বিজ্ঞাপন

৯ মাসে ৪ বৈমানিকের হার্ট অ্যাটাক ও ১ জনের মৃত্যু

June 16, 2022 | 10:09 am

শেখ জাহিদুজ্জামান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: নিয়ম বহির্ভূতভাবে অধিক ফ্লাইট পরিচালনার কারণে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বাড়ছে বৈমানিকদের অসুস্থতার হার। এমনকি অতিরিক্ত ফ্লাইট চালাতে গিয়ে আকাশেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান ক্যাপ্টেন নওশাদ।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ ৯ মাসে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার কারণে বিমানের আরও চার বৈমানিকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। তারা হলেন: ক্যাপ্টেন মোকাচ্ছিদ, ক্যাপ্টেন আসিফ, ক্যাপ্টেন মঞ্জুরুল কাদের এবং ক্যাপ্টেন আনিস। যার মধ্যে, ক্যাপ্টেন মোকাচ্ছিদ ও ক্যাপ্টেন আনিস ড্যাশ ৮ বিমানের ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন আসিফ ও ক্যাপ্টেন মঞ্জুরুল কাদের বোয়িং ৭৭৭ বিমানের ক্যাপ্টেন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

সারাবাংলার এক অনুসন্ধানে বৈমানিকদের অসুস্থতার এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, ফ্লাইট পরিচালনায় বাংলাদেশ বিমানের বৈমানিকদের নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি সময় ফ্লাইট পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে বিমানে অতিরিক্ত নিয়ম বহির্ভূত ফ্লাইট পরিচালনা করে বৈমানিকরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

এদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে নতুন নতুন উড়োজাহাজ যোগ হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বিমান যোগ হবে। কিন্তু সেই তুলনায় বৈমানিক নিয়োগ হচ্ছে না। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বৈমানিক থাকার কথা ২৮০ জন কিন্তু রয়েছে মাত্র ১৫০। বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ রয়েছে ২১টি, সে তুলনায় বৈমানিক নেই।

বিজ্ঞাপন

আবার চলতি বছরে কিছু বৈমানিক নিয়োগ হলেও সেগুলো নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কিছু আদিষ্ট মহলের চাপে অভিজ্ঞ বৈমানিকদের নির্বাচন করা হলেও পরে নিয়োগ পরীক্ষার ফল স্থগিত করে রাখার নজিরও রয়েছে। সবমিলে অভিজ্ঞ বৈমানিকের সংখ্যার তুলনায় ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বৈমানিকদের নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনেক ফ্লাইট পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সারাবাংলার অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, খুবই কম সময় বিশ্রাম নিয়ে বৈমানিকদের আবার ফ্লাইট পরিচালনার জন্য পাঠানো হচ্ছে। এতে করে বৈমানিকরা মানসিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ৫০ এর বেশি বয়সের বৈমানিকদের অসুস্থতার হার সবচেয়ে বেশি। একাধিক বৈমানিক সারাবাংলাকে এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে চাকরির ভয়ে কেউ গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলতে চাননি।

বিজ্ঞাপন

তারা বলছেন, অপ্রতুল বিশ্রাম নেওয়া বৈমানিককে দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনায় যাত্রী এবং উড়োজাহাজ দুটির জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বৈমানিক সারাবাংলাকে বলেন, সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী বৈমানিকদের ফ্লাইং টাইম এবং ডিউটি টাইম আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেখানে এফএএ (ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন) এবং ইয়াসা (ইউরোপীয়ান অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি), কাসা এবং আইকাউ এর সঙ্গে মিল নেই। এছাড়া বাংলাদেশের বেবিচকের নিয়মের বাইরেও বৈমানিকদের আরও ১০০-২০০ ঘন্টা বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়। যার কোনো ডকুমেন্টস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে রাখা হয় না। এমনকি বৈমানিকরা বেবিচককে জানিয়েও কোন সুফল পাননি। তারাও নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে হজ ফ্লাইট চলছে এখানে বৈমানিকদের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। সামনে কানাডা ফ্লাইট চালু হচ্ছে সেখানেও বেশি বৈমানিক প্রয়োজন হবে কিন্তু আদতে বিমানের রুট বাড়লেও বাড়ছে না বৈমানিকের সংখ্যা।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, যেখানে ইয়াসা এবং এফএএ’তে একজন বৈমানিককে মাসে বা বছরে যতক্ষণ ডিউটি এবং ফ্লাইট করানো যায় তার থেকে বাংলাদেশের বৈমানিকদের ২০-৩০ শতাংশ বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করানো হচ্ছে। যেখানে ইয়াসা এবং এফএএ’তে বছরে একজন বৈমানিক ৭০০-৯০০ ঘন্টা ফ্লাইং করে সেখানে বাংলাদেশের বৈমানিকদের বছরে এক হাজার ঘণ্টার অধিক ফ্লাইং করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, বৈমানিকদের কর্মঘণ্টা মেনেই তাদের ব্যবহার করতে হবে। বৈমানিক সংকট থাকলেই এক বৈমানিককে দিয়ে বেশি ফ্লাইট পরিচালনা সেটা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এতে করে মানসিকভাবে বৈমানিকরা যেমন ভেঙ্গে পড়ে তেমনই যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকির পাশাপাশি বিমানেরও ঝুঁকি রয়েছে ক্ষতি হতে পারে। এতে করে বিমানের ওপর যাত্রীদের অনাস্থা তৈরি হবে। আর বিমানে বৈমানিক সংকট আগে থেকেই তাই এই সংকট দূর করা বিমানের প্রয়োজন। এছাড়া অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বৈমানিক নিয়োগ দিতে হবে,ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বৈমানিক সংকটের কারণে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনায় বৈমানিকদের অসুস্থতা এটা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অপরদিকে বিমানে এতো বৈমানিক সংকট থাকার পরও সম্প্রতি কোনো ধরণের নোটিশ ছাড়াই বাংলাদেশ বিমান থেকে অভিজ্ঞ এবং সিনিয়র বৈমানিক ক্যাপ্টেন মাহবুবকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিমানের কাছে বারবার কারণ জানতে চাওয়া হলেও কোন সদুত্তর মেলেনি।

এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ বিমানের এমডি ও সিইও আবু সালেহ মোস্তফা কামালকে একাধিকবার ফোন এবং মোবাইলে বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো ভ্রুক্ষেপ করেননি।

তবে বিমানের এমডি এবং সিইও এর হয়ে সাড়া দেন প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা তাহেরা খন্দকার। এ বিষয়ে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, বিমানের ৪জন বৈমানিক হার্ট অ্যাটাক করেছে এটি সত্য নয়। এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আর নিয়ম মেনেই বিমান বৈমানিকদের দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে। সিভিল এভিয়েশনও সবকিছু দেখভাল করছে। বিমান সকল নিরাপত্তা মেনে বৈমানিকদের দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। আর আমরা এমন করে থাকলে সিভিল এভিয়েশন রয়েছে তারা তদন্ত করুক দেখুক আমরা অনিয়ম করছি কি না? সেক্ষেত্রে এমন হলে আমরাও শাস্তি পাবো। আর কোন বৈমানিক সুস্থ না হলে বিমান থেকে সেইসব বৈমানিককে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বলা হয় না কিংবা করানো হয় না। ফলে অনিয়ম বিমান করছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিবো সংশ্লিষ্ঠ ডিপার্টমেন্টে। এছাড়া যদি কোন বৈমানিক নিয়ম না মেনে ফ্লাই করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারাবাংলা/এসজে/একেএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন