বিজ্ঞাপন

‘বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখাটাই কষ্টকর হয়ে গেছে’

July 6, 2022 | 4:40 pm

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখাটাই অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয় বহুল হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আর আমেরিকার স্যাংশন নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছে সারাবিশ্বে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (৬ জুলাই) ‘চুয়েট শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর, শেখ জামাল ডরমেটরি ও রোজী জামাল ডরমেটরি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। এ সময় গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।

মানুষের কল্যাণে যা করা দরকার সরকার সেটাই করছে জানিয়ে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন আমরা বাড়িয়েছি। সেই বিদ্যুৎ আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ঘরে দিতে সক্ষম হয়েছি। তবে আপনারা জানেন যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমেরিকা রাশিয়ার উপর স্যাংশন দিল, ইউরোপ স্যাংশন দিল। ফলে ফলাফলটা এই দাঁড়িয়েছে যে, এখন তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, ডিজেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকটি জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এলএনজি ও ফার্নেস ওয়েলের দামও বেড়ে গেছে।’ এ সময় ফার্নেস ওয়েল, এলএনজি, ডিজেল কয়লাসহ বিভিন্ন উপকরণে ভতুর্কির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে ফার্নেস ওয়েলের দাম ছিল মাত্র ৭০৮ টাকা, সেটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর হয়ে গেছে ১০৮০ টাকা অর্থাৎ ৩৩২ টাকা বা ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এলএনজি এক ঘনফুট যেটা মাত্র ১০ মার্কিন ডলারে কেনা যেত এখন তা ৩৮ মার্কিন ডলার। এলএনজির দাম বেড়েছে ২৮০ শতাংশ। কয়লা সেটাও ১৮৭ মার্কিন ডলার ছিল। এখন তা ২৭৮মার্কিন ডলার। দাম বেড়েছে ৬১ শতাংশ। ডিজেল যেটা ছিল ৮০ মার্কিন ডলার, সেটা ১৩০ ডলারে চলে আসছে। শোনা যাচ্ছে, ডিজেল নাকি দুইশ-তিনশ ডলার পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে সারাবিশ্ব। আর আমরা তো অনেক নির্ভরশীল ডিজেলের উপর। সেই ডিজেলের দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে ২৮ শতাংশ বেড়েছে।’ ডিজেলের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। আর এই স্যাংশনটা যদি না হতো তাহলে রাশিয়ার ও ইউক্রেন থেকে তাদের তেল, ফার্টিলাইজার ও গমের সাপ্লাইটাও ঠিক থাকত বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যদিও জাতিসংঘের সেক্রোটারি জেনারেলের উদ্যোগে একটা চ্যাম্পিয়ন গ্রুপ হয়েছে, সেই গ্রুপের মেম্বার আমি। সেখান আলোচনার হয়েছে। এবং দেশ দুটো থেকে খাদ্য ও ফার্টিলাইজার যাতে তারা আসতে দেয় এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্যাংশনের কারণে আমরা ডলার দিয়ে রাশিয়া থেকে জিনিস কিনতে পারছি না। কাজেই ফাইন্যান্সিয়াল মেকানিজমটা যে কী হবে তার উত্তর কেউ দিতে পারেনি। ইউরোপেরও খুবই দুরাবস্থা। যদিও তারা রুবেল দিয়ে কিনে নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের তো সে সুযোগ খুব সীমিত। তবুও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছি, এটা ঠিক। কিন্তু বর্তমানে আমাদের লোডশেডিং করতেই হবে এবং উৎপাদনও আমাদের সীমিত রাখতে হবে। যাতে আমাদের এই ভতুর্কিটা না দিতে হয়। ভুর্তকির ব্যাপারেও আমি আপনাদের জানাতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতে মোট ভতুর্কি দিতে হচ্ছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। আর যে এলএনজি আমদানি করছি, সেখানে ভুতর্কি দিতে হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি কিউবেক মিটার এলএনজি কিনতে সরকারের ব্যয় হয় ৫৯ দশমিক ৬০ টাকা। আমরা সেটা গ্রাহকদের দিচ্ছিলাম ৯ দশমিক ৬৯ টাকায়। যেটা সম্প্রতি ১১টায় উন্নীত করা হয়েছে। তারপরও বিশাল অংকের ভতুর্কি রয়ে গেছে সেখানে।’

বিজ্ঞাপন

এভাবে ফার্নেস ওয়েলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভতুর্কির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই যে একটা বিশাল অংক আমরা ভতুর্কি দিয়ে যাচ্ছি। এই ভতুর্কি কতক্ষণ আমরা দিতে পারব। এবারের বাজেটেও ৮৪ হাজার কোটি টাকা ভতুর্কি দিতে হবে। কিন্তু আমরা যদি ভতুর্কি না কমাই সরকারের টাকা আসবে কোথা থেকে? যুদ্ধের কারণে সবকিছুর দামই বেড়ে যাচ্ছে। যেগুলো আমাদের কিনে আনতে হয়। ভোজ্য তেলও আমাদের আনতে হচ্ছে।’

বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার কথা ফের স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন একটাই উপায়; ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, এলাকাভিত্তিক কখন কোন এলাকায় কত ঘণ্টা লোডশেডিং হবে- এটার একটা রুটিন তৈরি করা। যাতে মানুষ সেই সময়টায় প্রস্তুত থাকতে পারে। মানুষের সাময়িক কষ্টটা যেন আমরা লাঘব করতে পারি। সেই বিষয়টাই আমাদের এখন নজরে দিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সরকারপ্রধান বলেন, ‘বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে দেওয়া আমেরিকার স্যাংশনটা নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছেভ। আমেরিকার মানুষও তো কষ্ট পাচ্ছে। ওরা তো আবার মানুষের খুব বেশি কেয়ার করে না আমাদের মতো। তাদের ধারণা, মানুষ যার যার মতো নিজে করে খাবে। আমরা তা না, মানুষ কেমন থাকে আমরা সেই দিকে দৃষ্টি দিই। আমাদের দেশের মানুষ ‍যাতে একটু ভালো থাকে সেই চেষ্টাই আমরা করি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে যে উদ্যোগটা এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই আমাদের ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে সবাইকে আমরা যে শিক্ষাটা দিচ্ছি, তার ফলাফলটা এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে।’ সরকার এক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশবাসীর কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আগামীতে বাংলাদেশে গার্মেন্টেসের সঙ্গে সঙ্গে সমানতালে ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনে জোর দিতে হবে। এবং সেগুলো রফতানিতেও পদক্ষেপ নিতে হবে। রফতানির ক্ষেত্রে এটাই হবে মূল পণ্য। ডিজিটাল ডিভাইস রফতানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের সরকার কাজ করে যাচ্ছে।‘ সেই লক্ষ্যে সারাদেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোনো ক্ষেত্রেই যেন আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে পিছিয়ে না থাকে- সেইভাবেই তাদের প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থাটা করে দিচ্ছি।

এদিকে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সফল উদ্যোক্তা তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনকে আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সুযোগ আরও অবারিত করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্জনের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চুয়েটে প্রথম শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেটর স্থাপন করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। অনুষ্ঠানটি গণভবন, আইসিটি মন্ত্রণালয় ও চুয়েট তিন প্রান্ত থেকে একযোগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম-৬ সংসদীয় আসনের এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, চুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল আলম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

সারাবাংলা/এনআর/পিটিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন