বিজ্ঞাপন

‘জঙ্গিবাদ আটকাতে না পারলে থমকে যেত বাংলাদেশ’

July 1, 2022 | 7:55 pm

উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: একটা সময়ে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা দমন করতে সফল হয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মো. আসাদুজ্জামান। ওই সময় জঙ্গিবাদকে দমন করা সম্ভব না হলে বাংলাদেশের অগ্রগতি থমকে যেত বলেও মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ২০১৬ সালের আজকের এই দিনে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছিল। তা বর্তমানে নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিবাদকে আটকাতে পেরেছে। জঙ্গিবাদ আটকাতে না পারলে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারত না। থমকে যেত বাংলাদেশ।

শুক্রবার (১ জুলাই) হলি আর্টিজানে হামলার ছয় বছর পূর্তিতে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান সারাবাংলার সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

এসময় আসাদুজ্জামান আরও বলেন, জঙ্গিবাদকে আটকাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। তাদের প্রাণের বিনিময়ে আজ বাংলাদেশ জঙ্গিমুক্ত। তাদের আত্মত্যাগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের আরও বেশি উজ্জীবিত করেছে। ফলে আজ বাংলাদেশে জঙ্গিরা আর মাথাচারা দিয়ে উঠতে পারছে না।

জঙ্গিবাদ দমনে জনগণের সহায়তার কথাও তুলে ধরেন কাউন্টার টেরোরিজমের এই কর্মকর্তা। বলেন, ২০১৬ সালের ভয়াবহ হামলার আগেও পুলিশ জঙ্গিদের গ্রেফতার করত। এ নিয়ে বাংলার মানুষ নানাভাবে ট্রল করত। বলত, বানানো গল্প। পুলিশ নাকি নাটক বানায়। কিন্তু ওই হামলার পর সারাদেশের মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করল। এরপর সারাদেশের মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কাজ করতে সুবিধা হয়েছে পুলিশের।

বিজ্ঞাপন

সিটিটিসি প্রধান বলেন, আমরা বসে নেই। সারাবছরই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ করা হচ্ছে। মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। সারাদেশে সেমিনার, সভা, মিটিং, ওয়ার্কশপ করানো হচ্ছে। সব পেশার মানুষকে সেখানে অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে। জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোতে নজরদারি চালানো হচ্ছে। সিটিটিসির উইং সংখ্যা থেকে শুরু করে সবকিছুরই সক্ষমতা বেড়েছে। সেসব নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখন জঙ্গিরা যে কেউ মাথাচারা ওঠার চেষ্টা করলেই সঙ্গে সঙ্গেই তাদের আমরা আটকে দিতে সক্ষম হচ্ছি।

সিটিটিসি জানিয়েছে, ২০১৬ সালের পর দেশে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুই হাজার ৪১০ জনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছে এক হাজার ৬৭৮ জন। বাকি ৭৩২ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশের দুইটি ইউনিট। এর মধ্যে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ৫৫৯ জনকে এবং অ্যান্টিটেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) গ্রেফতার করে ১৭৩ জনকে।

বিজ্ঞাপন

সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ছয় বছরে তাদের অভিযানে গ্রেফতার ৫৫৯ জনের মধ্যে নব্য জেএমবির সদস্য ২০৪ জন। নব্য জেএমবির সদস্যরাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা করেছিল। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।

এদিকে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মুখপাত্র পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সারাবাংলাকে বলেন, সারাবছরই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অভিযান থাকে। কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র বা ধ্বংসাত্মক কিছু থাকে না। বেশিরভাগের কাছেই জিহাদি বই পাওয়া যায়। কেউ কেউ সাইবার ওয়ার্ল্ডের যুক্ত। এরা জঙ্গিবাদকে প্রসারিত করার অভিপ্রায়ে মাঠে নামে। এদের সঙ্গে বিদেশি কোনো সংযোগ একীভূত হয়ে বড় কিছু যেন গড়তে না পারে, সেজন্য শুরুতেই এদের গ্রেফতার করা হয়। আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে গ্রেফতার জঙ্গিদের মধ্যে জেএমবির ৯৯ জন, আনসার আল ইসলামের ১৩৬ জন ও হরকাতুল জিহাদের ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অধিকাংশ শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করার কারণে সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই স্মরণকালের ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে উঠেছিল রাজধানী ঢাকা। অভিজাত গুলশান এলাকায় হলি আর্টিজান বেকারি ও রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ সেই জঙ্গি হামলায় ১৭ জন বিদেশিসহ নিহত হন মোট ২২ জন। রাতভর জিম্মি করে রাখা হয় বেকারির স্টাফ ও সেখানে যাওয়া বেশ কয়েকজন অতিথিকে। শেষ পর্যন্ত সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ইউনিটের নেতৃত্বে অপারেশন ‘সার্চ লাইটের’ মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে সেই কালরাতের। নিহত হয় হামলাকারী ৫ জঙ্গি। সেই হলি আর্টিজান হামলার ছয় বছর পূর্ণ হলো আজ।

ভয়াবহ সেই হামলায় ইতালির ৯ জন, জাপানের সাত জন, ভারতের এক জন ও দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হন। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে রুদ্ধশ্বাস সে পরিস্থিতির সমাপ্তি ঘটলে সেখান থেকে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে রেস্তোরাঁর প্রধান শেফ সাইফুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার হয়। সাইফুলের সহকারী জাকির হোসেন শাওন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

একই ঘটনায় সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের ছোঁড়া গ্রেনেডের আঘাতে রেস্টুরেন্টের বাইরে নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম ও বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাউদ্দিন খান।

হামলার তিন দিন পর ২০১৬ সালের ৪ জুলাই নিহত ৫ জঙ্গিসহ অজ্ঞাতদের আসামি করে গুলশান থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করেন গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিপন কুমার দাস। ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম বিভাগের পরিদর্শক হুমায়ূন কবির ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

বিচারিক আদালত ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট পলাতক আসামি মো. শরিফুল ইসলাম ও মামুনুর রশিদের সম্পত্তি ক্রোক ও তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেন। ওই বছরেরই ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

এক বছর ধরে মামলার বিচারকাজ পরিচালনার পর ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। রায়ে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও একজনকে খালাস দেওয়া হয়।

এই মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র‌্যাশ, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে খালাস দেন আদালত।

নিয়ম অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য মামলার নথিপত্র বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা খালাস চেয়ে আপিল করেছিলেন। ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি সেই আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে জেল আপিল শুনানিও এখনো অপেক্ষমাণ। মামলার পেপারবুক তৈরি হলেও আড়াই বছরেও সেই শুনানি আর হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ইদুল আজহা ঘিরে আদালতের অবকাশ শেষ হলে তারপর এই শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সারাবাংলা/ইউজে/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন