শনিবার ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

পরিকল্পনায় আমরা সুদূরে দৃষ্টি দিতে পারতাম না, এখন পারি

এপ্রিল ২২, ২০১৮ | ১:১৭ অপরাহ্ণ

।।মাহমুদ মেনন, জোসনা জামান ও তুহিন সাইফুল।।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা করতে জানে না… এই অভিযোগ বরাবরের। হা-হুতাশের উচ্চারণও বেশ শোনা যায়- আহা আগেই যদি পরিকল্পিতভাবে এই দেশটাকে গড়ে তোলা যেতো… আজ নাগরিকদের এত ভোগান্তি হতো না। কেউ কেউ ইউরোপ- আমেরিকা এমনকি পাশের দেশ ভারত- মিয়ানমার- নেপাল ঘুরে এসেও বলেন আহা ওদের দেশ কতটা গোছানো। উন্নয়ন পরিকল্পনায় ওরা কত এগিয়ে! বাংলাদেশের জন্য তেমন দিনটি কবে আসবে?

সে প্রশ্নের উত্তর এখন অনেকের কাছেই আছে। বাংলাদেশে এখন বাস্তবায়িত্ব হচ্ছে রূপকল্প ২০২১, ভিশন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি ওয়ান নামে যা সমধিক পরিচিত। সে রূপকল্পে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়নও হয়ে গেছে কিংবা যাচ্ছে। আরও সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনায় এখন দেশ এগুচ্ছে ভিশন টুয়েন্টি ফোর্টিওয়ানের পথেও। তাতে একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ নিয়েও এখন কাজ করছে। যাতে পরিকল্পনাবিদরা সামনে রেখেছেন আগামী ১০০ বছরের বাংলাদেশ।

এসব বিষয় নিয়েই সারাবাংলার একটি টিম হাজির হয়েছিলো পরিকল্পনা মন্ত্রণালযের সদস্য (সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায়) সাধারণ অর্থনীতি বিভাগে দায়িত্বরত ড. শামসুল আলমের কাছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেশকে উন্নয়নের পথ দেখাচ্ছেন নিজস্ব পরিকল্পনাজ্ঞানে।

বিজ্ঞাপন

সারাবাংলাকে বললেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাংলাদেশ করতে পারে না, সে বদনাম, এক সময় ছিলো। নিশ্চয়ই একদিন এ বদনাম পুরোপুরি ঘুচবে। আজকে যেসব উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হচ্ছে তার সুফল একদিন ভোগ করবে পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষগুলো।

কৃষিব্যবসা ও বিপণনে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের শিক্ষকতার শেষে এখন দেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখছেন। ২০০৯ সালে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে তিনি দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র, দিন বদলের পদক্ষেপ নিয়ে কাজ কনে। তবে অন্যতম ছিলো রূপকল্প ২০২১ এর পরিকল্পনা গ্রহণ, যেটি বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদী (২০১০-২০২১) পরিকল্পনা। এছাড়াও তার অংশগ্রহণে তৈরি হয়েছে ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। তবে দেশ আজ পরিকল্পনা করতে বসেছে ১০০ বছর সামনে রেখে। যার নাম বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০। যার অন্যতম সদস্য এই ড. শামসুল আলম।

সারাবাংলা: আপনারা যখন কোন পরিকল্পনা করেন তখন কোন বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রেখে তা সাজান? আর এতো দূরের সময়টিকে একসঙ্গে দেখার কৌশলটা কী?

ড. শামসুল আলম: প্রথমে আমরা মূল লক্ষ্যটা ঠিক করি। আর সেটি আর কিছুই নয়- স্রেফ জনজীবনের মান উন্নয়ন। তো জীবন মানের উন্নয়নে প্রয়োজন প্রবৃদ্ধি। সেটাকে সামনে রেখেই কাজ করি। প্রবৃদ্ধি বিষয়টা হলো- আমরা প্রত্যেক বছর যে পরিমান সম্পদ সৃষ্টি করি, যাকে আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি দেশজ আয় বা জাতীয় আয় তা আগের বছরের তুলনায় কত কম বা বেশি। এই যে পরিবর্তনটা হয় এটাকে আমরা বলি মূল্য সংযোজন। এই মূল্য সংযোজনের হারটাই হলো প্রবৃদ্ধির হার। প্রবৃদ্ধি মানে হলো আমাদের মাথাপিছু আয় কতো বাড়লো বা দেশের প্রবৃদ্ধির হার কতো বাড়লো। এই বাড়ার সঙ্গে কিন্তু আমাদের জীবনের মান উন্নয়নের প্রশ্ন জড়িত। আমার আয় বাড়লে জীবনের মানও বাড়বে। আয় বাড়াতে গেলেই কাজ প্রয়োজন হবে। কাজ সম্পাদন করতে গেলেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তো পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে, ভিশন ২০২১ যখন আমাদের হাতে দেয়া হয়, তার মধ্যে একটা রূপকল্প ছিলো যে আমরা মাথা পিছু ২০০০ ডলার করতে হবে। ২০১৪ সালের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। ২০২১ এর মধ্যে নিরক্ষরতা শূন্যে আনা হবে। এই যে মূল কতগুলো লক্ষ্য নির্ধারণ করলাম, তখন সেটা অর্জন করার কৌশলগুলো বাতলে দেওয়াই ছিলো কাজ। আমরা সেটাই করেছি। সাথে অর্থ ব্যয়ের দিকটিও রয়েছে। মানে কোথায় ব্যয় করবে সরকার? কতো ব্যয় করবে? শিক্ষায় কত ব্যায় হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় কতো হবে, বিদ্যুত ব্যবস্থায় কতো করবে সেই চিন্তা ভাবনাটা আমরা করি, তার পরে এগোই।

২০০৯ সালে যখন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসে তখন মূল সমস্যাটা ছিল বিদ্যুৎ। দিনে প্রায় তের-চৌদ্দ ঘন্টা লোডশেডিং থাকতো। আমরা তখন অন্যতম লক্ষ্য ঠিক করি লোডশেডিং দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। বছর বছর কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২১ গিয়ে আমরা কতো সক্ষমতা বাড়াতে পারবো সেটিও আমরা লক্ষ্য নির্ধারণ করে নেই। সে পরিকল্পনামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ তার লক্ষ্য পূরণের পথে সঠিক ভাবেই এগিয়ে চলেছে।

পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো দারিদ্র্যটা দ্রুত কমিয়ে আনা, আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এবং এই কর্মসংস্থান বছরে কতো বাড়বে তারও একটা লক্ষ্য আমরা ঠিক করি। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার আওতায় আমরা এর বাস্তবায়ন শুরু করি। ঠিক হলো এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। ষষ্ঠতে আমাদের কি পরিমান প্রবৃদ্ধি হবে, কতো কর্মসংস্থান হবে, দারিদ্র কতো নেমে আসবে, পরিষ্কারভাবে আংকিক হিসেবে আমরা সেই হিসাব গুলো বের করলাম, এবং মোটামুটি আমরা বলবো যে আমরা সফলও হয়েছি। যদিও সেসময় লক্ষের দিক থেকে একটু বেশিই ধরেছিলাম। এই জন্যই যে বেশি প্রণোদনা দেয়া, সামনে বেশি লক্ষ্য রাখলে পরে কর্মপ্রয়াসটা বেশি হবে, তো সেই ভাবে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি। তারপরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী, যেটা ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত, সেটার বাস্তবায়ন চলছে।

সে গেল আমাদের বিগত দিনের পরিকল্পনাগুলো। এখন সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাঝামাঝি আছি আমরা। আড়াই বছর শেষ করেছি, সামনে আর আড়াই বছর রয়েছে। আগামী জুনের পর আরো দুটো বছর থেকে যাবে। তো আমরা সপ্তম পরিকল্পনায় এসে আরো প্রায়োগিক, আরো বাস্তবধর্মী লক্ষ্য স্থির করেছি। বাস্তবধর্মী বলতে আমরা সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনায় নির্ধারণ করেছিলাম যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে শুরু হবে এবং আট শতাংশে গিয়ে শেষ হবে। গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৭.৪ শতাংশ। তো এখন দেখা যাচ্ছে প্রথম দুইবছর আমরা লক্ষ্যের চেয়েও বেশি অর্জন করেছি। যেমন এই বছর ৭.৬৫ শতাংশ আমরা অর্জন করতে পারবো। এটা সাময়িক হিসাব, চূড়ান্ত হিসাব আসবে সামনের বছর। কারণ বোরো-আউশসহ অনেক ফসলের হিসাব জুন পর্যন্ত নিতে হবে। তো এই মূল লক্ষ্য। মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র কমিয়ে আনা আর ব্যাপক শিক্ষার হার বাড়ানো এসবের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আমরা সামনের পথে এগুচ্ছি।

সারাবাংলা: অনেকে বলে থাকেন যে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা নেই, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আমরা নিতে পারিনা, কিন্তু এখন অনেক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিশনারি জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো কিনা?

ড. শামসুল আলম: আমাদের একটা ঘাটতি ছিলো, আমরা সুদূরে দৃষ্টি দিতে পারতাম না। এর একটা কারণ অবশ্য ছিল, খাদ্য ঘাটতির দেশ, হাতে সম্পদ নেই, কাজেই খুব দূরদৃষ্টি নিয়ে পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। একজন দরিদ্রের সমস্যা হচ্ছে দিন এনে দিন যে খেতে পায় না, তার সাতদিনের পরিকল্পনা সাধারণত আসে না। সে চিন্তা করে সকালে খেলে বিকালে খাবার পাব কিনা। সে তাই সাত দিন বা দশ দিনের চিন্তা করে না। এটা ব্যক্তির জীবনে যেমন সত্য জাতির জীবনেও সত্য।

একটা সময় আমাদের খাদ্য ঘাটতি ছিল, স্বাস্থ্য ঘাটতি ছিলো, শিক্ষার হার যথেষ্ট কম ছিল, সম্পদ ছিলো না কাজেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাঞ্ছনীয় থাকলেও নেয়া সম্ভব হয়নি। নিতে পারলে ঢাকা শহর আজকে যে সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে সেই সমস্যা পোহাতে হতো না। যদি বিশ বছর সামনে রেখে আমরা চিন্তা করতাম বা পরিকল্পনা করতাম, বা আশির দশকেও যদি ত্রিশ বছর সামনে রেখে পরিকল্পনা করতাম যে ২০০০ সালে আমার কি কি প্রয়োজন পড়বে বা শহরে লোকসংখ্যা কত বাড়বে সেই হিসেব কষে যদি তখনই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা যেত তাহলে ঢাকার আজকের যে যানযট সেটা হয়তো এভাবে হতো না। সেটা হয়নি।

তবে বাংলাদেশ নামে একটি দেশের জন্মলাভের শুরু থেকেই একটি পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলা হয়ে আসছে। বিষয়টি সংবিধান দিয়েও সংরক্ষিত। সংবিধানে বলা হয়েছে রাষ্ট্র হবে প্লানড ইকোনমি। সে কারণে আমরা পাচ বছর পর্যন্ত পরিকল্পনা করতে চেষ্টা করেছি।

তবে সংবিধানের ব্যত্যয় হতে আমরা দেখেছি। সংবিধান বহির্ভূতভাবে পরিকল্পনার অর্থনীতি থেকে দেশ সরে গিয়েছিলো। ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল না।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আসার পর তারা আবার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফিরে যায়। তখন শুধু পাঁচ বছর নয়, সরকার বললো আমরা দশবছর মেয়াদী একটা রুপকল্প করবো এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরী করবো। সেই থেকেই ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি হলো। এখন আমরা ২১০০ সালকে সামনে রেখে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা করছি।

সারাবাংলা: আপনি পরিকল্পিত ঢাকার কথা বলছিলেন, আমাদের তো আরো অনেক শহর আছে। মফস্বলগুলোও ধীরে ধীরে শহর হচ্ছে। কিন্তু শহরগুলো একই অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠছে। এই ছোট শহরগুলো বাঁচানোর জন্য আপনাদের কোন পরিকল্পনা আছে কী?

ড. শামসুল আলম: যেগুলো বড় শহর, তাদের জন্য সিটি কর্পোরেশন আছে। ছোট শহরগুলোতে পৌরসভা আছে। তো আমাদের শহর অঞ্চলগুলোকে উন্নয়নের জন্য পৌরসভার যথেষ্ট একটা ভূমিকা আছে। প্রত্যেকটি পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের উচিত হবে তার শহরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা। বার্ষিক, পঞ্চবার্ষিকসহ প্রত্যেকটি শহরের একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকবে। আজকে সিটি কর্পোরেশ ও পৌরসভাগুলো কিন্তু যথেষ্ট কাজকর্ম ও সুবিধা পায় এবং জনগণের কাছে এটা পরিচিত। এখন উচিত হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া। এখন ২০৪১ পর্যন্ত একটা রূপকল্প আমরা নিয়েছি, এর ভিত্তিতে বিশ বছর মেয়াদী দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি হবে। সেখানে নগরায়ন কি হবে, কিভাবে কোথায় গুরুত্ব দেব। ঢাকা শহরের সমস্যাগুলো কিভাবে মোকাবেলা করবো। তার রূপ কাঠামো থাকবে, চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সেগুলো বাস্তবায়ন হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই নীতি নেয়া হয়েছে, সিটি কর্পোরেশন-পৌরসভা গুলোর উচিৎ হবে এমন পরিকল্পনা নেয়া। হয়তো পুরো সম্পদ তাদের হাতে নেই কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণ করতে তো কোন বাধা নেই। পরিকল্পনা থাকলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সুবিধা চাওয়ারও একটা সুযোগ হয়। এছাড়া কাজ দেখিয়ে তারা জনগণ থেকে রাজস্বও নিতে পারে। পরিকল্পিতভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়ার কোন বিকল্প নেই। আমরা আর এলোপাতাড়ি এগুতে পারি না। যেহেতু সম্পদ সীমিত, কোন খাতে কত ব্যায় করবো, কোনটাকে আগে গুরুত্ব দেব, তা সুনিশ্চিত ভাবে আমাদের নির্ধারণ করা দরকার। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে, পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে, জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এবং যতোটা সম্ভব গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান গুলোর মাধ্যমে এইগুলো করতে হবে।

সারাবাংলা: ৭.৬৫ শতাংশ জিডিপি এখন আমাদের। বলা হচ্ছে, এখন আর আমাদের দেশের মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে না, এখন একটা দেশের উন্নয়নের যে সুযোগ সেটা কি মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে না বা হাভাতের সংখ্যা কমেছে এটা দিয়ে নির্ধারণ করা হয়?

ড. শামসুল আলম: না খেয়ে মারা যাওয়া অত্যন্ত অমানবিক একটি বিষয়। অনেক ধনী দেশেও কিন্তু দরিদ্র দেখা যায়, কালেভদ্রে তারাও রাস্তার পাশে হাত পাতে বা ভিক্ষা করে। তারপরও ওইসব রাষ্ট্রব্যবস্থায় ওদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা আছে। ফলে ওদের কেউই গৃহহীনও থাকে না, আবার না খেয়েও থাকে না। আমাদের দেশেও সাংবিধানিকভাবে আহার, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটা সংবিধানে বলা আছে। কাজেই আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে মানুষ যেন না খেয়ে থাকে, গৃহহীন না থাকে সেটা নিশ্চত করা। এতকাল আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা ছিল, উন্নয়নের অনেক জায়গায় আমরা যথেষ্ট উন্নয়ন করতে পারিনি। যথেষ্ট অবকাঠামো ছিল না, রাস্তাঘাটের যথেষ্ট অভাব ছিল, সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি, বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি। এখন সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আমাদের আরো বেশি জোর দিতে হবে কারণ দ্রুত উন্নয়নের কারণে আমাদের আয় বৈষম্য বাড়ছে। এই বেড়ে যাওয়াটা সামাজিকভাবে রাজনৈতিকভাবে এবং সমাজের কল্যাণ বিবেচনায় একেবারেই অনুচিত। সামাজিক অসাম্য থাকলে সামাজিক অশান্তি তৈরি হয়। এটা বহু দেশে প্রমাণিত। তো সেই জন্য আমাদের আয় বৈষম্য কমিয়ে আনার বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনারও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় আমাদের দেশজ আয়ের ২.৩ শতাংশ হতে হবে। এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলেছিলাম সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় তিন শতাংশ হবে। যেহেতু সার্বিকভাবে দারিদ্রের সংখ্যা কমেছে তো সেকারণে আমরা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে এগুচ্ছি। এছাড়াও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে একেবারেই ব্যয়মুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার দিকে আমরা নজর দিচ্ছি। বিশেষ করে শিক্ষার আওতায় সবাইকে নিয়ে আসতে হবে। কেউ যেন শিক্ষার বাইরে না থাকে। শিক্ষা না থাকলে দেশকে দারিদ্র থেকে বিযুক্ত করা অসম্ভব। শিক্ষা হলে নাগরিক নিজের পথ বের করে নিতে পারে, নিজের সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়, সমাজ সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়, পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা বাড়ে।

সারাবাংলা: আবার ঢাকার প্রশ্নে ফিরে আসি। বসবাসের অনুপযোগী বা ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় ঢাকা সবসময় উপরের দিকে থাকে, অতিরিক্ত দূষণের কারণে ঢাকা সমালোচিত হয়, তো ঢাকাকে আবার বসবাস উপযোগী করে তোলার জন্য সুদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনা আপনাদের রয়েছে কী?

পরিবেশটাকে তো আমরাই নষ্ট করেছি। এতো জনবহুল দেশ এটিও একটি সমস্যা। জনগণ সম্পদ এটা আমরা বলি কিন্তু জনগণ জন্মালেই সম্পদ হয়ে যায় না। জনগণকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। যে সংখ্যাটা দারিদ্রসীমার নীচে বা যাদেরকে আমরা হত দরিদ্র বলি তারা তো আপনা আপনি সম্পদ হবে না। কারণ তার কাজের সুযোগ নেই, যোগ্যতা নেই, শিক্ষা নেই, স্বাস্থ ভাল না। এরা সম্পদ নয় বরং সমাজকে তাদের লালন পালন করতে হয়। জনসম্পদ তখনই তৈরি হয় যখন একটি ন্যুনতম শিক্ষা তাকে দেয়া যায়। অন্তত মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা তাকে না দিলে সে কিন্তু প্রকৃত অর্থে সম্পদ হয়ে উঠতে পারে না।

আমাদের ঢাকা শহরের মূল সমস্যা হলো এর জনঘনত্ব। এতো জনবহুল দেশ, তার সবচেয়ে বড় শহর ঢাকা। এখানে সবাই কেন্দ্রমুখী। ঢাকার বাইরের শহরগুলো আমরা সেভাবে দ্রুত গড়ে তুলতে পারিনি। সকল সুযোগ সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা এই ঢাকাকে কেন্দ্র করে হওয়ায় মানুষ সব ঢাকামুখী হয়েছে।

এখনকার পরিকল্পনায় আমরা নগরায়নকে উৎসাহিত করি, নগরায়ন মানেই কিন্তু উন্নয়ন। নগরায়ন মানে আধুনিক জীবনে মানুষের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়া। ২০৫০ এর মধ্যেই আমাদের নগরের লোকসংখ্যা বেশি হয়ে যাবে গ্রামের চেয়ে। এই হিসেবটা আমাদের কাছে আছে এবং সেই হিসেব মেনেই শহরগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে আমরা জোর দিচ্ছি। অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলি গড়ে তোলবার জন্য সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হচ্ছে। রাস্তা ঘাটের সংযুক্তি বা নেটওয়ার্কিং করা হচ্ছে। আন্তঃশহর যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। সেগুলো গড়ে তুলতে পারলে জনসংখ্যার চাপটা ঢাকায় কমে আসবে। তবে এখন মানুষের ঢাকায় আসার স্রোত কমছে। যে জেলা শহরগুলোর উন্নয়ন খুব একটা হয়নি, সেগুলোকে উন্নয়ের আওতায় নিয়ে আসতে হবে যাতে ঢাকামুখী মানুষের স্রোতটা একটু কমে। সেই জন্য সরকারের তরফ থেকে ঢাকায় নতুন করে কোন বিশ্ববিদ্যালয় না দেয়া, কোন বড় হসপিটালের অনুমতি না দেয়া, এই রকম প্রয়াস সরকারের রয়েছে, নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে ঢাকায় নতুন করে যেন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে না উঠে, এমনকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা শহরে আর না গড়ে উঠুক। এই প্রচেষ্টাগুলো আছে। বিকেন্দ্রীকরণের একটা প্রয়াস রয়ে গেছে, গণতন্ত্রায়নটা শক্তিশালী হলে, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে। তখন সেই শহরগুলো সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

সারাবাংলা: আমরা এখন ডেভলপিং কান্ট্রি হচ্ছি, আপনি বলেছেন একটি আংকিক হিসেবেই এটাকে আপনারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছেন। এটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন যে কিভাবে আমার এলডিসি থেকে ডেভলপিং কান্ট্রি হয়েছি?

ড. শামসুল আলম: লিস্ট ডেভলপড কান্ট্রি, ডেভেলপিং কান্ট্রি ও ডেভেলপড কান্ট্রি (স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ) এটা শ্রেণীকরণ করে জাতিসংঘ। প্রথম সত্তরের দশকের গোড়াতে এই শ্রেণীকরণটা শুরু হয়। বাংলাদেশ এটাতে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয় ১৯৭৫ সালে। বাংলাদেশ সহ ৪৭টি দেশ এই স্বলেআপন্নত দেশের তালিকায় ছিল। এর মধ্য থেকে পাঁচটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে আগেই। ২০০৭ সাল থেকে তিন বছর পর পর এটি মূল্যায়ন করে জাতিসংঘের একটি কমিটি, যার নাম কমিটি ফর ডেভলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এরা মূল্যায়নের জন্য তিনটি সূচক নির্ধারণ করেছে, একটি হলো মানবসম্পদ সূচক, এরপর মাথাপিছু আয় আর অন্যটি অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। মানবসম্পদে আমরা এখন অনেক উন্নত, মাথাপিছু আয়ে জাতিসংঘের এ-প্লাস ক্যাটাগরির হিসেবে আমাদের আয় এখন ১২৭৪ ডলার যা তাদের বেঁধে দেয়া ১২৩০ ডলারের চেয়ে বেশি। আর ভঙ্গুরতার সূচকে ৩২ এর নীচে থাকলেই বলা হয় একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত।

বাংলাদেশের মান হলো ২৫.২, মানে ৩২ এর অনেক নীচে। অর্থাৎ তিনটি শর্তই আমরা বেশ ভালভাবেই পূরণ করতে পেরেছি। সেই হিসেবে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পরিগণিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশকে ২০২১ সালেও বহাল রাখতে হবে। তিনটিতে নাহলেও যেকোন দুইটিতে। যেহেতু আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে ক্রমাগত, আমাদের জীবন ধারণের মান বাড়ছে এটা আশা করা যায় ২০২১ সালেও খুব স্বাচ্ছন্দেই এটা পূরণ করতে পারবো। পূরণ করলে সিডিপি ইকোসককে জানাবে, আর তারা তখন লিখিত জানাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে, যে বাংলাদেশ দুবার এটার শর্তপূরণ করেছে, তখন আবার তিনবছর পরে ২০২৪ সালে আবার জাতিসংঘ বিষয়টি যাচাই করবে। এবং তাতেও অর্থনীতির গতিধারা ও সূচক অপরিবর্তীত থাকলে জাতিসংঘ আনু্ঠিানিক ভাবে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা করবে। তারপর আরো তিনবছর স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যেসব সুযোগসুবিধা বাংলাদেশ পেত সেগুলো পেতে থাকবে। যাতে আর পেছন ফিরে না আসতে হয়। এটি এক ধরণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, জটিল প্রক্রিয়া এক অর্থে সূচকগুলো খুব একটা সহজও নয়।

ভঙ্গুরতাসূচকে আবার অনেকগুলো উপসূচক আছে যেগুলো পূরণ করে, ওইগুলোর নাম্বারের ভিত্তিতে আবার সূচক তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশ খুব সাচ্ছন্দেই শর্তগুলো পূরণ করেছে, এবং জাতিসংঘ সেটা স্বীকার করে নিয়েছে।

গত ১৬ মার্চ সিডিপি চিঠি দিয়ে আমাদের জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধিকে বিষয়টি জানিয়েছে। এজন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন সিডিপির প্রধান ও জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল। আমরা জাতীয় ভাবেই এগিয়েছি, আর সে জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি এলো।

সারাবাংলা: অনেকেই এই উন্নয়নের সমালোচনা করছেন। একটি জাতীয় দৈনিকের কলামে এসেছে আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের মতো দূর্নীতি, দারিদ্র্য ও আইনের শাসনহীন দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছি, এটা আসলে কতটা সত্য?

ড. শামসুল আলম: আমি একটু খোলামেলাভাবে বলি, আমরা স্বল্পেন্নত দেশের মানুষ হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশের যে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, যে বিবেচনাবোধ তা দিয়েই এখনো আবিষ্ট রয়েছি। অর্থনৈতিকভাবে আমাদের যে অগ্রগতি হয়েছে মানসিকভাবেও আমাদের সেই বিবর্তনটা আসতে হবে। এই কারণেই আমি বলছি, যিনি কলাম লিখেছেন তিনি যদি হতাশ হয়ে থাকেন, তাকে বলবো ধীরে ধীরে মনোভাব পাল্টাতে হবে। লাফ দিয়ে তো এগুনো যায় না। বিবর্তনগুলোর ফলে, অগ্রগতির ফলে সুসাশনের চাপ আসবে কিন্তু, যে শ্রেণিটি মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তে যাচ্ছে তারা কিন্তু সুন্দর জীবন চাইবে। তারা কথা বলতে চাইবে।

পৃথিবীতে এমন দেশ নেই যেখানে আগে সুসাশন এসে গেছে তারপর উন্নতি হয়েছে। কখনাই না। ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন হয়েছে, সুসাশন তার পথ ধরে এসেছে। আফগানিস্তান বার্মা মিয়ানমার বলে উনি কি বুঝাতে চেয়েছেন জানি না। ওই নিম্নবিত্ত দেশের মনমানসিকতা দিয়ে এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। আমাদের মূল্যবোধেরও যথেষ্ট লম্ফন প্রয়োজন। এই দিকটা থেকেই আমরা পিছিয়ে আছি। যেকারণে দেখা যায় আমাদের অনেক অর্থনীতিবিদ, সুশীলদের একটা বড় অংশ নেতিবাচকভাবে কথা বলতে পছন্দ করেন। তার একটা কারণ হলো কিছু কিছু মিডিয়াও আবার এটা পছন্দ করেন, হাইলাইট করেন। যেমন তাদের কিছু নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবি আছেন তাদের দিয়ে তারা নেতিবাচক কথাগুলো তুলে ধরেন। ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই। আমার নিজের ব্যাখ্যা হলো আমরা স্বল্পোন্নত দেশের মানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত রয়ে গেছি। আমাদের যে ইতিবাচকতা আসা দরকার দৃষ্টিভঙ্গিতে, চিন্তা-চেতনায়, মূল্যায়নে, দেশের প্রতি ভালবাসায়, সেটিরও বিবর্তন দ্রুত হওয়া জরুরি।

সারাবাংলা: মূলবোধের উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কোন পরিকল্পনা নেই?

ড. শামসুল আলম: আমি কিন্তু বাস্তবতা থেকেই আগের কথাগুলো বলছি। এটাকে অতিরঞ্জন মনে করার কোন কারণ নেই। আপনি কলামের প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছেন তার ব্যাখ্যাটা আমি দিলাম। আমাদের এখন যেটা কাজ তা হলো, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি, কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছি। মূল্যবোধের শিক্ষায় জোর দিচ্ছি। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বৃদ্ধি করার দিকে জোর দিচ্ছি। বাংলাদেশে একটা ভাল দিক হচ্ছে ধর্মোন্মাদনা কিন্তু কমে গেছে। ধর্মীয় মানুষ আছে, ধর্ম পলন করা মানুষ আছে, ধর্মোন্মাদনা নেই। বাড়াবাড়ি নেই। এটা একটা ইতিবাচক পরিবর্তন। মনমানসিকতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির ছোঁয়াটা আরো প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন এবং হবে। এই সরকারের একটি ইতিবাচক দিক হলো তারা আমাদের স্বাধীনতার যে চেতনাগুলো, মূল্যবোধগুলো ধারণ করার চেষ্টা করে, আমি মনে করি এই কারণেই সাম্প্রদায়িকতাটা কিছুটা হলেও স্তিমিত। ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরির যে প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সেগুলোও এখন দূর্বল। এটা হলো আমার ধারণা। দূর্বল হচ্ছে এবং হতে হবে। তা না হলে মন মানসিকতার পরিবর্তন বা সংস্কৃতিক পরিবর্তন বা মূল্যবোধের পরিবর্তনটা কিন্তু আসবে না। কাজেই একটা কথা আছে নদী মরে গেলেও তার ছাপ থেকে যায়। দারিদ্র থেকে আমরা যখন উত্তরণ ঘটবো কিছু কাল আমাদের দারিদ্রের ছাপ থেকে যাবে, আমাদের চিন্তা-চেতনায়, মানসিকতায়, মূল্যবোধে। সেটির জন্য আমাদেরকে সময় দিতে হবে। আমাদেরকে উন্নয়শীল দেশ থেকে উন্নত দেশে যেতে যেতে এই সময়টায় আমাদের মানসিক বিবর্তনটা হবে এবং হতেই হবে।

সারাবাংলা: এই যে ২০২১ সালে কথা বললেন বা তিনবছর সময় সাফল্য ধরে রাখার কথা বললেন, তো একটা চাপ করছে কি না যে এমনটা নাও হতে পারে বা আমরা পিছিয়ে যেতে পারি! বা কোন ধরণের ইস্যু আছে কিনা যেটা আসলে পরে আমাদের সমস্যা হবে। মেবি ইটস সামথিং পলিটিক্যাল অর ইট ইজ সামথিং নন পলিটিক্যাল?

রাজনৈতিক ভাবে যদি বড় রকমের আন্দোলন বা একটা জনবিশৃঙ্খলা কেউ সৃষ্টি করে তাহলে তো উন্নয়ন প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। আরেকটা হলো, দৈব দুর্যোগ। তাতে তো কারো হাত নেই। আইলা বা সিডর বা বড় রকমের একটা ভূমিকম্প হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে সরকারের বা কারো হাত থাকবে না। আমরা আশা করি না, তেমনটা ঘটবে। আর রাজনীতির বিষয়ে যে কথাটা আমি বলবো, মানুষের রাজনৈতিক পরিপক্কতা বাড়ছে বলেই আমি মনে করি। নানান অভিজ্ঞতায় ঘাত-প্রতিঘাতে, এমনকি গত দশ বছরেও মানুষের রাজনৈতিক চেতনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কারণ মানুষ অনেক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম দেখেছে, অমানবিক রাজনীতি দেখেছে, হত্যার রাজনীতি দেখেছে, তার আগেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির নামেও কিন্তু অনেক ভাল ভাল লোককে হত্যা করা হয়েছে। আমি উল্লেখ করতে চাই, শাহ এএমএস কিবরিয়ার মতো একজন মেধাবী, নিপাট ভদ্রলোককেও হত্যা করা হয়েছে যিনি মন্ত্রী ছিলেন, এমপি ছিলেন, আহসান উল্যাহ মাস্টারের মতো জনপ্রিয় একজন মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, মানিক সাহা নামের সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। আজকে যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে তার নেতৃবৃন্দসহ প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। এটাকে রাজনৈতিকভাবে নেবেন না আমি ঘটনার দিকমাত্রা ও গভীরতা বিশ্লেষণ করছি মাত্র।

আজকে যারা বলছে, ‘গণতন্ত্র নেই’, ‘গণতন্ত্র নেই’ তাদের উদ্দেশে বলবো, গণতন্ত্র বরং আগের থেকে অনেক পরিণত হয়েছে। সে কারণেই দেশে হিংসাত্মক, সংঘাতময় ঘটনা গত নয়-দশ বছরে ঘটেনি। এর বীপরীতে, এও বলতে চাই- অতীতে যে জ্বালাও পোড়াও হয়েছে সেগুলো মানুষ পছন্দ করেনি। করেনি বিধায় সেটা টিকে থাকেনি। আমার বিশ্বাস মানুষের এই পরিপক্ষতা বা মূল্যবোধ আগামী দিনে যেকোন ধরণের নৈরাজ্য প্রতিরোধ করে দেবে। এখন গঠনমূলক না হয়ে ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করে এগিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন। কাজেই রাজনৈতিকভাবে কোন বিপর্যয় হবে বলে আমি মনে করিনা। তবে প্রাকৃতিক দৈব দূর্বিপাকে কারো হাত নেই, সেটা আমরা আশা করবো স্রষ্টা আমদেরকে সেই ধরনের দূর্ভোগে ফেলবেন না।

সারাবাংলা: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আমলাদের দূর্নীতি কমানোর কথা বলছিলেন… সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূর্নীতি কমছে না, বেতন বাড়িয়েও খুব একটা সুফল হয়নি বলেও আক্ষেপ করছিলেন তিনি। দূর্নীতি না কমালে উন্নত বাংলাদেশ কীভাবে সম্ভব হবে?

ড. শামসুল আলম: মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজেই তো সরকারে আছেন। আমার মনে হয় দূর্নীতি কমানোর বিষয়ে সরকারকেই সক্রিয় ও সোচ্চার হতে হবে। সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দরকার। সাধারণ মানুষের জন্য এই মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। দূর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে নাগরিক সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যাতে ঘুষ ছাড়াই তার একটি কাজ করিয়ে নিতে পারে, তার ন্যয্য পাওনা বা অধিকারটুকু পেতে পারে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এটা একটা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। এবং এই বিষয়ে এখানে আফসোস করারও কিছু নেই। বরং পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যা করা প্রয়োজন সেটি আমাদের গ্রহণ করা দরকার। আমার ধারণা, মানুষ উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসনও চায়। শুধু উন্নয়ন চাইলে আইয়ূব খানের পতনটা এতো দ্রুত হতো না। এরশাদ অনেক কাজ এদেশে করেছেন, রাস্তা ঘাট, সড়ক, জনপদ। ওই দূর্নীতির কারণেই এইগুলো ডুবে গেছে। কাজেই উন্নয়য় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সুসাশন না থাকলে মানুষ উন্নয়ন নিতে চায় না। কাজেই উন্নয়েনের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত গ্রহণযোগ্য ভাবে সুশাসন দিয়ে জনগণকে নিশ্চিন্ত করতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন কিন্তু একমাত্র শর্ত নয় ভোট পাবার, এটা হলো যথেষ্ট শর্ত কিন্তু প্রয়োজনীয় শর্ত হলো সুসাশন।

বলতে চাই, একটা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় দূর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ আমি ঘুষ ছাড়া জমির কাগজপত্র পাবো, হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবো, চাকরিটা পাবো। এইটা হলো হলো সুসাশন, এটাই জনগণ আগে চায়। এই নতুন চাহিদাটা আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে।

সারাবাংলা: আপনাদের প্রকল্প ব্যায় মাত্রাতিরিক্ত বলে সমালোচনা করেন অনেকে, এটা কি ওই দূর্নীতির কারণেই?

ড. শামসুল আলম: মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগটি অনেক সময় আমরা না জেনেও বলি। দেশকাল পরিস্থিতি অুনযায়ী ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত না। আমাদের এমন একটা দেশ যার রাস্তা তৈরি করতে ভূমির গভীর থেকে তুলে আনতে হয়। আফগানিস্তান, ভারত, চীনের সঙ্গে তুলনা বাংলাদেশের চলে না। এখানে একটি রাস্তা বানাতে ভূমির নীচ থেকে কাজ শুরু করে ছয় মিটার সাত মিটার পর্যন্ত উঁচু করতে হয়। সুতরাং দুই জায়গার খরচ তো এক হবে না। আমাদের মাটির প্রকৃতিও পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত, কাজেই যে দেশে শুধু মাটির উপর দিয়ে পাথর ফেলে রাস্তা হয়ে যাচ্ছে, আর যেখানে ছয় মিটার সাতমিটার উঁচু রাস্তা করতে হচ্ছে এবং বর্ষাকালে সেটি আবার ডুবে যাচ্ছে, তার খরচ কিন্তু এক হবে না। যেদেশে পাথর আমদানী করতে হয় না যেমন ভারত, যেদেশে জমি ক্রয় করতে হয় না যেমন চীন তার সঙ্গে আমার খরচ মিলাবো কি করে?

জমি আমরা কেবল কিনি তা নয়, তিনগুণ দাম দেই যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের। কাজেই এখানে দুইগুণ তিনগুণ খরচ বেড়ে যায় কেবল এই একটি কারণে, চীন বা ভিয়েতনামে জমি কিনতে হয়না কারণ তাদের সব জমি রাষ্ট্রীয়। তার সঙ্গে তুলনা করলে হবে কি করে? আমাদের দেশে একটা কথা ছড়িয়ে পড়েছে যে আমাদের দেশে অনেক ব্যয়, এটা সর্বাংশে সত্য নয়। হয়তো তুলনামূলক ভাবে ব্যয় কিছুটা কমানো যেতে পারে তবে অন্য দেশের তুলনায় খুব বেশি খুব বেশি এমন বলাটা যৌক্তিক বলে আমি মনে করি না।

সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন