানীয় সূত্রে গণমাধ্যম জানিয়েছে, কনটেইনার ডিপোটিতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নামে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক (কেমিক্যাল) থাকাতেই আগুনের এই বাড়বাড়ন্ত। আগুন লাগার প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর এই প্রতিবেদন লেখার সময়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। কিছুক্ষণ পরপর ভেতর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে যুক্ত হয়েছে সেনাবাহিনীর ২৫০ জনের একটি ইউনিট। কেমিকেল যাতে সাগরে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্যেও কাজ করছে সেনাবাহিনীর ইউনিটটি।

বিজ্ঞাপন
রাসায়নিকে আগুন লাগলে কী করতে হয়?
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোয় শনিবার রাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে

সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপোর আগুন সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের সাবেক সহকারী পরিচালক মো. বজলুল রশিদ খান সারাবাংলাকে বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি রাসায়নিক থেকে সৃষ্ট আগুন বলেই মনে হচ্ছে। কারণ ডিপোটির গ্যারেজে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ছিল। এই রাসায়নিকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডও ছিল।

বিজ্ঞাপন

বজলুল রশিদ খান জানান, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড একটি রাসায়নিক যৌগ। এটি যদি উত্তপ্ত করা হয়, তাহলে তাপীয় বিয়োজনে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে। তাই আগুনের ধরন বুঝে আগুন নেভানো উচিত।

বিজ্ঞাপন
রাসায়নিকে আগুন লাগলে কী করতে হয়?
কনটেইনার ডিপোর আশেপাশে উড়ে এসে পড়ে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের ড্রাম

‘আগুন ধরলে প্রাথমিকভাবে বুঝতে হবে আগুনের ধরন কেমন। নেভানোর জন্য সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে একেক ধরনের আগুন নেভানোর জন্য একেক ধরনের কৌশল নিতে হয়। আর বিভিন্ন ধরনের আগুন নেভানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন কর্মীবাহিনী থাকে।’- জানিয়েছেন অগ্নিকাণ্ড বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন
রাসায়নিকে আগুন লাগলে কী করতে হয়?
হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিকটির কারণেই বিস্ফোরণ বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ওয়েবসাইটেও আগুনের পাঁচটি ধরনের উল্লেখ রয়েছে।

১. পুড়ে ছাই বা কয়লা হয়ে যায় এমন আগুন
২. তেলের আগুন
৩. গ্যাসের আগুন
৪. ধাতব পদার্থের আগুন
৫. ইলেকট্রিক আগুন

এই পাঁচ ধরনের আগুন নেভানোর জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল। সাধারণত আগুন ধরতে ও ছড়িয়ে পড়তে দাহ্য-বস্তু বা জ্বালানি, অক্সিজেন এবং তাপ লাগে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এই তিনটি উপকরণের যেকোনো একটি সরিয়ে ফেললে আগুন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সবসময় যে এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াই কাজে লাগে তা কিন্তু নয়। আর বিভিন্ন ধরনের আগুন নেভাতে হয় বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে।

পুড়ে ছাই বা কয়লা হয় এমন আগুনের সূত্রপাত সাধারণত হয় চুলা থেকে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আগুন সাধারণত রান্নার চুলা থেকেই লাগে। কাঠ, কয়লা দিয়ে যেসব চুলা জ্বালানো হয়, সেখান থেকে এই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের আগুন পানি, শুকনো বালি এবং ভেজা বস্তা দিয়ে নেভানো হয়।

তবে সব আগুন আবার পানি দিয়ে নেভানো যায় না। তেলের আগুন নেভাতে কেমিকেল মিশ্রিত ফোম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সবসময় এই ধরনের ফোম হাতের কাছে থাকে না। তাই অনেকক্ষেত্রেই পরিস্থিতি বুঝে ভেজা বস্তা বা কাঁথা দিয়ে এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

গ্যাস থেকে সৃষ্ট আগুনের ক্ষেত্রেও ভেজা বস্তা বা বালি দিয়ে আগুন নেভাতে হয়। বাসাবাড়িতে গ্যাস থেকে আগুন ধরলে প্রথমেই চেষ্টা করতে হবে গ্যাসের লাইন বন্ধ করার জন্য। বাতাস আসলে এই ধরনের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই ভেজা বস্তা দিয়ে আগুনের উৎস বন্ধ করা গেলে আগুন ছড়ানোও বন্ধ হয়।

তবে একই প্রক্রিয়া আবার ধাতব পদার্থের আগুনে কাজ করে না। ধাতব পদার্থে আগুন লাগলে তাতে কিছুতেই পানি দেওয়া যাবে না। বরং, ধাতব পদার্থের আগুন থেকে তাপ সরিয়ে ফেললে আগুন নেভানো সহজ।

রাসায়নিকে আগুন লাগলে কী করতে হয়?
সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোর বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের ড্রাম

একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় বৈদ্যুতিক উৎস থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডেও। এক্ষেত্রে প্রথমেই ইলেকট্রিসিটির লাইনটা বন্ধ করতে হবে। ইলেকট্রিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরলে সেই আগুন নেভাতে পানি দিলে মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হবেন। ধাতব ও বৈদ্যুতিক আগুন নেভানোর জন্য কার্বন ডাই অক্সাইড দরকার হয়। অনেকক্ষেত্রে এবিসিই ড্রাই পাউডার ব্যবহার করা হয়। আর এই রাসায়নিকগুলো হাতের কাছে না থাকলে দূর থেকে পানি ছুঁড়ে দিতে হবে। এমনভাবে দিতে হবে, যাতে যিনি পানি ছিটাচ্ছেন তার সঙ্গে পানির কোনো সংযোগ না থাকে।

অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে সতর্কতার সঙ্গে নেভাতে হয় রাসায়নিক পদার্থের আগুন। রাসায়নিক বিভিন্ন ধরনের হয়। বিভিন্ন রাসায়নিক পানির সঙ্গে বিক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে। অনেক রাসায়নিক যেমন পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিস্ফোরকে পরিণত হয়। অনেকগুলো রাসায়নিক তাপে দ্রুত ছড়ায়। তাই এক্ষেত্রে আগুন নেভানোর প্রক্রিয়াও হয় ভিন্ন ভিন্ন। এই ধরনের আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনাস্থলে যেয়ে পর্যবেক্ষণ করে পদ্ধতি বের করতে হয়। উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের সাহায্য ছাড়া এই ধরনের আগুন নেভাতে গেলে দুর্ঘটনার আশংকাও থাকে।

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন