বিজ্ঞাপন

‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’

July 6, 2022 | 4:53 pm

রাজন ভট্টাচার্য

“আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম
যার উদ্দেশ্যে ধ্রূপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ প্রশস্তি লিখেছিলাম
গতকাল বলাই বাবু বললেন, ‘ঐটি বাঁদরলাঠি গাছ’।
...আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্ পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

বিজ্ঞাপন

‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ কবি তারাপদ রায়ের এই কবিতাটি সময়ের কারণে খুব বেশি মনে পড়ছে। আশুলিয়ায় শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে হত্যা, নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানো, সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে নিগৃহীত ও জেল খাটার ঘটনা দেশের বিবেকবান সবাইকে চরমভাবে ব্যথিত করেছে। এসব ঘটনা সমাজের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

একের পর এক শিক্ষকদের ওপর এরকম ঘটনা ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখে ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ কবিতাটি বারবার মনে পড়াই স্বাভাবিক। চোখের সামনে আগামী প্রজন্ম ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। অথচ সবাই নিজেকে নিয়ে আছি। প্রতিকারের ভাবনা ভাবিনি। তাইতো বলতে হয় নিজেদের অজান্তের আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। সবাই নিজেদের প্রয়োজনে ব্যস্ত থেকেছি, এখনও আছি। সমাজের চিত্র বদলে যাচ্ছে, শিশুরা বিপথগামী হচ্ছে, গ্যাং কালচারে জড়াচ্ছে, নেশাগ্রস্ত হচ্ছে কোন কিছুতেই চোখ পড়েনি। এভাবেই সামনে এসেছে সর্বনাশ। এ কারণেই সর্বনাশ বলছি, নতুন প্রজন্ম যদি বিপথগামী হয় তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কী থাকে। আমরা কতোটুকু সামনের দিকে, আলোর দিকে এগিয়ে যেতে পারব? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিপথগামী হওয়া মানেই জাতি পেছনের দিকে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপন

পেছনে যাওয়ার আলামত হলো; ছাত্রের হাতে শিক্ষকের মৃত্যু, লাঞ্ছনা, জুতার মালা পরানো সহ একের পর এক নির্যাতনের ঘটনা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, পিতৃতুল্য শিক্ষককে ছাত্ররা মারছে, নির্যাতন করছে একটুও অনুশোচনা বা বুক কাঁপেনি তাদের? তাহলে ডর, ভয় ওঠে গেছে বলবো? ভয় ওঠে যাওয়া মানেই সে ব্যক্তি যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরে চলতি ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না। সমাজের সাংস্কৃতিক ও নৈতিকতার সূচক এখন নিন্মমুখি। এক সময়ে এ রকম ঘটনা ছিল অকল্পনীয়। এখনও মুরুব্বিরা এসব ঘটনা শুনে চমকে ওঠেন। বিষ্ময় প্রকাশ করেন। জিহ্বায় কামড় পড়ে। শিক্ষককে পেটানো, খুন করা, মামলা দেওয়ার ঘটনা ২০ বছর আগেও শুনিনি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের লেলিয়ে দেয়া, ধর্মীয় ইস্যু তোলে শিক্ষদের লাঞ্ছনা, জেলে দেয়া এক সময় এসব বিষয় ছিল একেবারেই চিন্তার বাইরে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বায়ন, অবাধ তথ্য প্রবাহ, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, হিরোইজম, প্রেমের ঘটনা থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক নজরদারির অভাবে দিন দিন শিশুরা বেপরোয়া হয়ে ওঠছে। গ্রাম বা মহল্লায় কেউ অন্যায়ের জন্য শাসন করলে কিশোররেরা এখন আর স্বাভাবিকভাবে নেয় না। তারা বেপরোয়া আচরণ করে। স্কুলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের একটু বেশি শাসন করলে অভিভাবকরা তা মেনে নিতে চান না। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শুরু হয়ে যায় বিচার, সালিশ।

কথা হলো এসবের কী কোন প্রতিকার নেই? সবাইকে প্রতিকারের চিন্তা মাথায় নিয়ে মাঠে নামা উচিত। কারণ সবার অগোচরে যদি আমাদের সন্তানরা বিপথে চলে যায় তাহলে এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? একের পর এক শিশু-কিশোরেরা যদি অপরাধ করতে থাকে তাহলে তো সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। আন্তর্জাতিক বিশ্বেও আমাদের নত হয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

অনেকে বলছেন, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নয়ন ঘটেনি বলেই শিক্ষকের গায়ে ছাত্রের হাত দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ থেকে বের হতে গেলে একটা সামাজিক বিপ্লব দরকার। আর তার জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক জাগরণ। আমি নিজে বিশ্বাস করি একটি শিশু বা কিশোর যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ‘জাতীয় সঙ্গীত’ গাওয়ায় মন থেকে অংশ নেয় সে কখনও বিপথগামী হতে পারে না। তার নিষ্পাপ হাত কখনও শিক্ষকের গায়ে উঠতে পারে না।

সময়ের কারণে হয়ত সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা শিশুদের সঠিকপথে পরিচালিত করতে নতুন নতুন পরামর্শ দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধের অবক্ষয় রুখতে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি যুক্ত করারও দাবি উঠেছে। একইসঙ্গে সকল শিক্ষাঙ্গনে সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করারও পরামর্শ এসেছে।

বিজ্ঞাপন

এতোকিছুর কারণ হলো, আমাদের সমাজে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার আজ বড় অভাব। মানুষ ঘরের মধ্যে আটকে থাকছে, মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ছে। খেলাধুলা করার মাঠ নেই, যাত্রা-নাটক বন্ধ হয়ে গেছে। কবিতা আবৃত্তির চর্চা নেই, সিনেমাও দেখছে ঘরে বসে। সার্বিকভাবে বললে সুস্থ বিনোদন ও পরিবেশের অভাব। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিস্তারে সামাজিক কোনো অনুশীলনও কমছে। এখন গ্রামের ছেলেমেয়েদেরও অভিভাবকরা হাত ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। একসময় যা ছিল না। আবদ্ধ থাকা মানুষ আক্রোশ অনুভব করে। সমাজের ওপর তার ক্ষোভ তৈরি হয়। যার প্রভাব কিন্তু দেখতে পাচ্ছি।

যেসব দেশ সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা করছে তারা সভ্য জাতি হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নতি করছে। কিন্তু আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক খাতে দিন দিন বাজেট কমছে। সাংস্কৃৃতিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত জাতীয় সংগঠনগুলো আজ ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট অন্যদিকে কর্মী না থাকা।

এককথায় প্রজন্মকে সুপথে আনতে সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়ানো দরকার। কেন তরুণ-কিশোররা সহিংস হবে, তারাই তো একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছে। তারাই তো ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ছিনিয়ে এনেছে ‘বাংলা ভাষা’। ১৯৫২ সালের পর যত আন্দোলন হয়েছে এর সবকটিতেই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে দেশের ছাত্র সমাজ।

নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। এজন্য নৈতিক শিক্ষার পশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা বড় পরিসরে শুরু করতে হবে। ভাষা আর মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে। কমাতে হবে ডিভাইস আসক্তি। নেশা, জুয়ার অন্ধকার জগত থেকে শিশুদের এনে সংস্কৃতির নেশায় ডুবিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

এজন্য সারাদেশের পাঠাগারগুলোকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে রাষ্ট্র সহযোগিতা করতে পারে। সরকারী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্রিয় করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতি কর্মকাণ্ড বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে গল্প বলা কর্মসূচী নেয়া দরকার। তাহলে প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম জেগে ওঠবে।

পাঠাগারগুলোতে, কিশোর-তরুণরা বই পড়বে, লিখবে, খেলবে, কুচকাওয়াজ করবে, ছবি আঁকবে, রাস্তাঘাট-পুল-সাঁকো তৈরিতে শ্রম দেবে, নাটক করবে, কবিতা-ছড়া লিখবে, দেয়াল পত্রিকা বের করবে, সমাজের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এতে উৎসাহ যোগাবে বড়রা।

সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের নিপীড়ন ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা। আগের ঘটনাগুলোর কোনো বিচার না হওয়ায় সন্ত্রাস, সহিংসতা বারবার ঘটে। তাই বিচারের দৃষ্টান্ত দরকার। প্রতিটি ঘটনার পরপরই অপরাধীদের দ্রুত বিচার করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে মানুষ ঘটনা ভুলে যায়। নতুন নতুন ঘটনা সামনে আসে। দ্রুত বিচার হলে অন্যরা অপরাধ করতে ভয়ে থাকে।

বদলাতে হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনৈতিক কারণে নতুন প্রজন্মকে ব্যবহার করা যাবে না। ধর্মীয় ইসুতে শিক্ষার্থীদের যারা ব্যবহার করছে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে আমরা কঠিন অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। ফলে কেউ ভালো থাকবে এমন ধারণা করার কারণ নেই। তাই সবাইকে নতুন প্রজন্মের দিকে নজর দেয়া যেমন প্রয়োজন তেমনি সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার জন্য আমাদের সবাইকে একযোগে মনোনিবেশ করতে হবে। যেন রাষ্ট্র দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়ায়। বারবার বলতে না হয় আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

সারাবাংলা/এসবিডিই/এএসজি

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন