বিজ্ঞাপন

গ্রাহকদের স্যার সম্বোধন করতে হবে— ব্যাংকারদের উদ্দেশে হাইকোর্ট

June 5, 2022 | 9:29 pm

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: গ্রাহকদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং তাদের স্যার সম্বোধন করতে হবে বলে অভিমত দিয়েছেন হাইকোর্ট। এবি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনের শুনানিতে হাইকোর্ট এ অভিমত দেন।

বিজ্ঞাপন

রোববার (৫ জুন) এবি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে সতর্ক করে দিয়ে বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের (ব্যাংক কর্মকর্তা) আবেদন নিষ্পত্তি করে দেন।

এদিন ব্যাংকারদের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, ‘আপনারা যাদের নিয়ে ব্যবসা করেন তাদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। তাদের স্যার সম্বোধন করতে হবে। নিজেদের সুপিরিয়র মনে করলে হবে না। অনেকে নিজেদের সুপিরিয়র মনে করেন। প্রকৃতপক্ষে সুপিরিয়র হচ্ছেন ব্যাংকের গ্রাহকেরা। ব্যাংকের গ্রাহকেরা যদি লুঙ্গি পরে (পরিধান) আসা গ্রামের সাধারণ কৃষকও হন, তাহলেও তাদের স্যার সম্বোধন করতে হবে। এটা সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।’

বিজ্ঞাপন

এর আগে, দুই ব্যাংক কর্মকর্তা আদালতে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করেন। তারা হলেন— এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অ্যাক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্টকে (ইভিপি) কে এম আমিনুল ইসলাম ও সাতক্ষীরা শাখার ব্যবস্থাপক (ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার) মো. সহিদুজ্জামান।

আদালতে এবি ব্যাংকের সাতক্ষীরা শাখার ব্যবস্থাপকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবু তালেব, ইভিপি আমিনুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী বিএম ইলিয়াস কচি, এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারিক আফজালের পক্ষে ছিলেন এবিএম রবিউল হোসেন সুমন। রিটের পক্ষে ছিলেন গোলাম রব্বানী ও ইয়ারুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি ওয়ারেস আল হারুনী।

বিজ্ঞাপন

এছাড়াও আদালতে গুলশান থানার ওসি ও সাতক্ষীরা থানার ওসির পক্ষেও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। আইনজীবী বি এম ইলিয়াস কচি আদেশের বিষয়টি সারাবাংলাকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় ব্যবসায়ীর চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক স্টেটমেন্ট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তারা আদালতে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করলে আদালত তাদের সতর্ক করে আবেদনটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন।’

রিটের পক্ষের আইনজীবী ইয়ারুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাতক্ষীরার ব্যবসায়ী শফিউর রহমানকে ব্যাংক স্টেটমেন্ট না দেওয়ায় ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন দুই কর্মকর্তা। একইসঙ্গে ব্যবসায়ী শফিউর রহমানের চাওয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট আদালতে জমা দিয়েছেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘আজ হাইকোর্ট ব্যাংকারদের উদ্দেশে বলেছেন, দায়িত্বশীল ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও আপনারা আদালতের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন। আশা করছি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’

এ সময় উপস্থিত এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আদালতকে জানান, আমরা আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আগামীতেও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আদালতের আদেশ মেনে চলব। হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করায় ইতোমধ্যে ওই দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এবং তাদের বিরুদ্ধে বাকি বিভাগীয় ব্যবস্থা (প্রসিডিউর) অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

আগামীতে ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন এবং আদালতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকবেন বলে শুনানিতে ব্যাংকারদের উদ্দেশে বলেন হাইকোর্ট।

এর আগে, গত ৩১ মে আদালতের আদেশের পরও সাতক্ষীরার ব্যবসায়ী সফিউর রহমানকে ঋণ সংক্রান্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট না দেওয়ার ঘটনায় এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ইভিপি আমিনুল ইসলাম ও সাতক্ষীরা ব্রাঞ্চের ম্যানেজারকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গুলশান ও সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়।

একইসঙ্গে তাদের ৫ জুন আদালতে হাজির করতে বলা হয়। বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এই আদেশের পর দুই কর্মকর্তা গত ২ জুন স্বেচ্ছায় হাইকোর্টে আত্মসমর্পণ করতে এসেছিলেন। তখন আদালত আজ (৫ জুন) তাদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, সাতক্ষীরার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পসহ চারটি প্রকল্পের কাজ পায় শফিউর রহমানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চার প্রকল্পের মধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজের অনুকূলে ঠিকাদার মো. শফিউর রহমান শফি এবি ব্যাংকের সাতক্ষীরা শাখা থেকে ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর ৭০ লাখ এবং ২০১২ সালের ১০ অক্টোবর ৭৫ লাখ, মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ‘গতি ঋণ’ নেন।

ঋণের শর্ত অনুযায়ী ব্যাংকের অনুকূলে চেক দিয়ে প্রকল্পের বিল (পাওনা) পরিশোধ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় চেকের মাধ্যমে সে বিল জমা হলে বিলের একটি থেকে ৪০ শতাংশ এবং আরেকটি থেকে ৪৫ শতাংশ ঋণ সমন্বয়ে করে কেটে রাখবে ব্যাংক। বাকি টাকা ঠিকাদার শফিউর রহমানকে দিয়ে দেওয়া হবে। প্রকল্পের কাজ শেষে ২০১৭ সালে দুই প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে পাউবো।

এরপর শফিউর রহমান হিসেব অনুযায়ী ব্যাংক ঋণ পরিশোধ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায় তার কাছে এখনও ১ কোটি ১৮ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৯ টাকা পাওনা রয়ে গেছে। এরপর ঋণের টাকা চেয়ে ২০১৭ সালে এবি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে।

পরবর্তী সময়ে শফিউর রহমান এবি ব্যাংকে পাউবো কোন তারিখে কত টাকার চেক জমা দিয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ চেয়ে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখা আবেদন করেন। তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত ১৮ মে ব্যাংক স্টেটমেন্ট চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন শফিউর।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে এবি ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে ৫ জুন হাইকোর্টে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর আজ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সতর্ক করে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

সারাবাংলা/কেআইএফ/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন