বিজ্ঞাপন

অগ্নিপথ কী? কেন ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ভারত?

June 20, 2022 | 11:19 am

ফিচার ডেস্ক

ভারত সরকারের নেওয়া এক প্রকল্পকে ঘিরে আন্দোলনে-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটি। ক্ষোভে ফেটে পড়া দেশটির জনতা ইতোমধ্যেই আন্দোলন করেছে বিহার, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ ও মধ্য প্রদেশে। একদিনের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১২টি ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ক্ষোভের আগুনে যেন জ্বলছে ভারত। যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। আন্দোলন দমন করতে বিভিন্ন রাজ্যে পুলিশি গুলি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে জনতার ক্ষোভ প্রশমন করে বিক্ষোভ কমাতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে সরকার। উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ব্যস্ত দেশটির মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, আমলারা। প্রকল্পে ছাড়-সংরক্ষণেরও ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্র। কিন্তু তাতে ক্ষোভ কমার লক্ষণ নেই। এক কথায় এই প্রকল্পটি নিয়ে একটু বেকাদায় পড়ে গেছে ভারতের সরকার।

অগ্নিপথ প্রকল্প কী?

বিজ্ঞাপন

যে প্রকল্প ঘিরে ভারতে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে সেটি সেনাবাহিনীর জওয়ান নিয়োগ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটির নাম ‘অগ্নিপথ’। সরকারের বক্তব্য, অগ্নিপথ প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার যুবক সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, চার বছর প্রশিক্ষণের পর দুই-তৃতীয়াংশকেই অবসর নিতে হবে। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, নিয়মানুবর্তিতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থেকে একটি বিশাল সামাজিক পরিবর্তন আশা করছে সরকার।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরো জানিয়েছে, ১৭-২১ বছরের তরুণ-তরুণীরা চার বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক সেনায় যোগ দিতে পারবেন। তাদের বলা হবে ‘অগ্নিবীর’। দেশটির সেনাবাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্টে কী ধরনের শূন্যপদ তৈরি হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করছে কতজন করে প্রতিবছর নিয়োগ করা হবে। শূন্যপদ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চতুর্থ বছরের শেষে সেই ব্যাচের সর্বাধিক ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই অন্তর্ভূক্তিরও আবার কয়েকটি শর্ত রয়েছে। প্রথম বছর নেওয়া হবে ৪০ হাজার তরুণকে। প্রথম বছর তারা পাবেন ৩০ হাজার টাকা। চতুর্থ বছরে সেই টাকার অংক দাঁড়াবে ৪০ হাজারে। আয়ের ৩০ শতাংশ তারা সঞ্চয় করতে পারবেন। সমপরিমাণ টাকা দেবে সরকারও। চার বছরের মেয়াদ শেষে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ২৫ শতাংশকে স্থায়ী কর্মী হিসেবে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হবে। বাকি ৭৫ শতাংশকে দেওয়া হবে ১০-১১ লক্ষ টাকা ভাতা। যা হবে সম্পূর্ণ করমুক্ত।

বিজ্ঞাপন

কেন অগ্নিপথ প্রকল্প?

ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প যুব সমাজকে দেশসেবা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ। নতুন এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি প্রশিক্ষিত বিকল্প বাহিনী তৈরি হবে। আর এভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ হলে সাশ্রয় হবে অনেক। সেই টাকা সেনাবাহিনীর উন্নতির কাজে লাগবে। কেনা হবে আরও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তি।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের গড় বয়স ৩২ বছর। অগ্নিবীর নিয়োগ হলে ১০ বছরের মধ্যে এই গড় নেমে আসবে ২৬ বছরে। ভারত পাবে শারীরিক সামর্থ্যে ভরপুর তরতাজা এক সেনাবাহিনী।

অগ্নিপথ ঘিরে কেন ক্ষোভের আগুন?

বিজ্ঞাপন

ভারতে গত সপ্তাহে প্রকল্পটি ঘোষণার পরেরদিন থেকে প্রতিবাদ শুরু হয় দেশটির বিভিন্ন অংশে। বিহার ও উত্তর প্রদেশে প্রথমে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সেনাবাহিনীর চাকরির ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। সরকারি চাকরি ও স্থায়িত্বের কারণে গরিব ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণেরা মূলত সেনাবাহিনীতে চাকরিকে বেছে নেন। কিন্তু নতুন এই প্রকল্পে তারা চাকরির নিশ্চয়তা দেখছেন না। বিহার ও উত্তরপ্রদেশের পর প্রতিবাদ ক্রমশই ছড়িয়ে পড়ে দেশটির রাজ্যে রাজ্যে। রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশসহ অন্য কয়েকটি রাজ্যের তরুণরা মূলত প্রতিবাদ জানায়।

অগ্নিপথ কী? কেন ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ভারত?
অগ্নিপথ বাতিলের দাবিতে কলকাতায় রেল স্টেশনে ভাঙচুর

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, দেশটির যে রাজ্যগুলির যুবকদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের হার বেশি, সেখানেই আন্দোলন অতিমাত্রায় ছড়াচ্ছে।

বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের ফুলঝুরি

নিয়োগপ্রত্যাশী আন্দোলনের সপক্ষে কথা হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন মহলেই। বামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জনতার এই আন্দোলনটিকে অনেকটা লুফে নিয়েছে। প্রতিবাদ কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন উঠছে চার বছর ট্রেনিংয়ের পর ‘অগ্নিবীর’ যারা চাকরি পাবেন না, তাদের কী হবে? এতে দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে? বিশেষ করে তারা যেখানে সেনাবাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এতে দেশের বেকারত্বের তেমন কোনো সুরাহা হবে না। উলটো, চাকরি পাওয়ার উপযুক্ত যোগ্যতা অর্জনকারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু তাদের চাকরি থাকবে না।

অগ্নিপথ কী? কেন ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে ভারত?
অগ্নিপথ প্রকল্পকে ঘিরে হায়দ্রাবাদে ট্রেনে অগ্নিসংযোগ

তবে এক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য, ভারতই এক মাত্র দেশ নয়, যেখানে এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি সেনাবাহিনীতে নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে বা শুরু হচ্ছে। এর আগে ইসরায়েল, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, চিন, ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশেই যুবসমাজকে দায়িত্ব পালনের আওতায় সাময়িক ভাবে সেনাবাহিনীতে নিজেদের অবদান রাখতে হয়। আর তাই, এ ধরনের নিয়োগকে কর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা না করে দেশের জন্য অবদান রাখার অপরিহার্য হিসেবেই বিবেচনা করা দরকার।

সরকারের এই যুক্তিরও পাল্টা বক্তব্য আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে বিষয়টি অন্য দেশগুলোর মতো নয়। কারণ এখানে দেশপ্রেমের চেয়ে কর্মসংস্থানের দিকটাই আরও বড়ো করে দেখা হয় বা দেখানো হয়। সরকারের এই নতুন প্রকল্প দেশের অর্থ বাঁচাবে এটি সত্যি কিন্তু এতে ভারতীয় সেনা ‘সিকিউরিটি এজেন্সি’-তে পরিণত হবে বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।

সারাবাংলা/এসবিডিই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন