বিজ্ঞাপন

রংপুর ক্যান্ট স্কুলের প্রশ্ন নারীর পোশাক নিয়ে ‘রাজনীতি’র অংশ

June 23, 2022 | 10:11 am

রাজনীন ফারজানা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর’র দশম শ্রেণীর অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার একটি প্রশ্নের কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের সৃজনশীল অংশের প্রশ্নের ভাষাকে ‘সমস্যাজনক’ ও ‘আপত্তিকর’ বলে মন্তব্য করছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নিজেদের অভিমত জানিয়েছেন উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক অভিভাবকও। প্রশ্নের সৃজনশীল অংশে একটি উদ্দীপক ও তার প্রশ্নের মাধ্যমে মেয়েদের ছোট করার পাশাপাশি ইভটিজিংকে উসকে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।

বিজ্ঞাপন

উদ্দীপকটিতে লেখা হয়েছে- ‘বিত্তশালী বাবার একমাত্র মেয়ে সেজুতি এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়ে প্যান্ট শার্ট পরে আধুনিক ভাব ধরে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার বখাটে যুবকেরা প্রায়ই তাকে অশালীন কথাবার্তা বলে উত্যক্ত করে। এ ব্যাপারে সেজুতি বাবার নিকট অভিযোগ করলে, বাবা বলল তুমি শালীনভাবে চলাফেরা করো কেউ তোমাকে কিছু বলার সাহস পাবে না।’ উদ্দিপকের পর প্রশ্ন অংশে গ. প্রশ্নটি এভাবে করা হয়েছে- ‘অশালীন পোশাকের কারণে অধিকাংশ ইভটিজিং হয়ে থাকে।’ উদ্দীপকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।’ এরপর ঘ নং প্রশ্নটি- ‘সেজুতির বাবার কথার মূল্যায়ন কর।’

প্রশ্নপত্রের ভাষা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান এই স্কুলের এক অভিভাবক ড. গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার শিক্ষার্থীদের কী শেখাবে, কোন ধরনের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবে, সমাজের কাছে তার দায়বদ্ধতা কী, সেসব লিখিত না থাকলেও, অলিখিত একটা স্ফুরণ থাকে, আর সেটাই ওই প্রতিষ্ঠানের গুডউইল। এই সময়কালে রংপুর অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুর। এই প্রতিষ্ঠানটি নিচের প্রশ্নপত্রের আদলে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে কি না, তা কখনো ফলাও করে প্রচার করেনি। সেটা করেনি জন্যই আমাদের মতো অনেক অভিভাবক আমাদের সন্তানদের সেখানে পাঠিয়েছি। এই মানসিকতা ধারণ করার কথা প্রচার করলে সন্তানদের সেখানে দিতাম কি না, তা ভেবে দেখতাম। প্রতিষ্ঠানটি তার অবস্থান পরিষ্কার করুক, সেটা দাবি করছি। প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের ছেলেদেরকে ইভটিজিংয়ে উদ্বুদ্ধ করুক, বা আমাদের মেয়েদেরকে মানসিকভাবে অপদস্ত করুক, তা মেনে নিতে পারি না। টু দ্য পয়েন্ট ব্যাখ্যায় না গিয়ে, হতভম্ব হয়ে শুধু প্রতিবাদ জানিয়ে রাখলাম। (প্রশ্নপত্রে শব্দের বানান এবং আনুষাঙ্গিক ভুল এড়িয়ে)।’

বিজ্ঞাপন

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এই অধ্যাপক সারাবাংলাকে বলেন, এই প্রশ্নের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এর দায় কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষকের নয়, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এমন বার্তা ছড়ানোর মাধ্যমে মেয়দের সামাজিকভাবে হেয় করার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি এটি ইভটিজিংককে উস্কে দিতে পারে। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে, রংপুরের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়।

বিজ্ঞাপন
রংপুর ক্যান্ট স্কুলের প্রশ্ন নারীর পোশাক নিয়ে ‘রাজনীতি’র অংশ

এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ রংপুরের উপাধ্যক্ষ্য ফরহাদ উদ্দীন সরকার সারাবাংলাকে বলেন, তারা প্রশ্নপত্রের ভুলের বিষয়টি দেখেছেন এবং ভবিষ্যতে যেন এমন আর না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখবেন। অন্যদিকে এই প্রশ্ন যিনি করেছেন সেই শিক্ষকের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটি জানাননি এই শিক্ষক। একইসঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে স্কুল সম্পর্কে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানালেন সারাবাংলাকে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে স্কুলের রংপুর ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা রাকিন জাহির সারাবাংলাকে বলেন, অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার এই প্রশ্ন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানরই। তবে এই প্রশ্ন কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ পেলো তা খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

এই প্রশ্নপত্রে সেজুতির বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা উল্লেখ করে তার পোশাককে ‘আধুনিক’ হিসেবে অভিহিত করে সেটিকে ইভ টিজিংইয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ইভ টিজিংকে একটি স্বাভাবিক ও আবশ্যকরণীয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ যে ইভ টিজিংয়ের মত অপরাধ করছে তার কোনো দোষ নাই। সব দোষ মেয়েদের পোশাকের। এভাবে মেয়দের উপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের পেছনে তার পোশাক বা জীবনযাপনকে দায়ি করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মেয়েদের পোশাক নিয়ে একের পর এক সহিংসতার ঘটনাতেই এটি স্পষ্ট হয়। কিছুদিন আগে বাসের মধ্যে পোশাকের কারণে এক নারী কর্তৃক হয়রানির শিকার হন জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরা এক তরুণী। একই পোশাকের কারণে নরসিংদী বাস স্টেশনে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন আরেক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী। নরসিংদী স্টেশনে হয়রানিকারী নারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের কিছুদিনের মধ্যেই রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হলের সামনে আবারও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন আরেক তরুণী। রিকশা করে যাওয়ার সময় এই তরুণীর পোশাক খাবলে ছিঁড়ে নেয় মোটরসাইকেল আরোহী দুষ্কৃতকারী। এসবেরই ধারাবাহিকতায় এবার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রংপুরের মত স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশ্নপত্রে নির্যাতনের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করার ঘটনা ঘটল।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বাংলাদেশে মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এটি একক কোনো শিক্ষকের নয়, বরং পুরো সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের আদর্শের প্রতিফলন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। এর মাধ্যমেই বোঝা যায় আমাদের শিক্ষা কারিকুলামকে কীভাবে দেখা হচ্ছে। পুরো শিক্ষাকে সাম্প্রদায়িক করার প্রচেষ্টার অংশ এটি। ২০০০ সালের পর থেকেই আমরা এই নিয়ে বলে আসছি। ও তে ওড়না দিয়ে শুরু। সেসবেরই প্রতিফলন এখন নানাভাবে দেখা দিচ্ছে।

এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক সমাজ, এনসিটিবি সবারই দায় আছে বলে মনে করেন এই নারী নেত্রী। সমাধানের ক্ষেত্রেও তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, মর্যাদার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সিলেবাসেরও পরিবর্তন প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষকদের মাধ্যমেই সেটি করতে হবে। তাই তাদেরকে সময় থাকতেই সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে’, বলেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, নারী কি পরবে, কী করবে, কীভাবে চলবে, কী কাজ করবে কোথায় যাবে, কবে বিয়ে করবে, কবে বাচ্চা নেবে থেকে শুরু করে নারীর জীবনের প্রতিটি বিষয়ই নির্দিষ্ট করে দিতে চায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। নারীর স্বাবলম্বিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিকতা কমার কথা থাকলেও আদতে তা কমেনি। অনেকেই এখনও ভেতরে ভেতরে এটি পোষণ করে যা হয়ত আগে বলত না। কিন্তু এখন তারা এসব বলার অনেক সুযোগ ও জায়গা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদের নিচেও তাই তারা নারীর জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত সেই সম্পর্কে কথা বলে যায়। তাছাড়া ওয়াজের মাধ্যমেও একশ্রেণির মানুষ নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায় প্রতিনিয়ত। সেটিরও প্রভাব পড়ছে সমাজের মানুষের আচরণে। তাছাড়া আমাদের মিডিয়া এখনও নারীকে অধীনস্ত হিসেবে দেখায়। সেটিরও প্রভাব পড়ে সামাজিক আচরণে।

পোশাকের বিবর্তন বিষয়ে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ায় সে তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পোশাকের বের হতে শুরু করেছে। শাড়িকে বাঙালি পোশাক হিসেবে বলা হলেও একজন কর্মজীবী নারীর জন্য সবসময় শাড়ি পরে বাইরে কাজ করা সম্ভব না। বাইরে কাজের জন্য অনেকেই তাই শার্ট-প্যান্টের মত পোশাক বেছে নেন। অনেক তরুণী আবার নিতান্ত ভালো লাগা থেকে এটি পরেন। নারীর ক্ষেত্রে একে আধুনিক পোশাক হিসেবে বাতিল করে দেওয়ার চেষ্টা হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে কিন্তু তা হচ্ছে না। পুরুষরা এই পোশাক বেছে নিলে তাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশে স্বাধীনতার আগে থেকেই শার্ট-প্যান্ট পরত মেয়েরা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলনেও এমন পোশাক পরে যুদ্ধ করেছে নারীরা। কিন্তু তখন বা স্বাধীনতার পরেও এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলত না। কিন্তু বর্তমানে নারী নির্যাতনের সঙ্গে তার পোশাককে দায়ি করা হয়। কিন্তু আমরা নিকট অতীতে দেখেছি হিজাব পরেও ধর্ষণ বা হত্যার হাত থেকে রক্ষা পায়নি অনেক মেয়ে। তাই নারী নির্যাতনের জন্য পোশাককে দায়ি করা সম্পুর্ন অবাস্তব।

নারীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করার এই চলমান ঘটনাগুলোকে একই সূত্রে গাঁথা বলে মনে করেন এই সমাজবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, সবকিছুরই মূলে নারীকে নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা। স্কুলের শিক্ষক বিচ্ছিন্ন কেউ নন। এই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে তিনি অন্যভাবে সামাজিকীকরণের চেষ্টা করেছেন, সম্পূর্ন নিজস্ব মানসিকতা প্রচার করেছেন।

এসব ঘটনা রোধে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ড. সাদেকা হালিম। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী নিজেও একজন নারী। আশা করব তিনি এটি নিরসনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সারাবাংলা/আরএফ/এসএসএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন