বিজ্ঞাপন

রাবির হলে বেপরোয়া ছাত্রলীগ, প্রশাসন নির্বিকার

June 22, 2022 | 8:20 pm

মাহী ইলাহি, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট

রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের হল সম্মেলন হয় চলতি বছরের ১৪ মার্চ। এরপর গত ২৪ মার্চ ১৭টি হলের আংশিক কমিটির অনুমোদন দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। আংশিক কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন হলে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। একের পর এক বিভিন্ন হল থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে সংগঠনটির নেতাদের বিরুদ্ধে। তবে এসব ঘটনায় প্রাধ্যক্ষের কাছে জানিয়েও মিলছে না কোনো প্রতিকার।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে প্রশাসন। প্রায়ই শোনা যাচ্ছে অদৃশ্য ক্ষমতায় ছাত্রলীগের নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দিয়ে সিট দখল করছে। এ বিষয়ে হলের প্রাধ্যক্ষরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

গত শনিবার (১৮ জুন) মাদার বখ্শ হলের ২২৮ নম্বর কক্ষ থেকে ফোকলোর বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সালমান আহমেদকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউর রহমান রাথিকের বিরুদ্ধে। সালমান অভিযোগ করে বলেন, ২২৮ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও ‘অকথ্য’ ভাষায় গালিগালাজ এবং হুমকি দিয়ে তাকে বের করে দিয়ে কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন ছাত্রলীগ নেতা রাথিক। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রলীগের এই নেতা। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আর সেই কক্ষে উঠা ছেলেটিকেও আমি চিনি না।

বিজ্ঞাপন

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) রাকিবুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীকে সোহরাওয়ার্দী হলের ২৪৪ নম্বর কক্ষ থেকে নামিয়ে দেয় হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শামীম ওসমান। এরপর তিনি শফিউল্লাহ নামে এক কর্মী তুলেন। বিষয়টি প্রাধ্যক্ষ জানতে পারলে ছাত্রলীগ কর্মী শফিউল্লাহকে কক্ষ থেকে চলে যেতে বলেন। পুণরায় আবার রাকিবুল ইসলামকে ওই কক্ষে তুলে দেন। এঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে হলের প্রধান ফটকে তালা দেন ছাত্রলীগ নেতা শামীম ওসমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি প্রক্টর শরিফুল ইসলাম বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করে দেন।

সোহরাওয়ার্দী হল প্রাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, শামীম ওসমান অনাবাসিক ছাত্র। নিজে অনাবাসিক ছাত্র হয়েও অন্য আরেক অনাবাসিক শিক্ষার্থীকে হলে তুলেছেন। এটা এমনিতেই অন্যায়। কিন্তু ওই অনাবাসিক শিক্ষার্থীর বিছানাপত্র নিয়ে আসায় শামীম হলের গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। তার কাছে লিখিত চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু শামীম সবার মধ্যে থেকে লিখিত না দিয়ে চলে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, কে হলে উঠবে না উঠবে এর সিদ্ধান্ত ছাত্রনেতারা নিতে পারে না। গত মে মাসে হলে ৬৮ জন শিক্ষার্থীকে হলের আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নয় জনের বেশি সাধারণ শিক্ষার্থীও তুলতে পারিনি। যা সব ছাত্রলীগের নেতাদের দখলে আছে।

এর একদিন আগে মঙ্গলবার (১৪ জুন) দিবাগত রাতে নবাব আব্দুল লতিফ হলের সজিব কুমার নামে এক শিক্ষার্থীকে বের করে দেয় হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন ও তার অনুসারীরা। সজিব হলের ২০৪ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। পরে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ এইচ এম মাহবুবুর রহমান অন্য একটি কক্ষে তুলে দেন ওই শিক্ষার্থীকে।

বিজ্ঞাপন

হল কমিটির পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গত ১২ এপ্রিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক হল থেকে এক শিক্ষার্থীকে, ১৭ মে শহীদ হবিবুর রহমান হল থেকে একজনকে, একই হল থেকে গত ২৮ মে এক শিক্ষার্থী এবং ২ জুন রাতে শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল থেকে আরেক শিক্ষার্থীকে বের করে দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, বৈধ সিটের ভাড়া দিয়েও শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন বাইরে থাকছেন। হলে উঠলেও ছাত্রলীগ তাদের মেরে আহত করে নির্মমভাবে পিটিয়ে বের করে দেয়। সাংবাদিকরাও পর্যন্ত তাদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। নিজেরা ৭-৮ বছর আগে ছাত্রত্ব হারিয়ে আদু ভাই হয়ে তারা হলে সিট দখল করে রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি হলের প্রাধ্যক্ষ বলেন, হলে সিট বরাদ্দ করা হয় বৈধ শিক্ষার্থী দিয়ে। হলে তারা সবরকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। ছাত্রলীগের নেতারা নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্য করেন। না হলে বিভিন্নভাবে প্রাধ্যক্ষদের অসম্মানিত হতে হয়। এসব ঘটনায় নানাভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রায় সব হল প্রাধ্যক্ষের রয়েছে।

আরেক প্রাধ্যক্ষ বলেন, হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে সিট বরাদ্দ থাকলেও আমরা তাদের তুলতে পারছি না। বিভিন্ন কক্ষ ও সিট দখল করে নিয়ে আছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের কিছু বলা হলে তারা আমাদের শিক্ষক হিসেবে মানে না। বিভিন্ন সময় কটু কথাও বলে তারা। অনেক সময় অন্যায় আবদারও করে বসে। এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকই হলের দায়িত্ব নেবে না। আর এখন যারা আছেন তারাও ছেড়ে দিবেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে সেটি স্পষ্ট। আমরা হলগুলোতে রাজনৈতিক দখলদারিত্ব বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখিনি। বরং শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া, নির্যাতনের মতো অপসংস্কৃতি প্রকট হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি প্রশ্ন তুলতে চাই প্রশাসন কেনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না? এখানে তাদের মদদ আছে কি না সেটির প্রশ্নও তোলা সমীচীন বলে মনে করি। প্রশাসন যদি ছাত্রলীগকে সুবিধা দেয় কিংবা দিতে বাধ্য হয় সেটি অপরাধ। শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল ইসলাম বলেন, হলের সিট দখল নিয়ে অনেকে প্রশাসনকে দায়ী করছেন, তা মোটেও ঠিক না। সিট দখল অতীতেও ছিল এখনও আছে। দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সিট দখল হয়ে আসছে। আমরা সিট দখল বন্ধ করা চেষ্টা করছি। এখনও পুরোপুরিভাবে সিট দখল বন্ধ হয়নি। উপাচার্য মহোদয় বিষয়গুলো নিয়ে অবগত আছেন। এ বিষয় নিয়ে আমরা বৈঠক করব।

তিনি বলেন, যেসব শিক্ষার্থী ছাত্র সংগঠনের নামে সিট দখলের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও যারা হলের প্রাধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারাবাংলা/এসএসএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন